মরীচিকা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৩ পিএম, ১৮ জুন ২০২১

কাজী এনায়েত উল্লাহ,প্যারিস, ফ্রান্স

রাত দ্বিপ্রহর। দমকা হাওয়া বইছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেমে থেমে। মেঘেদের ছুটাছুটি আর গর্জনে তটস্থ রাতের নিস্তব্ধ প্রকৃতি। আনোয়ারুল হক ক্ষীণস্বরে ডেকে চলেছেন মিতালীকে। তিনি ঘুমোচ্ছেন পাশের কক্ষে। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বিয়ের সাত বছরের মাথায় অভিমান করে চলে গেছেন পরপারে। এরপর বাড়িটা লিখে দেয়ার শর্তে বিয়ে করেন তাকে।

মিতালীর সঙ্গে দ্বিতীয় সংসার শুরু হয়েছে প্রায় তেত্রিশ বছর আগে। এখনো তারা নিঃসন্তান। দত্তক নেয়া সন্তান জয়াই তাদের একমাত্র অবলম্বন। মেয়েটি ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ফিজিকসে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। বেশির ভাগ সময় হোস্টেলে থাকে। মা-বাবার প্রতি তার কোনো দরদ নেই, ভালোবাসা নেই, শ্রদ্ধাভক্তি নেই।

সে যখন জানতে-বুঝতে পারে তাকে দত্তক নেয়া হয়েছে, তখন থেকে মা-বাবার চেয়ে তাদের টাকাই মুখ্য হয়ে ওঠে জয়ার জীবনে। নিঃসন্তান দম্পতি বিষয়টি বুঝতে পারলেও জয়াকে বুঝতে দেন না। মাসে মাসে যাবতীয় খরচ ও আবদার মেটানোতেই তাদের জীবনে পরম প্রশান্তি। অন্যরকম এক ভালো লাগা আর ভালোবাসা কাজ করে জয়ার প্রতি।

ছোটকালে মা-বাবাকে হারিয়েছেন আনোয়ারুল হক। কৈশরে বাবা কিংবা দাদার আঙুল ধরে গ্রামের হাটে যাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। হইহুল্লোড় করে ঘুড়ি ওড়ানো, গোল্লাছুট কিংবা গাদন খেলা এবং বিলের কাদা-পানিতে মাছ ধরার আনন্দগুলো তার কাছে অধরা রঙিন স্বপ্নই রয়ে গেছে। কেননা তিনি নানার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন।

শিশু বয়সের কোনো স্বাধীনতা তার জীবনে ছিল না কখনো। ফুট-ফরমাশ খেটেছেন বাড়ির সবার। এক মুহূর্ত ফুরসৎ মেলেনি আরাম-আয়েশ কিংবা খেলাধুলা করার। নানার একান্নবর্তী পরিবারে এহেন কাজ নেই যা তাকে করতে হয়নি। ইন্টার পাসের আগে আগে তার জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। খাঁচায় বন্দি পাখির মতো।

ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাস করার পর তিনি চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে জীববিদ্যায় পড়াশোনা শুরু করেন। স্টুডেন্ট ভালো হওয়ায় টিউশনিও জোগাড় করে ফেলেন কয়েকটি। নিজের সব খরচ চালাতে গিয়ে ভালোভাবে পড়ালেখার সময় না পেলেও ফাইনালে রেজাল্ট মন্দ হয়নি। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন শিক্ষা ক্যাডারে। এরপর চাকরিজীবন শুরু করেন কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে।

আনোয়ারুল হক ভেবেছিলেন, অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকা আর রাতদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের অবসান হতে চলেছে তার জীবনে। বিয়ে করে সুখের সংসার পাতবেন। সারা জীবনের কষ্টগুলোকে জলাঞ্জলি দেবেন কোনো এক শরতের শুভ্র জোছনার দিগন্তে কিংবা ভাদ্রের খরতাপের দুপুরে শালুক ফোটা বিলে।

চাঁদনি রাত আনোয়ারুল হকের অত্যধিক প্রিয়। রূপালি চাঁদ আর তার জীবনের মধ্যে কী যেন এক সাদৃশ্য খুঁজে পান তিনি। তারপরও মাঝে মধ্যে পূর্ণিমার চাঁদটাকে তার হেমলক রসে ভরা খাশদান মনে হয়। চাঁদের আলোটাকে মনে হয় মোটা চশমার ঘোলা কাঁচ। কেননা প্রিয়তমার হাত ধরে ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা রাত দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি কখনো।

গভীর রাতে একা একা বসে থাকেন ছাদের ইজিচেয়ারে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন বিষণ্ন উদাসে। মাঝে মধ্যে উল্কাগুলোকে ছুটে যেতে দেখেন আর ভাবেন, দুমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য এই যে সবার অবিরাম ছুটে চলা, এর থেকে প্রাপ্তি কী? শিশুকালে মা-বাবার শাসন আর বিধিনিষেধ, কৈশোর আর যৌবনে নানা রকম অনুশাসন, চাকরিজীবনে পরিবারের সবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়া, আর শেষ বয়সে সন্তানদের গলগ্রহ হয়ে দিনকাল অতিবাহিত করা।

তাহলে একজন মানুষের জীবনে স্বস্তিটা কোথায়? জীবন থেকে একটি একটি করে দিন চলে যায়, কিন্তু নতুন বার্তা নিয়ে সুন্দর একটি দিন কি কারও জীবনে এসেছে কখনো? নির্ভাবনার দিন! চিন্তামুক্ত নির্মল একটি দিন! পৃথিবীতে মানুষের জন্ম হয়েছে কি শুধু ছুটে চলা আর কর্মব্যস্ততার জন্য? হাজারো প্রশ্ন তার মনে, কিন্তু উত্তর মেলে না একটিরও।

ছাত্রজীবনে আনোয়ারুল হক ভেবেছিলেন, পড়ালেখা শেষে চাকরি পেলেই জীবনে সুখ আসবে। চাকরি পাওয়ার পর ভেবেছিলেন, সংসারজীবন শুরু হলে সুখ আসবে। বিয়ের পর ভেবেছিলেন, সংসারে সন্তান এলে সুখ আসবে। আর শেষ জীবনে ভেবেছিলেন, রিটায়ার করলে জীবনে একটু স্বস্তি আসবে। কিন্তু সুখের নাগাল তিনি এখনো পাননি।

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সাত বছরের শেষের ছয় বছর তিনি মাঝে মাঝে বিস্মৃত হতে চান। ভুলে যেতে চান জীবনের সবচেয়ে জটিলতম অধ্যায়টিকে। সংসারে একটি সন্তান না থাকার বেদনা দুজনের জীবনটাকে করে তুলেছিল বিষময়। এ নিয়ে একে অপরের প্রতি দোষারোপ, নানা অভিযোগ আর অনুযোগ দু’জনের মাঝে তৈরি করে দেয় এক অদৃশ্য দেয়াল; যে দেয়ালের এক পাশ থেকে অন্য পাশে দেখা যায় বটে, কিন্তু সেটা অতিক্রম করা যায় না।

jagonews24

আনোয়ারুল হকের প্রথম স্ত্রী ফিরোজা। বিয়ের এক বছরের মাথায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মা হওয়ার স্বপ্ন তার কোনো দিনই পূরণ হবে না। অন্যদিকে সন্তান না হওয়ার সব দায় স্বামী চাপিয়ে দিচ্ছিলেন স্ত্রীর ওপর। দু’জনের মধ্যে ভালোবাসা আর বিশ্বাসে সুতোটা যখন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, ঠিক তখনই ফিরোজা তার মা-বাবাকে সংসার ভাঙার বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করেন।

কিন্তু তারা এতে রাজি হননি। সংসার-ভাঙা একজন নারী বাঙালি সমাজে কতটা অবহেলিত, নিগৃহীত, তা বোঝানোর চেষ্টা করেন মেয়েকে। তারা সাফ জানিয়ে দেন, ‘যে কোনো মূল্যে স্বামীর সংসারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করো। বাঙালি নারীর জন্য সংসার ভাঙা ভালো কোনো কাজ নয়। এতে বিড়ম্বনা বাড়ে বৈ কমে না।’

এরপরও ফিরোজা দু’বছর নির্বাক সংসারজীবন অতিবাহিত করেন। একটা সময় তিনি জীবনের খেই হারিয়ে ফেলেন। মাঝিবিহীন যে নৌকা অতল সমুদ্রে উত্তাল ঢেউয়ে দোল খায়, সেটি কখনো কিনারে ভেড়ে না। তার আগেই হয় তলিয়ে যায় নতুবা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

একটা সময় ছন্দপতন ঘটে তার বেঁচে থাকায়। নিশ্বাস নেয়ার মতো অক্সিজেন ফুরিয়ে আসে চারপাশে। কোনো এক অমাবস্যার ভোরে প্রতিবেশীরা দেখে, ফিরোজা বাসার সঙ্গে লেপটে থাকা মেহগনি গাছের ডালে ঝুলছেন গলায় ওড়না পেঁচিয়ে। তিনি নিজেকে মুক্তি দিয়ে চলে গেলেন বটে, কিন্তু সমাজকে বার্তা দিয়ে গেলেন এভাবে কি আসলে মুক্তি মেলে কারও? ফিরোজা মরে গিয়ে বেঁচে গেলেও আনোয়ারুল হকের জীবনে সুখের দেখা মেলেনি কখনো।

একপশলা সুখের নেশায় তিনি দিশেহারা। দিগভ্রান্ত পথিকের মতো অবস্থা তার। একটি সন্তান খুবই প্রয়োজন তার। কেননা সন্তান বংশের বাতি। সন্তানের মাঝেই টিকে থাকে বাবার অস্তিত্ব। একটি সন্তানের আশায় বছর না ঘুরতেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন মিতালীকে। বিয়ের পরপরই বাড়িটা রেজিস্ট্রি করে দেন নতুন বউকে; বিবাহোত্তর শর্ত হিসেবে। শুরু হয় তাদের আরেক জীবন।

মিতালীকে বিয়ে করে আনার পর প্রথম বছর খুব আনন্দে কাটে তাদের দাম্পত্য জীবন। ছুটির দিনে দু’জন মিলে সিনেমা দেখা, দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, নামিদামি হোটেলে খাওয়া, এসব ছিল নিত্যদিনের রোজনামচা। বছর না ঘুরতেই একটা সময় মিতালীও বুঝতে পারেন সন্তান ধারণের ক্ষমতা তাদের নেই।

দেশে-বিদেশে চিকিৎসাও কম করাননি। কিন্তু হাজারো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আনোয়ারুল হক কখনো বাবা হতে পারবেন না। ওই দিন থেকে পূর্ণিমার রাতগুলো তার কাছে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে যায়। পৃথিবীতে সবকিছু তার কাছে নিরর্থক মনে হয়। সেদিন তার ফিরোজাকে খুব করে মনে পড়েছিল।

ফিরোজার চলে যাওয়াটা যৌক্তিক মনে হয়েছিল সংগত কারণে। হরহামেশাই ভাবেন আনোয়ারুল হক, তিনি কি ফিরোজা হয়ে যাবেন? সংসার নামক সংসদে ফিরোজারাই কি সিদ্ধান্তপ্রণেতা? অবশেষে নিয়তিকে মেনে নিয়ে তারা দত্তক নেন তিন বছরের শিশুকন্যা জয়াকে।

ভেবেছিলেন, জয়াকে গড়ে তুলবেন তাদের মতো করে। স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলবেন জয়ার জীবন। ভুলে যাবেন অতীতের সব কষ্ট। জীবনের হার্ডডিস্ক থেকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলবেন যাবতীয় না-পাওয়ার বেদনা। তার পরও তাদের ভালোবাসার মন্দিরে শুকপাখি ধরা দেয়নি।

যেদিন থেকে জয়া জানতে পেরেছে সে পালিত কন্যা, সেদিন থেকে মা আর বাবা ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে। মিতালী-হক দম্পতি বুঝে গেছেন খাঁচায় আটকে রাখা পাখি কথা বলা শিখলেও পোষ মানে না। খাঁচার দরজা খুলে দিলে পাখি তার আপন ঠিকানা বনে ফিরে যাবে। খাঁচা শূন্যই পড়ে রবে।

তাদের কাছে ইদানীং মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা নিরর্থক। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি অবিরাম ছুটে চলা জীবন এক মরীচিকা। গতিময় এ জীবনের কোনো মানে হয় না। কী লাভ এত কষ্ট করে? এত যাতনা সহ্য করে তিলে তিলে সাজানো সংসারের যৌক্তিক সংজ্ঞা কী? আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘যার মা আছে, সে গরিব নয়’ কিন্তু যাদের সন্তান নেই, তারা কি সুখী না দুঃখী?

নির্দিষ্ট সময়ের দু’বছর আগেই রিটায়ার করেছেন আনোয়ারুল হক। এর কিছুদিন পর থেকেই তিনি বিছানাগত। বাসার কাজের ছেলে পলাশই তাকে দেখভাল করে। বিছানায় একঘেঁয়েমি জীবন তার আর ভালো লাগে না। এখন ফিরোজাই তার কাছে আদর্শ মানুষ বলে মনে হয়।

বারবার মনে পড়ে অতীতের কর্মময় জীবনের কথা। কষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথাও মনে পড়ে। অন্যদিকে জীবনভর ব্যর্থ হওয়ার কথাও মন থেকে মুছে ফেলতে পারেন না তিনি। বিছানায় শুয়ে এসব কিছু ভাবতে ভাবতে রুমের ছাদটাকে মনে হয় জোছনালোকিত আকাশ। আজ চাঁদ নেই আকাশে, তবুও উজ্জ্বল জোছনার বান ডেকেছে বিদ্যুচ্ছটার ঝলকানিতে।

মেঘের আর্তনাদে ক্ষীণস্বরে মিতালীকে ডাকার শব্দগুলো পাশের ঘর থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে বুমেরাংয়ের মতো। একটু পানি খাওয়ার জন্য পলাশকেও ডেকেছেন কয়েকবার। কেউ শুনতে পায়নি তার সেই আকুতি।

ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে মিতালীর। জানালা দিয়ে ভোরের নির্মল আলো আশ্রয় খোঁজে নিরাশার গহিন অন্দরমহলে। রোজকার মতো অসংখ্য মোরগের ডাক অবিরাম বেজে চলেছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের মতো। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠেন মিতালী।

তিনি স্বামীর কক্ষে এসে দেখেন, আনোয়ারুল হক ডান হাত দিয়ে শক্ত করে কাচের গ্লাসটি ধরে আছেন। সবটুকু পানি গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে। কিঞ্চিৎ হা করে থাকা মুখে তিনি দ্রুত পানি ঢেলে দেন সযতনে। কিন্তু তা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বালিশে।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]