মনের কষ্ট ঢাকতেই সাজগোজ করি

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ০৩:২১ পিএম, ০৪ অক্টোবর ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

হুম, আপনার কী কখনো মনে হয়েছে, আপনি অনেকদিন সময় নিলেন এই কলটা করতে?

জ্বি, মনে হয়েছে। তবে উপায় ছিল না কারণ, নিজের নিরাপত্তা, থাকা খাওয়ার নিশ্চয়তা আগে নিজের নিশ্চিত করতে হয়েছে। যেখানে নিজের বাবা-মা মেয়েকে ঘরে ফিরতে দেয়নি।

নিজ সন্তানের জীবনের চেয়ে তাদের কাছে সমাজ বড় হয়েছে। সেখানে অন্য কারও কাছে আপনি আশা করেন যে মাসুম আমাকে বের করে দিলে জায়গা মিলতো?

দেখবেন বাইরে থেকে অনেকেই অনেক কথা বলে। অথচ নিজের জীবনে তারা ঠিক উল্টোটাই করে।

সেদিন দু’জন পুলিশ এলেন, একজন আমার সঙ্গে কথা বললেন, অন্যজন মাসুমের সঙ্গে। এরপর আমার বাচ্চাদের সঙ্গেও। তারপরে তারা মাসুমকে নিয়ে গেলো থানায়।

আমাকে বলে গেলো ভয় না পেতে। কাল আবার আসবে স্টেটমেন্ট নিতে। আর কিছু ফোন নম্বর দিয়ে গেলেন প্রয়োজন হলে যেন ফোন দেই।

ঘটনা কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো। মাসুম তার ভুল স্বীকার করলো। আর এমন হবে না বললো, রিলেশনশিপ কাউন্সেলিং করবে জানালো। মাসুম তার সরকারি চাকরি বাঁচাতে মরিয়া, অনেক টাকা দিয়ে উকিল নিয়েছিল।

সেদিন বাচ্চারাও সাক্ষী দিয়েছিল তার বিপক্ষে।

এরপর শুরু হলো মাসুমের বন্ধুর বউদের ফোনকলের অত্যাচার, কেউ একদিন একটা খাবার নিয়ে দেখতেও আসেনি, আমি বা আমরা কেমন আছি কিন্তু মাসুমের জন্য এসব কুৎসিত জীবনমৃত নারীদের দরদ উথলে পড়লো, কেউ বলে ভাবি ভাইয়ার দিকে তাকানো যায় না, কেমন শুকিয়ে গেছে, কি করবেন আর এতদিন পরে। বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে এখন আর কই যাবেন? মামলা তুলে নেন।

মামলা কিন্তু আমি করিনি, পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে করেছে, আমি শুধু সাক্ষী ছিলাম।

আর এক ভাবি ফোন দিয়ে বলে, মেয়ে-মানুষের বেটা ছেলে ছাড়া চলা কঠিন, অন্য বেটা ছেলে তো এর চেয়েও খারাপ হতে পারে! মিটমাট করে ফেলেন ভাবি।

এই নারী নিজেকে মানুষ ভাবে! ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে, কি শিক্ষা এদের পরিবার এদের দিয়েছে কে জানে।

আর একজন ফোন দিয়ে বলে, ভাইকে তো কত দাওয়াতে দেখেছি, একটু অহংকারী কিন্তু দেখলেই হাসি মুখে কথা বলে, সবসময়েই আপনার, বাচ্চাদের কত লুক আফটার করে, খেয়েছেন কিনা খোঁজ করে। দেখিতো সবসময়েই।

দেখেন আমি সংসার করলাম ১১ বছর, আর এসব নোংরা ভাবি আমাকে আমার স্বামীর সার্টিফিকেট দেয়।

সবমিলিয়ে প্রায় দু’মাস পর মাসুম বাসায় আসলো, বাসায় বাচ্চাদের সঙ্গে এই সময়টা আমার বেশ ভালো কেটেছে। শুধু ৬ জন ভাবিকে ফোনকল এবং ফেসবুক থেকে ব্লক করতে হয়েছে। এতদিন মাসুম তার বন্ধুর বাসায় ছিল। কোর্টের নিষেধ থাকায় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার বাসায় আসার অনুমতি ছিল না।

বাসায় এলো দু’মাস পরে। এসে মুখ গোমরা, সে কি মেজাজ।

এরপর থেকে আর মারে না কিন্তু খুবই খারাপ ব্যবহার। আমি খাবার রেডি করে ডাকলে খেতে আসে না। পরে একা একা খায়, বাচ্চাদের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলে না। আমার মাথায় নাকি কোনো বুদ্ধি নেই। আমাকে কেউ বুদ্ধি দিয়ে এসব করিয়েছে। সামান্য ঝগড়া থেকে আমি পুলিশে কল করেছি, তার বন্ধু-বান্ধবরা সব ছিঃ ছিঃ করছে।

সে এতদিন মারলো, অন্যায় করলো, অত্যাচার করলো বছরের পর বছর। অথচ তার কোনো লজ্জাবোধ নাই। আমি পুলিশে কল করায় নাকি মানুষ ছিঃ ছিঃ করছে। এই আমাদের শিক্ষিত সমাজের ছবি!

অস্ট্রেলিয়ায় কিন্তু মোটামুটি সব শিক্ষিত লোকজন এসেছেন বলে জানি, তাদেরই এই অবস্থা।

তাহলে বাংলাদেশের মেয়েরা এমন হলে কী অবস্থার ভেতর দিয়ে যায়, খুব ভালো করেই বুঝতে পারি।

একগাদা সার্টিফিকেটের আড়ালে এত অশিক্ষিত মানুষ।

এরপর এখন কেমন আছেন আগের চেয়ে ভালো?

সেটা বলতেই তো আজ এলাম, এতক্ষণ তো বললাম ১১ বছরের ভিত্তিপ্রস্তর। যেন আপনি বুঝতে পারেন এখন আমি কী বলছি, কেন বলছি? আমি আজ পরপর দুটো অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে এসেছি।

জ্বি বলুন...

তো ওই রকমের বাজে কথা শুনতে শুনতে একদিন মাসুমকে বললাম, বাচ্চাদের জন্য অনেক সহ্য করেছি তার মানে এই না যে তুমি যা খুশি তাই বলবা, ভালোভাবে থাকলে থাকো নইলে রাস্তা মাপো। তুমি যাওয়ার পর দুইমাস দিব্যি বেশ গেছে।

যেসব মানুষ ছিঃ ছিঃ করছে তাদের কাছে গিয়েও থাকতে পারো, বলা যায় না খুশিতে হয়তো তারা তাদের বেডরুম তোমার জন্য ছেড়ে দেবে।

মাসুম মুখ কালো করে থাকলো আরও কিছুদিন এরপর জন্মদিনে, বিবাহ বার্ষিকীতে আমাকে দামি গিফট দেওয়া শুরু করলো। সেই ছবিগুলো ফেসবুকে দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করত। রাতে আমার সঙ্গে এসে ঘুমানো শুরু করলো।

এদিকে আমার সঙ্গে মাসুমের ফেসবুকে ছবি দেওয়া দেখে আরও কিছু ভাবির ফোন শুরু হলো যার সারমর্ম আপনারা তো ঠিকই মিলে গেলেন মাঝপথে কতগুলো ফ্যামিলির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলো। এখন তারা বলে বেড়াচ্ছেন জামাইকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়, আবার হাসিমুখে ছবি তুলে পোস্ট দেয়। ভাবি বুঝলেন আপনাদের মিল দেখে এদের এখন গা জ্বলে যাচ্ছে।

আমি বলতাম জ্বলতে দেন। আমার বাড়ির মানুষকে আমি কোলে তুলে রাখবো না লাত্থি দেবো সেটা আমার ইচ্ছে। আমি এখন যা করবো তাতেই তাদের গা জ্বলবে। কারণ আমি যা করতে পেরেছি তা করার মুরোদ ওই ভাবিদের নেই। তারা মার খাবেন আর ‘জি বাংলা’ দেখবেন আর এসব বলবেন। আপনি আর ফোন দিয়ে এসব আমাকে বলবেন না। নিজের সম্মান রাখতে শিখুন।

পারিজাত রহমান বললেন, হুম এদের শুরুতেই থামিয়ে দিতে হয়। কেন যে মানুষ না জেনে না বুঝে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলায়, বুঝি না। একটা কথা মনে রাখবেন, জীবনে যারা আপনাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বা অনেক উপরে তারা কখনোই আপনাকে নিয়ে সমালোচনা বা গসিপ করবে না কারণ তাদের সেই সময় নেই। গসিপ করে তারাই যারা আপনার পেছনে এবং তারাও ভালো করেই জানেন আপনার জায়গায় আসতে পারবেন না কখনই, এজন্যই জ্বলুনি।

জ্বি, এভাবেই প্রায় আরও এক বছর গেলো, এবার মাসুম পরিকল্পনা করলো বাংলাদেশ যাবে, এখন চারজনের টিকিটের টাকা নাকি আমার দিতে হবে, আমি বললাম কেন?

তখন বলে গেলো উকিলের পেছনে তার অনেক টাকা গেছে। বললাম সেটা তোমার নিজের দোষে গেছে। তাছাড়া তোমার আয় আমার চেয়ে অনেক বেশি।

কিন্তু মাসুম চিৎকার শুরু করলো। শেষে বললাম আচ্ছা আমি হাফ দেব, তুমি হাফ। সে তবুও রাজি না, উল্টোপালটা বলা শুরু করলো।

আমি নাকি অফিসে খুব সেজেগুঁজে যাই, কলিগদের সঙ্গে হেসে হেসে লাঞ্চ করি, সে এগুলো সব জানে, দেশে গিয়ে আমার নামে বিচার দেবে, এদেশে পারছে না।

আমি বললাম, অনেক হয়েছে চুপ করো। একদম চুপ। তোমার মন নোংরা বলে যা খুশি তাই বলবা না। আমি সবখানেই সেজেগুঁজে যাই। যেন মন খারাপ ধরা না পড়ে। আর আমাদের এক কলিগের জন্মদিন ছিল, সে সবাইকে একদিন লাঞ্চ ট্রিট দিয়েছে, তো আমি সেখানে না হেসে কান্না করবো?

তোমার এত সাহস তুমি আমাকে ফলো করো। লজ্জা লাগে না লাস্ট ১২ বছরে তুমি ছয়বার চাকরি বদলিয়েছো। দুইবার তোমার জব চলে গেছে। তোমার স্বভাবের জন্য তুমি কোথাও বেশিদিন টিকতে পারো না। খালি গল্প অমুক বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিতে পড়ছো বলে বেড়াও। কি হয়েছে তাতে? মানুষ তো হতে পারোনি।

মাসুম ভয়ানক রেগে গেলো এবং আবার মারা শুরু করলো। আমিও রেগে ছিলাম, বলেছিলাম খবরদার মারবে না, হাত আমারো আছে। মাসুম মারতেই থাকলো, একটু পরে দরজায় জোরে নক, খোলার পরে দেখি দু’জন পুলিশ দাঁড়িয়ে।

আমার বড় মেয়ে ছোট ছেলে পেছনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা বলছে, সেভ মাই মাম, শি ইস গোয়িং টু ডাই। আবারো মাসুমকে নিয়ে গেলো পুলিশ। আমার আর ধৈর্য্য বা রুচিতে কুলালো না। ছেলের কথাটা কানে বাজতে লাগলো। নিজেকে এত ছোট মনে হলো, কিসের জন্য মানুষ বিয়ে করে?

বাংলাদেশে জানালাম। আমার ভাই-বোন খুবই চিন্তিত। আমাকে বা বাচ্চাদের নিয়ে না কিন্তু, এখন তারা আত্মীয় স্বজনদের কি বলবে সেটা নিয়ে। আমার ছোট ভাই তো বলেই ফেললো, মাসুম ভাইয়ের অনেক সমস্যা আছে সেটা তো আগেই বোঝা গেছে। তুমি তো এখন চাকরি করো, কিছুদিন আলাদা থেকে মিটমাট করে ফেলো।

আমি বললাম, বিয়ের পরে শুনলাম দেশ ছাড়লে ঠিক হবে। এরপর শুনলাম বাচ্চা নিলে ঠিক হবে। এরপর শুনলাম রোজগার করলে ঠিক হবে। সব রূপকথার ঝুলি। এখন শুনছি সে এমন, মানিয়ে নাও।

মাসুমরা কখনোই ঠিক হয় না। কারণ এরা বেড়ে উঠেছে ভুলভাবে। শুধু আমার মা বললেন, তোর বাবা বিয়ের পর না বুঝে আমাকে অনেক জ্বালাইছে। একদিন রাগ করে বলেছিলাম এত জ্বালাও, যখন নিজের মেয়েরা পরের ঘরে জ্বলবে তখন বুঝবা কেমন লাগে?

সে তো বোঝার আগেই বিদায় নিলো আর আমিই না বুঝে বলেছিলাম, এখন নিজেই চারগুণ কষ্ট পাচ্ছি, মা হয়েও কখনো বলতে পারিনি সব ফেলে চলে আয়। তোর ১২টা বছর নষ্ট হলো। পারলে আমাকে মাফ করে দিস। আমি একজন অক্ষম মা।

কিছুই বলতে পারলাম না মা’কে। তিন্নি টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুছলেন। একটু সময় নিয়ে বললো।

আরো কিছু ভাবি ব্লকড হলেন, মনের শান্তি বড় শান্তি। এদের নোংরা কথা আর গাল ভরা উপদেশ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। এরা কেউ তেমন কিছুই করে না কিন্তু সিরিয়াল দেখে উঠে ফোন করে ভাবি আর কয়দিন বাঁচবেন। এ বয়সে সংসার না ভেঙে ভাইয়ার সঙ্গে বসেন।

আমি একজনকে উত্তর দিলাম আমার কি এমন বয়স? উনি চুপ। মাসুমের একটা ফ্রেন্ড শুধু একদিন ফোন করে বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। আমি তাকে বলেছি জ্বি ভাই বাচ্চাদের কথা চিন্তা করেছি বলেই আলাদা হলাম। আমি স্বার্থপর বা হিপোক্রেট মা না, আমি চাই আমার বাচ্চারা তাদের পার্টনারকে সম্মান করুক, মাসুমের সঙ্গে থাকলে সেটা সম্ভব না।

এখন সেপারেশনের ১ বছর শেষ হবে আগামী মাসে। আমার তো ডিভোর্স দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে। আপনি বলুন আমি কি মাসুমকে ডিভোর্স দিয়ে দেব নাকি আবারো বসবো আলোচনায়?

পারিজাত রহমান বললেন, যাক, আপনি তবু বিশৃঙ্খলার জাল থেকে বের হতে পেরেছেন, বেশিরভাগই পারে না। এখন আপনি তার সঙ্গে আবার আলোচনায় বসবেন নাকি ডিভোর্স দিয়ে দেবেন সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। আপনার মন যা চায় তাই করবেন তবে এখন পর্যন্ত যা করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ।

কারণ অন্যায়কারী আর জেনে বুঝে অন্যায়সহ্যকারী সমান অপরাধী। তাহলে আমি ১৩ বছর জেনে বুঝেই অপরাধীর জীবন কাটিয়েছি, আর কাটাবো না। এখন সাধারণ মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]