হাজার বছরের বাঙালি হয়েও কেন আজ বিভাজন?
এই প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে দেওয়া যায় না। কারণ বাঙালির বিভাজন শুধু ধর্মের কারণে হয়নি, শুধু রাজনীতির কারণেও হয়নি। এটি বহু শতকের ইতিহাস, ক্ষমতার খেলা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব, উপনিবেশবাদ এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের ফল।
বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার গ্রহণক্ষমতা। আর ইতিহাসের এক পর্যায়ে সেই শক্তিকেই দুর্বলতায় পরিণত করা হয়েছে। বাঙালি পরিচয় আসলে কী? বাঙালি মূলত ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক জাতিসত্তা। ধর্মভিত্তিক নয়।
এই ভূখণ্ডে আর্য এসেছে, পাল এসেছে, সেন এসেছে, তুর্কি এসেছে, আফগান এসেছে, মুঘল এসেছে, ব্রিটিশ এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা অনেকেই “বাঙালির ভেতরে” ঢুকে গেছে।
কারণ বাংলা শুধু ভূখণ্ড নয়, এটি ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। এই বাংলার নদী, কৃষি, উর্বরতা, গান, কবিতা, খাদ্য, নারীর সামাজিক উপস্থিতি, লোকজ সংস্কৃতি, আতিথেয়তা, ভাষার কোমলতা এবং সামাজিক মিশ্রণ বহু বহিরাগতকে টেনে রেখেছে।
যেই এখানে এসেছে, সেই থেকে গেছে। এটি কেবল আবেগ নয়, ইতিহাসও। তাহলে বিভাজন কোথা থেকে শুরু?
১. ক্ষমতা বনাম সংস্কৃতির সংঘাত
বাংলা দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রায় সবসময় বাইরের শক্তির অধীনে ছিল। এখানেই দ্বন্দ্ব।
যারা শাসন করেছে, তারা প্রায় সবাই বুঝেছিল, বাঙালিকে পুরোপুরি দমন করা কঠিন। এর একটি বড় কারণ ছিল বাংলার প্রকৃতিই। এই ভূখণ্ড কখনও স্থির নয়। এখানে নদী যেমন প্রতিনিয়ত পথ বদলায়, তেমনি মানুষের মন, সমাজ এবং জীবনযাত্রাও বদলায় জোয়ার ভাটার ছন্দে। বাংলাকে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ছিল অনেক বেশি জটিল।
একটি পুরোনো ঘটনার কথাও প্রায়ই বলা হয়। এক ব্রিটিশ লাটসাহেব নাকি নদীপথে বাংলার কোনো অঞ্চলে যাচ্ছিলেন। গিয়ে দেখেন, মাঝি দিব্যি নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছে। তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন, নৌকা কেন ছাড়ছে না? মাঝি শান্তভাবে উত্তর দেয়, ‘এখন ভাটা চলছে, জোয়ার না এলে নৌকা চলবে না।’
শোনা যায়, এই উত্তর ব্রিটিশ কর্মকর্তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ তিনি প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলায় শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও নিজের নিয়মে চলে। এখানে শাসকের ইচ্ছাই শেষ কথা নয়। নদীর স্রোত, জোয়ার ভাটা, ঋতুর পরিবর্তন এবং মানুষের জীবন এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে বাঁধা। লোকমুখে এমন কথাও প্রচলিত আছে, এই অভিজ্ঞতার পর তিনি ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন।
ঘটনাটি ঐতিহাসিক সত্য হোক বা লোককথা, এর ভেতরে একটি গভীর বাস্তবতা আছে। বাংলাকে শাসন করা কখনো সহজ ছিল না। কারণ এই ভূখণ্ড শুধু প্রশাসনিক মানচিত্র নয়, এটি ছিল এক চলমান সভ্যতা। এখানে মানুষকে শক্তি দিয়ে চুপ করানো গেলেও তাদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং ভেতরের সত্তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। তাই শাসনের সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে উঠেছিল বিভাজন।
মুঘলদের ভূমিকা কী ছিল?
মুঘলরা বাঙালির উৎস নয়। তারা ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসক। বাংলাকে তারা মূলত অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখেছিল। বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী সুবা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুঘলরা বাংলাকে পুরোপুরি ‘উত্তর ভারতের মতো’ বানাতে পারেনি। কারণ বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।
ফলে কী হয়েছে?
এক ধরনের মিশ্র সমাজ তৈরি হয়েছে। বাংলার মুসলমানদের বড় অংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকেই এসেছে। অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির বড় অংশ বাঙালিই রয়ে গেছে। এখানে দ্বৈত পরিচয় তৈরি হয়। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়। অন্যদিকে ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়। এই দ্বৈততা পরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে আসল বিভাজন কারা তৈরি করল?
২. ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ছিল বড় টার্নিং পয়েন্ট
বাঙালিকে সবচেয়ে পরিকল্পিতভাবে বিভক্ত করেছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ। কারণ তারা বুঝেছিল, একত্রিত বাঙালি বিপজ্জনক।
বাঙালি ছিল শিক্ষিত, রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবশালী। উনিশ শতকের নবজাগরণ থেকে বিপ্লবী আন্দোলন পর্যন্ত বাংলাই ছিল কেন্দ্র।
তাই ব্রিটিশরা “Divide and Rule” নীতি ব্যবহার করে। ধর্মকে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত করা হয়। হিন্দু বনাম মুসলমান বিভাজনকে প্রশাসনিক ও শিক্ষাগতভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়।
বঙ্গভঙ্গ কেন হয়েছিল?
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। একত্রিত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা ছিল অন্যতম লক্ষ্য। এখান থেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয় তীব্র হতে শুরু করে।
৩. শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
ব্রিটিশ আমলে পশ্চিম বাংলার শহুরে শিক্ষিত শ্রেণি দ্রুত এগিয়ে যায়। পূর্ব বাংলার বিশাল মুসলিম কৃষকসমাজ পিছিয়ে থাকে।
এই বৈষম্য পরে ক্ষোভ তৈরি করে। ধর্ম তখন কেবল বিশ্বাস নয়, সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে ‘আমি বাঙালি’ পরিচয় দুর্বল হয়ে ‘আমি হিন্দু’ বা ‘আমি মুসলমান’ পরিচয় শক্তিশালী হতে থাকে।
৪. দেশভাগ ছিল মানসিক বিভাজনের বিস্ফোরণ
১৯৪৭ সালে শুধু ভূখণ্ড ভাগ হয়নি। ভাগ হয়েছে স্মৃতি, পরিবার, ভাষার আবেগ, প্রতিবেশ এবং সহাবস্থান। বাংলা দুই ভাগে ভাগ হলো। তারও পরে পাকিস্তানের ভেতরে আবার পূর্ব বাংলা নিজেই বৈষম্যের শিকার হলো। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানরাও বুঝল, শুধু ধর্ম দিয়ে জাতিসত্তা তৈরি হয় না। সেখান থেকেই ভাষা আন্দোলন। সেখান থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
৫. তাহলে আজকের বিভাজনের কারণ কী? আজকের বিভাজন বহুস্তরীয়। ক. ধর্মীয় মেরুকরণ ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। খ. রাজনৈতিক স্বার্থ বিভক্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। গ. সামাজিক হিংসা ও অনিরাপত্তা অর্থনৈতিক চাপ মানুষকে দ্রুত পরিচয়ভিত্তিক শত্রু খুঁজতে শেখায়। ঘ. সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা নিজস্ব ইতিহাস না জানলে মানুষ সহজেই প্রভাবিত হয়। ঙ. ডিজিটাল বিভাজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘৃণাকে দ্রুত ছড়ায়। বাংলা ভাষায় অনলাইন ঘৃণাচর্চাও এখন গবেষণার বিষয়।
কিন্তু বাঙালির মধ্যে এই ‘চেহারার মিল এবং অমিল’ কেন? কারণ বাঙালি জাতি নিজেই একটি সংমিশ্রণ। এখানে দ্রাবিড় আছে।
আর্য আছে। তুর্কি আছে। মঙ্গোলীয় প্রভাব আছে। আরব ও পারস্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বৈচিত্র্যের পরও ভাষা ও সংস্কৃতি মানুষকে এক রেখেছিল।
এই কারণেই বাঙালিকে পুরোপুরি ভাঙা কখনো সহজ হয়নি। তাহলে কি বাঙালি বিদ্বেষ নতুন কিছু? না। ইতিহাসে বহু সময় বাঙালিকে দুর্বল, আবেগপ্রবণ, বিভক্ত অথবা ‘অতিরিক্ত সংস্কৃতিমনস্ক’ বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ সংস্কৃতিসম্পন্ন জাতি প্রশ্ন করতে শেখে। প্রশ্ন করা শাসকের জন্য সবসময় অস্বস্তিকর।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান ধর্মহীনতায় নয়। সমাধান সংস্কৃতিবিমুখতাতেও নয়। সমাধান হলো, ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখা। রাজনীতিকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। বাঙালিত্বকে সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের ভিত্তি হিসেবে পুনরুদ্ধার করা। কারণ বাঙালির আসল শক্তি ছিল,
সহাবস্থান। গ্রহণক্ষমতা। ভাষা। সংস্কৃতি। মানুষকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা।
যে জাতি হাজার বছর ধরে বহিরাগতকে আপন করেছে, সেই জাতিকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু শর্ত একটাই,
নিজের ইতিহাসকে জানতে হবে। অন্যের তৈরি ইতিহাস শুধু মুখস্থ করলে হবে না।
এখন শেষ অংশে এসে বলতে ইচ্ছে করে, হয়তো বাঙালির আসল পরিচয় রক্তে নয়, হৃদয়ে। চার পুরুষ আগে আমার পূর্বপুরুষ কীভাবে বাংলাদেশে এসেছিলেন, তার নির্ভুল ইতিহাস আমি জানি না। শুধু শুনেছি, এক পর্তুগিজ যুবক একদিন ইউরোপ ছেড়ে বাংলায় এসেছিল। তারপর এই বাংলার মাটি, মানুষ, নদী এবং ভালোবাসা তাকে আর ফিরে যেতে দেয়নি। সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, থেকে গিয়েছিল এই বাংলাতেই।
আজ যখন নিজের জীবনের দিকে তাকাই, তখন কখনও কখনও ইতিহাসকে অদ্ভুতভাবে ফিরে আসতে দেখি। কারণ আমিও তো গত প্রায় তেতাল্লিশ বছর ধরে ইউরোপে বসবাস করছি। সংসার, কাজ, দায়িত্ব এবং জীবনের অসংখ্য বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছি এই মহাদেশে। যেন ইতিহাস কোনো এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করে রেখেছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে।
আমার বংশের নাম ‘মৃধা’। ছোটবেলায় মনে হতো, এ নাম হয়তো পুরোপুরি বাঙালির নয়। হয়তো কোথাও কোনো বহিরাগত ইতিহাস লুকিয়ে আছে এর ভেতরে। পরে ইউরোপে এসে যখন পর্তুগাল ও আইবেরীয় অঞ্চলের ইতিহাস জানতে শুরু করি, তখন বিস্মিত হয়ে দেখি, ‘মৃধা’ নামটির ধ্বনিগত মিল ইউরোপের ‘Mérida’ নামের একটি ঐতিহাসিক শহরের সঙ্গেও খুঁজে পাওয়া যায়। তখন অনেকেই প্রশ্ন করত, আমার ভেতরে কি কোনো পর্তুগিজ বা আইবেরীয় বংশের ইতিহাস লুকিয়ে আছে? আমি তখন খুব শান্তভাবে উত্তর দিই, না, আমি বাঙালি। এ উত্তর আমি শুধু মুখে বলি না, হৃদয় দিয়ে অনুভব করি।
কারণ এখনও ইলিশ মাছের গন্ধ আমাকে শৈশবের বাংলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। খিচুড়ির ধোঁয়া ওঠা প্লেট আমার কাছে শুধু খাবার নয়, এটি স্মৃতি, এটি মাটি, এটি শেকড়। আমি এখনও ভাতে মাছে বাঙালি। আমি বাংলায় গান গাই। বাংলায় কথা বলি। বাংলার গল্প বলি। বাংলায় লিখি আমার হৃদয়ের কথা। বাংলাতেই ভালোবাসি। তখন মনে হয়, বাঙালি হওয়া শুধু জন্মসূত্রের বিষয় নয়। এটি এক ধরনের আত্মা। এক ধরনের টান। এক ধরনের মায়া। যে মায়া একদিন বহিরাগতকে আপন করে নিয়েছিল, আজও ঠিক সেই মায়াতেই হয়তো বেঁচে আছে বাংলা, বেঁচে আছি আমি।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]
এমআরএম