‘ফুল মেজার’ সাক্ষাৎকার
যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম: ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওখান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে কোনো ধরনের তৎপরতার তথ্য পেলে ব্যবস্থা নিতে, এমনকি ওই স্থাপনা উড়িয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন বাহিনী।
রোববার (১০ মে) ‘ফুল মেজার’-এর সাংবাদিক শারায়েল অ্যাটকিসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাক্ষাৎকারটি গত সপ্তাহে ধারণ করা হয় এবং রোববার (১০ মে) সম্প্রচারিত হয়।
ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ যদি ওই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তা জানতে পারবে এবং তাদের উড়িয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক সময় এটি নিজেদের হাতে নেবে এবং মার্কিন স্পেস ফোর্স ওই স্থাপনাটির ওপর নজরদারি করছে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আরও দুই সপ্তাহ অভিযান চালিয়ে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারতাম। কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল যেগুলোতে আমরা হামলা করতে চেয়েছিলাম। এর প্রায় ৭০ শতাংশ আমরা সম্পন্ন করেছি, তবে আরও কিছু লক্ষ্যবস্তু আছে যেগুলোতে হামলা চালানো সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর পরিচালিত হামলার ফলে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে থাকা অবস্থায় থেমে যায়।’
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা যদি সেটা না করতাম, তাহলে তারা এর মধ্যেই ইসরায়েলকে ধ্বংস করে দিত।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানকে সামরিকভাবে পরাজিত মনে করেন তিনি এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আরও দুই সপ্তাহ অভিযান চালিয়ে ইরানের প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারত।
তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট এর আগে জানিয়েছিল, ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দুই সপ্তাহ দূরে ছিল না। ইরান কেবল পর্যাপ্ত পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংগ্রহের কয়েক সপ্তাহ দূরে ছিল। পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে আরও অন্তত এক থেকে দুই বছর সময় লাগত।
এদিকে, ২০২৬ সালের ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন ক্ষয়ক্ষতির স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং সেখানে তাদের কার্যক্রম মূলত আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার জন্য পরিচালিত হয়।
ট্রাম্প বলেন, আমাদের এই প্রণালির দরকার নেই। আমরা এটা করছিলাম ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যদের সহায়তার জন্য।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, বর্তমানে রাশিয়া ও সৌদি আরবের সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি তেল ও গ্যাস উৎপাদন করছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বছরের শেষ নাগাদ তা দ্বিগুণ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
অন্যদিকে, ইরানের এক সামরিক মুখপাত্র শনিবার (৯ মে) রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএকে জানান, ইউরেনিয়াম সংরক্ষণস্থলগুলোর সুরক্ষায় ইরানি বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতিতে রয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া বলেন, ইরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র অনুপ্রবেশ বা আকাশপথে অভিযান চালিয়ে ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এদিকে, সংবাদমাধ্যম সিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ইসরায়েলের জন্য এ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এর অনেকটাই ধ্বংস করেছি। কিন্তু যা এখনো রয়ে গেছে, তা নিয়ে কাজ বাকি আছে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেখানে গিয়ে সেটি বের করে নিয়ে আসা।’
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব রোববার মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে পাঠিয়েছে তেহরান।
উল্লেখ্য, ইরানের সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব বলে অভিযোগ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই অভিযোগে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানে বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর চলতি বছর একই অভিযোগে জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
একই দিনে মিনাব শহরের শারজাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক মিসাইল হামলায় ১৬৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়। এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরান সরকার। এর প্রতিবাদে টানা ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান।
এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর আরেক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প।
ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৮০ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।
কেএম