বিশ্ব ইজতেমায় আগত বিদেশিদের মেহমানদারি যেভাবে করা হয়

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২০

প্রতি বছরই বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। যদিও গত দুই বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমা দুইভাগে বিভাজন হয়েগেছে। তারপরও বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। আর এ ইজতেমায় বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশ থেকে দাওয়াত ও তাবলিগে নিয়োজিতরা উপস্থিত হন। ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী বিদেশিদের জন্য রয়েছে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা।

ইজতেমা উপলক্ষে কিংবা দাওয়াত ও তাবলিগের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে যে কোনো মেহমান আসলেই বিমানবন্দর থেকে তাদেরকে কাকরাইল মসজিদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। আর বিশ্ব ইজতেমার সময় ময়দানের উত্তর পাশে তাদের জন্য রয়েছে আলাদা মেহমানখানার ব্যবস্থা।

নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশি মেহমানখানা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে সাধারণ কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না।

বিশ্ব ইজতেমায় বিদেশ থেকে যারা আসেন
ইজতেমা উপলক্ষ্যে সাধারণত বিদেশ থেকে ৪ ধরনের মেহমান আসেন। আর তার বিবরণ হলো-
>> ভারত–পাকিস্তান মারকাজের শীর্ষ মুরব্বি, ওলামায়ে কেরাম এবং সব দেশের মারকাজের শুরার সাথীরা।
>> তাবলিগে সময় লাগানো সব শ্রেণির পুরাতন সাথীদের পাশাপাশি শুধু ইজতেমায় তিন দিন অংশগ্রহণ ও দেখার উদ্দেশ্যে অনেক নতুন সাথীও আসেন।
>> বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সরকারি উচ্চপদস্থ পরিচালক–কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের শরীয়া বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শীর্ষস্থানীয় ওলামারাও অংশগ্রহণ করেন।
>> প্রবাসী বাংলাদেশীরা। যারা শুধু ইজতেমায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশে আসেন।

বিদেশি মেহমানদের থাকার ব্যবস্থা
তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বী ও শুরার সাথীদের জন্য টঙ্গী ময়দানে নির্মিত স্থায়ী মাদ্রাসায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়। মাদ্রাসার ভিন্ন ভিন্ন কামরায় তারা অবস্থান করেন।

বিদেশ থেকে আগত সব সাধারণ সাথীদের জন্য অস্থায়ীভাবে ৪টি টিনশেড তাবু স্থাপন করা হয়। আর তাতে কোন কোন দেশের সাথীরা থাকবেন তা ভাগ করে দেয়া হয় এভাবে-

>> প্রথমটিতে আরব, আফ্রিকা ও রাশিয়ার দেশসমূহ।
>> দ্বিতীয়টিতে পূর্ব এশিয়া ( চিন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য), ইউরোপের দেশসমূহ।
>> তৃতীয়টিতে দক্ষিণ এশিয়া ( ভারত, পাকিস্তান, শ্রিলংকা)।
>> উল্লেখিত দেশের সাথীদের উপস্থিতি বেশি হলে চতুর্থ তাবুটিও ব্যবহার করা হয়।

বিদেশি মেহমানদের প্রতিদিনের কাজ
বিদেশ থেকে আগত তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বি ও শুরা সাথীদের অংশগ্রহণে মাদ্রাসার বড় হলরুমে প্রতিদিন মশওয়ারা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ইজতেমার প্রতিদিনের কারগুজারি শোনানো ও আমল বণ্টন, সব দেশের কারগুজারি শোনানো, বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা হয়।

বিদেশি মেহমানদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা
বিদেশি মেহমানদের সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করতে তাদের সেবায় কয়েক হাজার মানুষ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত থাকেন। তাদের জন্য যেসব ব্যবস্থাপনা করা হয় তাহলো-

>> যিম্মাদার
প্রতি তাবুতেই কাকরাইল শুরার পক্ষ থেকে যিম্মাদার নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তারা পুরো ইজতেমায় উপস্থিত মেহমানদের যাবতীয় বিষয়ের তদারকি করেন।

>> ট্রান্সপোর্ট
মেহমানদের আনা–নেয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য এই জামাত কাজ করে। কাকরাইল মসজিদের নিজস্ব গাড়ি ছাড়াও ইজতেমা উপলক্ষে শতাধিক গাড়ি ব্যবহারের জন্য রাখা হয়। ‘বিদেশি মেহমানদের খেদমতে নিয়োজিত’ স্টিকার সম্বলিত এই গাড়িগুলো এয়ারপোর্ট টু ময়দান নির্বিঘ্নে চলাচলের সুবিধা পায়।

>> ইস্তেকবাল
বিদেশি মেহমানদের খিমার প্রবেশ মুখেই ইস্তেকবালের কামরা থাকে। এই জামাতের সাথীরা এয়ারপোর্ট থেকে আগত মেহমানদের ইস্তেকবাল করে তাদের লাগেজ–সামানা আনা নেয়ায় সহায়তা করেন। পাশাপাশি প্রত্যেকের পাসপোর্টও এন্ট্রি করেন তারা।

>> আমানত
বিদেশ থেকে আগত মেহমানদের পাসপোর্ট, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী জমা রাখার জন্য আমানত কামরা থাকে। এখানে নাম এন্ট্রি করে ব্যাংকের লকারের ব্যবস্থা রয়েছে। যার যার লকারের তাদের সংরক্ষণ করা হয়।

>> অনুবাদের দায়িত্ব
ইজতেমা আগত বিদেশি মেহমানদের সুবিধার্থে তাদের ভাষায় বয়না বুঝতে দোভাষী রাখা হয়। যাতে যে যে ভাষার মানুষ সে ভাষার পারদর্শী অনুবাদকের ব্যবস্থা করা হয়। যারা বয়ানের সময়ই তাৎক্ষণিক বয়ান বুঝিয়ে দেন। বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্ররাও এ অনুবাদকের কাজ করে থাকেন।

>> তাশকিল
ইজতেমায় বিদেশিদের অধিকাংশই এক বা একাধিক চিল্লায় সময় লাগানোর নিয়তে আসেন। তাদের জামাতবন্দি করা, মুতারজিম ঠিক করা ও রোখ দেয়ার কাজ করেন তাশকিলের সাথীরা।

>> মাসয়ালা হল
বিদেশি মেহমানদের মধ্যে নানা বয়সী মেহমানদের বিভিন্ন রকম সমস্যা ও প্রয়োজন থাকে। এসব সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজন পুরণের জন্য ‘মাসয়ালা হল’ নামে জামাত থাকে। তারা জানা-অজানা বিষয়গুলো জানানোর মাধ্যমে এ খেদমদের আঞ্জাম দেন।

>> পাহারার সাথী
সরকারি প্রশাসনের উদ্যোগে বিদেশি খিমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলেও ইজতেমার পক্ষ থেকেও আলাদা পাহারাদার জামাত থাকে। পালাক্রমে চব্বিশ ঘণ্টা মূল গেট ও প্রত্যেক তাবুতে পাহারা দেয়া হয়।

>> অস্থায়ী দোকান
বিদেশি মেহমানদের সুবিধার্থে কেনা-কাটায় অস্থায়ীভাবে দোকান তথা বেডিং, মশারি, কম্বল, জুতা, সকল প্রকার ফল ও পানীয় সুলভমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়।

>> মানি এক্সচেঞ্জ
বিদেশি মেহমানদের কষ্ট লাঘব ও প্রতারণা থেকে বাঁচাতে ময়দানেই অস্থায়ী মানি এক্সচেঞ্জ বসানো হয়। সব ধরনের মূদ্রা ক্রয় – বিক্রয়ের সুবিধা থাকে এখানে।

>> পরিচ্ছন্নতা
বিদেশি মেহমানদের তাবু থেকে বর্জ্য অপসারণ ও টয়লেট–অজুখানা–গোসলখানা পরিষ্কারের জন্য কয়েকটি জামাত নিয়োজিত থাকে। প্রতিদিন রাত ১২ টার পর এই জামাতের সাথীরা সব ধরনের পরিচ্ছন্নতার কাজ আঞ্জাম দেন।

>> খাবার ব্যবস্থাপনা
মেহমানদের দেখাভাল ও অতিথিপরায়ণতায় বাংলাদেশিদের সুনাম রয়েছে বিশ্বময়। ইজতেমায় আগত মেহমানদের সর্বোচ্চ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয় প্রতিবছর। পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি পরিবার বংশানুক্রমে এই মহান খেদমতের জিম্মাদারি পালন করে আসছেন। তাদের সাথে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী খাবার সরবরাহে দায়িত্ব পালন করেন।

শুরা মেহমানখানা ও আম মেহমানখানার আয়োজন পৃথকভাবে হয়ে থাকে। উভয় জায়গায় দেশের ভিন্নতা হিসাবে পছন্দমাফিক খাবার পরিবেশন করা হয়। সাথে ২৪ ঘন্টা দুধ চা ও রঙ চা’র ব্যবস্থা থাকে।

আম মেহমানখানায় খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে থাকেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। আর রুটি বানানোয় অংশ নেন কাকরাইল মাদরাসার ছাত্ররা।

বিশুদ্ধতা ও উৎকৃষ্ট মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সব কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত–খামার থেকে ফরমালিনমুক্তভাবে আনা হয়ে থাকে। খাবার পানি গভীর নলকূপ থেকে উঠিয়ে ফিল্টারিং করে বোতলজাত করা হয়।

বিদেশি মেহমানদের খেদমতে যাদের রাখা হয়, তারা সবাই ন্যূনতম তিন চিল্লার সাথী। ইজতেমার প্রত্যেক পর্বেই তারা এ খেদমতের আঞ্জাম দিয়ে থাকতেন। দুই ভাগে বিভাজন হওয়ার ফলে এখন আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপনায় বিদেশি মেহমানদের খেদমত করা হয়।

ইজতেমায় আগত বিদেশিদের মেহমানদারি আয়োজন বিদেশিদের অর্থে করা হয় না। ইজতেমার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অনেক নিবেদিত ধর্মপ্রাণ মুসলমান আল্লাহ সন্তুষ্টির আশায় এসব মেহমানদারির ব্যবস্থা করে থাকেন।

সর্বোপরি তাবলিগের মুরব্বি ও সাধারণ মানুষ মনে করেন, ‘টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের জন্য আল্লাহর বিশেষ দান। স্বল্প আয়ের একটি দেশে এত বড় একটি আয়োজন যেভাবে সুচারুরূপে সম্পাদিত হয় তা দেখে বিদেশিরা অভিভূত হয়ে পড়েন।

উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব ১০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয়। আর দ্বিতীয় পর্বে ইজতেমা ১৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে।

দ্বিতীয় পর্বেও শতাধিক দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক বিদেশি মেহমান আসার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে বিদেশসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক সাথীরা টঙ্গীর তুরাগ তীরের ইজতেমা ময়দানে এসে অবস্থান করছেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা।

এমএমএস/এমএস