আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ‘মুমিন’

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৪:১৪ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০২০

আলহামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু চারপাশে প্রতিনিয়ত যে অমানবিক ও নৃশংস ঘটনা ঘটছে তা কখনও একজন শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কাজ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে কেবল তার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। অথচ আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে আমরা উল্টো পথে চলছি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘আর আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।' (সুরা জারিয়াত: আয়াত ৫৬)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সেরা সৃষ্টি মানুষ আজ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভুলে নানা পাপ কাজে লিপ্ত। আজ এমন কোনো পাপ নেই যা আমাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না। অথচ সবার মূল কাজ হল মুমিন মুত্তাকি হয়ে সৃষ্টিকর্তার ইবাদতে রত থাকা।

বিশ্ব জগতে মানুষের বিভিন্ন শ্রেণি বিন্যাসের মাঝে আল্লাহর সবচে প্রিয় হল মুমিনগণ। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিভিন্ন স্থানে অসংখ্যবার উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।' (সুরা তাওবাহ : আয়াত ৭১)

প্রথমত- কুরআনুল কারিমের এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষ ও নারীদের পরস্পর বন্ধু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত বন্ধু যেমন সুখে-দুঃখে আপদে-বিপদে, কষ্টে-শান্তিতে পাশে এসে দাঁড়ায়; ঠিক একজন প্রকৃত মুমিনও অবশ্যই অপর একজনের পাশে দাঁড়াবে। আর সে পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন।

দ্বিতীয়ত- একজন মুমিন সর্বদা সৎ আদেশ দিতে থাকবে। নিজে সৎ কাজে প্রতিষ্ঠিত থেকে অন্যকে অনুপ্রেরণা যোগাতে থাকবে। সৎকাজের প্রসারতা দানে যথাসাধ্য সময় ও সম্পদ ব্যয় করে যাবে। উদ্দেশ্য থাকবে যেন মানুষ সৎ কাজ করে প্রকৃত মুমিন হতে পারে।

তৃতীয়ত- একজন মুমিন সবসময় অসৎ কাজ থেকে নিজে এবং অন্যদের বাঁচাতে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। যেন কোনো ক্রমেই অসৎকার্য সমাজে সংঘটিত হতে না পারে। সামাজিক অবক্ষয় এবং অপকর্ম যেন মাথাচারা দিয়ে সমাজকে কলুষিত করতে না পারে; সে বিষয়ে সে সজাগ থাকবে।

চতুর্থত- একজন মুমিন অবশ্যই নামাজ কায়েমকারী হবে। কোনো ওয়াক্তের নামাজ ছেড়ে দেবে এটা হতেই পারে না। নামাজ হলো একজন মুমিনের আত্মার খোরাক। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না তেমনি নামাজ ব্যতিত একজন মুমিন বাঁচতে পারে না। তাই নিজে এবং নিজের পরিবারে নামাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপন চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

পঞ্চমত- একজন মুমিন আল্লাহর রাস্তায় জাকাত আদায়কারী হবে। আল্লাহ তাকে রিজিক হিসাবে যা কিছু প্রদান করেছেন তা থেকে সে জাকাত প্রদান করে থাকে। গরীব অসহায়দের সাহায্যের জন্য সদা তার হাত প্রসারিত রাখে।

ষষ্ঠত- আল্লাহর মুমিন বান্দারা আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাস বান্দা হয়ে থাকেন ফলে তারা সর্বাবস্থায় আনুগত্যের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। আর এমনভাবে নেতাকে অনুসরণ করে যে অন্যদের জন্য তিনি আদর্শ হয়ে যান। একজন মুমিন আল্লাহ তাআলার প্রিয় হোন। এজন্য বলা হয় মুমিনের হৃদয় যেন আল্লাহ তাআলার আরশ হয়ে যান।

এ সব বৈশিষ্টের কারণেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রতি দয়াশীল হবেন। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়ের অধিকারী, তাই তিনি ন্যায় বিচারের মানদণ্ডে মুমিনদের পুরস্কার প্রদানকারী। এছাড়া একজন মুমিনের অভিভাবক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা হয়ে থাকেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‌যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদের তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৫৭)

এ আয়াতে মুমিনকে আল্লাহর বন্ধু হিসাবে প্রকাশ করা হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ পাক তার বন্ধুকে আলোর পথে পরিচালিত করেন, ফলে তার চলার পথ হয় সহজ ও মসৃণ। আল্লাহ তার বিপদ-আপদের সাথী হয়ে সাহায্য করেন। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ বলেন, যে আমার বন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমি আমার বান্দার ওপর যা ফরজ করেছি এর চেয়ে বেশি কিছু নিয়ে আমার কাছাকাছি হতে পারে না। আর আমার বান্দারা সবসময় নফলের মাধ্যমে আমার কাছাকাছি হয়। অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি তখন সে যে কানে শ্রবণ করে আমি সে কান হয়ে যাই। সে যে চোখে দেখে আমিই সেই চোখ হয়ে যাই। সে যে হাতে ধরে আমিই সেই হাত হয়ে যাই এবং সে যে পায়ে হাঁটে, আমিই সেই পা হয়ে যাই। সে যখন আমার কাছে কিছু চায় আমি তাকে তা প্রদান করি আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে আমি তাকে আশ্রয় প্রদান করি।’ (বুখারি)

আল্লাহ তাআলার প্রিয় বন্ধু হতে নারী-পুরুষের কারো জন্যই কোন বাধা নাই। কেননা এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোনো সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১২৪)

এ আয়াতেও নারী-পুরুষ কারো জন্যই মুমিন হতে কোনো বাধা নাই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যে কেউ পুণ্যকর্মের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয় মুমিন হতে পারে।

পরিশেষে আল্লাহ তাআলার দরবারে সবিনয় প্রার্থনা- হে দয়াময় প্রভূ! আপনি আমাদের পাপ ক্ষমা করে আপনার সন্তুষ্টির চাদরে আবৃত করে নিন। আপনাকে আমাদের অভিভাবক ও বন্ধু হিসেবে পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]