মহানবীকে (সা.) আল-আমিন বলা হতো কেন?

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:১২ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মহানবীকে (সা.) আল-আমিন বলা হতো কেন? ছবি: আনপ্ল্যাশ

আহমাদ সাব্বির

ইসলামপূর্ব যুগেও মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) জীবন ছিল নৈতিক উৎকর্ষ, মানবিক দায়বদ্ধতা ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নবুয়ত লাভের বহু আগেই তার চরিত্র, কর্ম ও আচরণে এমন সব গুণাবলি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে তার নবীজীবনের জন্য এক সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করে। এই সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

নবুয়ত-পূর্ব জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হলো ‘হিলফুল ফুজুল’-এ তার অংশগ্রহণ। তৎকালীন মক্কা সমাজ ছিল গোত্রকেন্দ্রিক, শক্তিশালীদের আধিপত্যে দুর্বল ও নিপীড়িতদের অধিকার প্রায় উপেক্ষিত থাকত। অন্যায়, জুলুম ও শোষণ ছিল সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। ঠিক এই বাস্তবতায় কিছু বিবেকবান মানুষ আব্দুল্লাহ বিন জাদআনের গৃহে একত্রিত হন। তাদের লক্ষ্য ছিল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো—গোত্র, বংশ কিংবা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই ঐতিহাসিক চুক্তির নামই ছিল ‘হিলফুল ফুজুল’।

এই সংগঠনে মহানবী (সা.) আগ্রহভরে অংশগ্রহণ করেন। তখনো তিনি নবুয়তপ্রাপ্ত নন, কিন্তু তার অন্তরে মানবিক চেতনা, ন্যায়বোধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের দৃঢ়তা পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। হিলফুল ফুজুল কেবল একটি সাময়িক উদ্যোগ ছিল না; বরং এটি ছিল সামাজিক ন্যায়, মানবিক মূল্যবোধ ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের এক সাহসী ঘোষণা। এই চুক্তি মহানবীর (সা.) হৃদয়ে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, নবুয়ত লাভের পরেও তিনি একাধিকবার বলেছেন—আজও যদি আমাকে এমন কোনো সংগঠনে আহ্বান জানানো হয়, যেখানে জুলুম প্রতিরোধ ও মজলুমের সাহায্যের অঙ্গীকার করা হয়, আমি অবশ্যই তাতে অংশগ্রহণ করব। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইসলাম শুধু ইবাদতকেন্দ্রিক ধর্ম নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।

নবুয়তপূর্ব জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যখন মহানবীর (সা.) বয়স ছিল প্রায় পঁচিশ বছর। প্রচণ্ড বর্ষণের ফলে কাবাঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। কাবাঘর ছিল আরব সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্রবিন্দু; তাই এর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সকল গোত্র সম্মিলিতভাবে কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কাজের দায়িত্ব গোত্রভিত্তিকভাবে ভাগ করে নেয়। প্রতিটি গোত্রই নিজ নিজ অংশ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করে।

কিন্তু নির্মাণকাজ শেষে হাজরে আসওয়াদ তার স্থানে পুনঃস্থাপন নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিরোধ। হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করা ছিল সম্মানের বিষয়, আর প্রতিটি গোত্রই এই সম্মান নিজের ভাগে নিতে চেয়েছিল। বিরোধ এতটাই তীব্র আকার ধারণ করে যে, যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন সংকটময় মুহূর্তে মক্কার এক প্রবীণ ব্যক্তি উমাইয়া ইবনে মুগিরাহ একটি প্রস্তাব দেন—পরদিন যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কাবাঘরে প্রবেশ করবেন, তিনিই এই বিরোধের ফয়সালা করবেন। সকলে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়।

আল্লাহর বিশেষ কুদরতে পরদিন সর্বপ্রথম কাবাঘরে প্রবেশ করেন হযরত মুহাম্মাদ (সা.)তাকে দেখে সকলেই আনন্দে বলে ওঠে—‘এই তো আমাদের আমীন! (বিশ্বস্ত ব্যক্তি) আমরা তার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট।’ এই আস্থা ছিল তার দীর্ঘদিনের সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ফল। তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান উপস্থাপন করেন, যা শুধু বিরোধই মিটিয়ে দেয়নি; বরং সকল গোত্রের সম্মানও অক্ষুণ্ণ রেখেছিল।

নবী (সা.) একটি চাদর আনতে বলেন এবং চাদরের মাঝখানে স্বহস্তে হাজরে আসওয়াদ রাখেন। এরপর প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে প্রতিনিধি ডাকেন এবং সবাইকে চাদরের কিনারা ধরতে বলেন। এভাবে সকল গোত্রের সম্মিলিত অংশগ্রহণে হাজরে আসওয়াদ তার নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যায়। শেষে নবী (সা.) নিজ হাতে তা স্থাপন করেন। এই প্রজ্ঞাময় সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়। এই ঘটনা তার নেতৃত্বগুণ ও দূরদর্শিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নবুয়তপূর্ব জীবনে তার নৈতিক চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত। তিনি কখনো মূর্তিপূজা করেননি, যদিও তৎকালীন আরব সমাজে এটি ছিল ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কোনো পাপাচার, অশ্লীলতা বা লজ্জাবিরোধী কাজে তাকে কখনো জড়াতে দেখা যায়নি। তার জীবন ছিল স্বাভাবিক, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ।

তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক, হাকিম ইবনে হিজাম ও জিমাম ইবনে সা’লাবা। তারা সকলেই তার সততা, সৌজন্য ও মানবিক গুণে মুগ্ধ ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলমান হন। নবুয়তের আগেই তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সত্যবাদিতা মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

এই কারণেই মক্কার মানুষ তাকে ‘আল-আমিন’ ও ‘আস-সাদিক’—অর্থাৎ বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী—উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এই উপাধি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত এক সর্বসম্মত স্বীকৃতি। মানুষ তার কাছে নিজেদের সম্পদ গচ্ছিত রাখত, বিবাদে তাকে সালিশ মানত এবং কঠিন সময়ে তার ওপর নির্ভর করত।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।