মনীষীর জীবনচরিত

ইমাম ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.)

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:০৩ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ইমাম ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রহ.) ছবি: জেমিনি এআই

রায়হান আল ইমরান

ইসলামের ইতিহাসে যেসব আলেম জ্ঞান, যুক্তি ও আধ্যাত্মিকতার অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তাদের মধ্যে ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে ফকিহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, দার্শনিক এবং আত্মশুদ্ধির পথপ্রদর্শক। তার পূর্ণ নাম শামসুদ্দীন মুহাম্মদ বিন আবু বকর আদ-দিমাশকী। তবে ‘ইবনুল কাইয়্যিম’ বা ‘ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। তার বাবা মাদরাসাতুল জাওযিয়্যার কাইয়্যিম বা পরিচালক ছিলেন। সেখান থেকেই ‘ইবনুল কাইয়্যিম’ উপনামের উৎপত্তি।

জন্ম ও শৈশব

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ৬৯১ হিজরিতে বর্তমান সিরিয়ার দামেস্কে এক ধর্মপ্রাণ ও বিদ্যানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও মাদরাসার শিক্ষক। পারিবারিক এই পরিবেশ তার মানস-গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আন্তরিক আগ্রহ অনুভব করেন। তাই মাত্র ৬-৭ বছর বয়সেই তিনি হাদিস শ্রবণ ও প্রাথমিক জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করেন, যা পরবর্তীতে তার জ্ঞানজীবনের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলে। 

ইলম অর্জন ও শিক্ষকগণ

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী আলেম। ইলম অর্জনের অদম্য পিপাসা নিয়ে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছে তিনি নিয়মিত যেতেন এবং হাদিস, তাফসির, ফিকহ, উসুলে ফিকহ ও আরবি সাহিত্যসহ নানা শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন—

  • ইবনে তাইমিয়া (রহ.), আকিদা, তাফসির, ফিকহ ও উসুলে ফিকহসহ ইসলামি চিন্তাধারার ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক।
  • সফিউদ্দীন আল-হিন্দী ও মাজদুদ্দীন ইসমাঈল আল-হাররানী, ফিকহ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জনে যাদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 
  • পিতা আবু বকর আদ-দিমাশকী, ফারায়েজ (ইসলামি উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ে তাঁর প্রথম শিক্ষক।
  • মাজদুদ্দীন আত-তানুসী ও মুহাম্মদ বিন আবুল ফাতহ আল-বালাবাক্কী, আরবি ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় যাদের অবদান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
  • যয়নুদ্দীন ইবরাহিম আশ-শিরাজী, শিহাবুদ্দীন নাবুলুসী ও তাকিউদ্দীন সুলাইমান বিন হামজা, হাদিসশাস্ত্রে যাদের সান্নিধ্যে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতা

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ও ইবাদতগুজার মানুষ। দ্বীনি ইলম চর্চার পাশাপাশি নামাজ, জিকির, কোরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকতেন তিনি। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনকেই তিনি মানবজীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য মনে করতেন। তার সম্পর্কে বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তিনি মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কারও প্রতি হিংসা, কাউকে কষ্ট দেওয়া, কারো গিবত করা বা কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা—কিছুই তার মধ্যে ছিল না। আমি তার সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি; আমাদের যুগে তার চেয়ে বেশি ইবাদতগুজার কাউকে দেখিনি।

চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য

ইবনুল কাইয়্যিমের (রহ.) চিন্তাধারার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  • কোরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর দৃঢ় নির্ভরতা।
  • যুক্তিনির্ভর ও দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ।
  • আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার প্রতি গভীর গুরুত্ব।
  • শিরক ও কুসংস্কারের বিরোধিতা।
  • ইখলাসপূর্ণ ইবাদত ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করার গুরুত্ব।

ইসলামি চিন্তা ও জ্ঞান চর্চায় আজও তাঁর চিন্তাধারার গভীর প্রভাব রয়েছে।

ইবনে তাইমিয়ার (রহ.) সান্নিধ্য ও কারাবরণ

ইবনুল কাইয়্যিমের (রহ.) জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন তার শিক্ষক ইবনে তাইমিয়া (রহ.)। তিনি তার ঘনিষ্ঠ ছাত্র ও সহচর ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় তার কাছে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। ধীরে ধীরে তিনি তার চিন্তাধারা গভীরভাবে আত্মস্থ করেন এবং তার অন্যতম প্রধান অনুসারী হয়ে ওঠেন।

ইবনে তাইমিয়ার (রহ.) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তার সঙ্গেই ছিলেন এবং তার মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে তারা দুজনই নানা সমালোচনা ও নির্যাতনের শিকার হন। ইবনুল কাইয়্যিমকেও (রহ.) কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়। তবে এসব প্রতিকূলতা তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। বরং কারাগারেও তিনি ইবাদত, গবেষণা ও গ্রন্থ রচনায় নিয়োজিত ছিলেন।

রচনাবলি

ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) কেবল একজন জ্ঞানতাপস আলেমই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী ও ক্ষুরধার লেখকও। তার প্রতিটি রচনাই ছিল চিন্তাশীল, অর্থবহ এবং পাঠকের জন্য দিকনির্দেশনামূলক।

তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা আজও ইসলামি জ্ঞানজগতে সমাদৃত। তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • মাদারিজুস সালিকিন, আধ্যাত্মিক উন্নতি, আত্মশুদ্ধির ধাপসমূহ এবং প্রয়োজনীয় পাথেয় নিয়ে আলোচনা।
  • জাদুল মা‘আদ ফি হাদি খাইরিল ‘ইবাদ,  নবীজির (সা.) জীবন, কর্ম ও সুন্নাহভিত্তিক জীবনধারা বিষয়ক অমূল্য রচনা।
  • ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন আন রাব্বিল আলামিন, ইসলামি আইন, ফতোয়া ও ইজতিহাদের নীতিমালা বিষয়ক গ্রন্থ।
  • আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া, মানবজীবনের আত্মিক ও নৈতিক রোগ এবং তার প্রতিকার নিয়ে রচিত।
  • আত-তিব্বুন নববী, নববী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

ইন্তেকাল

এই মহান ইসলামি চিন্তাবিদ ৭৫১ হিজরির ১৩ ই ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স ছিল প্রায় ৬০ বছর। তার জানাজা দামেস্কের ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অসংখ্য আলেম-ওলামা, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করে। দামেস্কের বাবে সগির কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

সূত্র: ভূমিকা, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন: ১/৮-১০; ভূমিকা, আত-তিব্বুন নববী: ৮-৯

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।