কেন ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে?

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২৫ পিএম, ২৪ এপ্রিল ২০২২

রমজানের ২৩ তারাবি পড়া হলো আজ। নবিজী ঘোষিত লাইলাতুল কদরের রাতও আজ। রোজাদার মুমিন মুসলমান এবং ইতেকাফকারীরা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করবেন। তাহাজ্জুদ-নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইসতেগফারে অতিবাহিত করবেন শেষ দশকের দ্বিতীয় বেজোড় রাত। আল্লাহর নেয়ামতের বর্ণনা, সফলতা ও দুনিয়া-পরকালের বিজয়ের কথা পড়েছেন হাফেজে কোরআনগণ।

২৩ তারাবিতে ৪টি সুরা পড়া হয়েছে। সুরা আহক্বাফ, সুরা মুহাম্মাদ, সুরা ফাতহ এবং সুরা হুজরাত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো ২৬পারার তেলাওয়াত। সুরাটিতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন ও দোয়া। মুমিন মুসলমানের জন্য আবেদনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ-
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ : 'রাব্বি আওযিনি আন আশকুরা নিমাতাকাল্লাতি আনআমতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালেদাইয়্যা ওয়া আন আমালা সালিহাং তারদাহু ওয়া আসলিহ লি ফি জুররিয়্যাতি ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমিন।'
অর্থ : হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান কর, যাতে আমি তোমার নেয়ামতের শোকর করি, যা তুমি দান করেছ আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদেরকে সৎকর্মপরায়ণ কর, আমি তোমার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি আজ্ঞাবহদের অন্যতম।' (সুরা আহক্বাফ : আয়াত ১৫)

সুরা আহক্বাফ : আয়াত ০১-৩৫
মক্কায় অবতীর্ণ সুরায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে জিনদের ইসলাম গ্রহণ করে ফিরে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হিজরতের ৩ বছর আগে নবুয়তের ১০ কিংবা ১১তম বছর প্রিয় নবি তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে আসার সময় নাখলা নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার বর্ণনা কোরআনে এভাবে ওঠে এসেছে-
'যখন আমি একদল জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা (আপনার) কোরআন তেলাওয়াত শুনছিল। তারা যখন কোরআন তেলাওয়াতের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাক। অতপর যখন তেলাওয়াত শেষ হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়, আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মুসার পর অবর্তীণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের প্রত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরলপথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহবানকারীর কথা মান্য কর এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তোমাদের গোনাহ মার্জনা করবেন।' (সুরা আহক্বাফ : আয়াত ২৯-৩১)

১. নবিজীর জীবনে নবুওয়তের দশম বছর ছিল অত্যন্ত কঠিন। কুরাইশরা তিন বছর ধরে বনু হাশেম এবং মুসলমানদের পুরোপুরি বয়কট করে রেখেছিলো । নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার বংশের লোকজনও মুসলমানদের সঙ্গে অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। কুরাইশদের লোকজন এই মহল্লাটিকে সব দিক থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো।

২. অবশেষে তিনি তায়েফের বনি সাকিফ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দিতে সেখানে গমন করেন। তারা নবিজীর দাওয়াত তো গ্রহণ করেনি বরং উল্টো তাকে যথেষ্ট নির্যাতন করেন। এ অবস্থায় তিনি তায়েফের বাইরে একটি বাগানের প্রাচীরের ছায়ায় বসে পড়লেন এবং আল্লাহর কাছে এই বলে ফরিয়াদ করলেন। সিরাতে ইবনে হিশামে এসেছে-
‘হে আল্লাহ! আমি শুধু তোমার কাছে আমার অসহায়ত্ব ও অক্ষমতা এবং মানুষের দৃষ্টিতে নিজের অমর্যাদা ও মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু ও করুণাময়! তুমি সব দুর্বলদের রব। আমার রবও তুমিই। তুমি আমাকে কার হাতে ছেড়ে দিচ্ছ? এমন কোনো অপরিচিতের হাতে কি যে আমার সাথে কঠোর আচরণ করবে? কিংবা এমন কোনো দুশমনের হাতে কি যে আমার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করবে? তুমি যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হও তাহলে আমি কোনো বিপদের পারোয়া করি না। তবে তোমার নিরাপত্তা ও কল্যাণ লাভ করলে সেটা হবে আমার জন্য অনেক বেশী প্রশস্ততা। আমি আশ্রয় চাই তোমার সত্তার সেই নূরের যা অন্ধকারকে আলোকিত এবং দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যাপারসমূহের পরিশুদ্ধ করে। তোমার গজব যেন আমার ওপর নাজিল না হয় তা থেকে তুমি আমাকে রক্ষা করো এবং আমি যেন তোমার ক্রোধ ও তিরস্কারের যোগ্য না হই। তোমার মর্জিতেই আমি সন্তুষ্ট যেন তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। তুমি ছাড়া আর কোনো জোর বা শক্তি নেই।'

৩. এ সুরায় সব গোমরাহীর প্রত্যেকটিকে সংক্ষেপে যুক্তি-প্রমাণসহ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং কাফেরদের এই বলে সাবধান করা হয়েছে যে, তোমরা বিবেক-বুদ্ধি ও যুক্তি-প্রমাণের সাহায্য সত্য ও বাস্তবতা বুঝার চেষ্টা করার পরিবর্তে যদি গোড়ামি ও হঠকারিতার মাধ্যমে কোরআনের দাওয়াত ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতকে প্রত্যাখ্যান করো তাহলে নিজেদের ভবিষ্যত নিজেরাই ধ্বংস করবে। আল্লাহ বলেন-
‘যারা বিশ্বনবির নবুয়তকে অস্বীকার করে এবং পবিত্র কোরআনের সত্যতাও মানে না, তদুপরি মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখে, তাদের যাবতীয় সৎকাজ বরবাদ হয়ে যায়। কেননা ঈমান ও ইখলাস ব্যতিত আল্লাহর নিকট কোনো নেক আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না।'

৪. সুরাটির প্রথম আয়াতে একটি বিষয় সুস্পষ্ট করা হয়েছে, যারা ঈমান না আনা সত্ত্বেও যারা গরিব-দুঃখী সাহায্য করে, ‍দুর্গতদের মাঝে মানবিক সেবা প্রদান করে, তাদের সেবা ও সাহায্য কোনো কাজে আসবে না। এ সুরার মূল আলোচ্য বিষয়গুলো হলো-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তকে প্রমাণ করা; যতক্ষণ কেউ তাকে আল্লাহর নবি হিসেবে মেনে নিবে না, ততক্ষণ পবিত্র কোরআনের সত্যতায় বিশ্বাস করবে না। তাইতো সুরার শুরুতে বিশ্বনবির ওপর কোরআন নাজিল হওয়া রিসালাতের সর্বোচ্চ প্রমাণ।

৫. বিশ্বজাহানের স্রষ্ঠা ও পালনকর্তা আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের প্রমাণ। কারণ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই স্রষ্ঠা, তিনিই পালনকর্তা, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। পৃথিবীর কোনো কিছুই তিনি ব্যতিত আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়নি।

এ সুরার সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা নাফরমান, পাপিষ্ঠদের অনিবার্য ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং এক আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাসী হওয়াই হলো বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষের আবশ্যক কর্তব্য। এ সুরায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি আবেদন ও দোয়া-
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ : রাব্বি আওযিনি আন আশকুরা নিমাতাকাল্লাতি আনআমতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালেদাইয়্যা ওয়া আন আমালা সালিহাং তারদাহু ওয়া আসলিহ লি ফি জুররিয়্যাতি ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমিন।'
অর্থ : হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান কর, যাতে আমি তোমার নেয়ামতের শোকর করি, যা তুমি দান করেছ আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার সন্তানদেরকে সৎকর্মপরায়ণ কর, আমি তোমার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি আজ্ঞাবহদের অন্যতম।' (সুরা আহক্বাফ : আয়াত ১৫)

সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ০১-৩৮
সুরা মুহাম্মাদ মাদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরার আরেকটি নাম হলো 'ক্বিতাল'। সুরাটি ২ ও ২০ নং আয়াতের আলোকে 'মুহাম্মাদ ও ক্বিতাল' নামে নামকরণ করা হয়। কারণ এ সুরায় আল্লাহ তাআলা জেহাদের কথা আলোচনা করেছেন। সুরাটি হিজরতের পরে এমন এক সময় মদিনায় নাজিল হয়েছিল যখন যুদ্ধ করার নির্দেশ হয়েছিল বটে কিছু কার্যত যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি । এ সুরার মূল বক্তব্য আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।

যারা কাফের তথা অস্বীকারকারী, তাঁরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের দুশমন, তারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখে; বিশ্বনবির সত্য-সাধনায় বাধা প্রদান করে; তাদের যাবতীয় সৎকাজ ব্যর্থ। অতপর এ সুরায় মুসলমানদের জেহাদে অংশগ্রহণের আদেশ দেয়া হয়েছে; এবং মুসলমানদের বিজয়ের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ কথার ঘোষণা এসেছে যে, মুসলমান জাতি কখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভের যোগ্য বিবেচিত হবে।

সুরাটির প্রথমেই বলা হয়েছে যে, এখন দুটি দলের মধ্যে মোকাবিলা হচ্ছে । এ দুটি দলের মধ্যে একটি দলের অবস্থান এই যে, তারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । কিন্তু অপর দলটির অবস্থান হলো, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থকে তাঁর বান্দা মুহাম্মাদের ওপর যে সত্য নাজিল হয়েছিল তা তারা মেনে নিয়েছে । এখন আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হলো, প্রথমোক্ত দলটির সমস্ত চেষ্টা-সাধনা ও কাজ-কর্ম তিনি নিষ্ফল করে দিয়েছেন এবং শেষোক্ত দলটির অবস্থা সংশোধন করে দিয়েছেন।

১. মুসলমানদের জেহাদের বিষয়ে প্রাথমিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে । তাদেরকে আল্লাহর সাহায্য ও দিকনির্দেশনার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে । আল্লাহর পথে কুরবানি পেশ করার জন্য তাদেরকে সর্বোত্তম প্রতিদানের আশ্বাস দেয়া হয়েছে । তাদের এ বলে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে যে, ন্যায় ও সত্যের পথে তাদের প্রচেষ্টা বৃথা যাবে না । বরং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই তারা ক্রমান্বয়ে এর অধিক ভাল ফল লাভ করবে । আল্লাহ বলেন-
'তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করবে! একথা শুনলে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়, আল্লাহ কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। তিনি তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করবেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৪-৭)

২. কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহর সাহায্য ও দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত । ঈমানদারদের বিরুদ্ধে তাদের কোন প্রচেষ্টাই কার্যকর হবে না । তারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত খারাপ পরিণামের সুম্মুখীন হবে । তারা আল্লাহর নবীকে মক্কা থেকে বের করে দিয়ে মনে করেছিলো, যে, তারা বড় রকমের সফলতা লাভ করেছে । অথচ এ কাজ করে তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেরা নিজেদের জন্য বড় রকমের ধ্বংস ডেকে এনেছে । আল্লাহ তাআলা বলেন-
'আর যারা কাফের, তাদের জন্যে আছে দুর্গতি এবং তিনি তাদের কর্ম বিনষ্ট করে দিবেন। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন। তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি অতঃপর দেখেনি যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে? আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং কাফেরদের অবস্থা এরূপই হবে।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৮-১০)

৩. মুনাফিকদের উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে । যুদ্ধের নির্দেশ আসার পূর্বে এসব মুনাফিক নিজেদেরকে বড় মুসলমান বলে জাহির করতো । কিন্তু এ নির্দেশ আসার পরে তারা ঘাবড়ে গিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ চিন্তায় কাফেরদের সাথে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেছিল যাতে তারা নিজেদেরকে যুদ্ধের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে । তাদেরকে স্পষ্টভাবে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, যারা আল্লাহ এবং তাঁর দীনের সাথে মুনাফিকীর আচরণ করে তাদেরকে কোন আমলই আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না। আল্লাহ বলেন-
'তাদের মধ্যে কতক আপনার দিকে কান পাতে, অতপর যখন আপনার কাছ থেকে বাইরে যায়, তখন যারা শিক্ষিত, তাদেরকে বলে, এইমাত্র তিনি কি বললেন ? এদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ১৬)

৪. এরপর মুসলমানদের উপদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন নিজেদের সংখ্যাল্পতা ও সহায় সম্বলহীনতা এবং কাফেরদের সংখ্যাধিক্য ও সহায় সম্বলের প্রাচুর্য দেখে সাহস না হারায় এবং তাদের সাছে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ না করে। এতে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের দুঃসাহস আরো বেড়ে যাবে। বরং তারা যেন আল্লাহর ওপর নির্ভর করে বাতিলকে রুখে দাঁড়ায় এবং কুফরের এ অগ্রাসী শক্তির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আল্লাহ মুসলমানদের সাথে আছেন। তারাই বিজয়ী হবে এবং তাদের সাথে সংঘাতে কুফরী শক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَاعۡلَمۡ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ وَ اسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۡۢبِکَ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡلَمُ مُتَقَلَّبَکُمۡ وَ مَثۡوٰىکُمۡ
'জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই। ক্ষমাপ্রার্থনা করুন, আপনার ক্রটির জন্যে এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্যে। আল্লাহ, তোমাদের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ১৯)

طَاعَۃٌ وَّ قَوۡلٌ مَّعۡرُوۡفٌ ۟ فَاِذَا عَزَمَ الۡاَمۡرُ ۟ فَلَوۡ صَدَقُوا اللّٰهَ لَکَانَ خَیۡرًا لَّهُمۡ
'তাদের আনুগত্য ও মিষ্ট বাক্য জানা আছে। অতএব, জেহাদের সিন্ধান্ত হলে যদি তারা আল্লাহর প্রতি পদত্ত অংগীকার পূর্ণ করে, তবে তাদের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ২১)

مَثَلُ الۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ فِیۡهَاۤ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ مَّآءٍ غَیۡرِ اٰسِنٍ ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ لَّبَنٍ لَّمۡ یَتَغَیَّرۡ طَعۡمُهٗ ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ خَمۡرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیۡنَ ۬ۚ وَ اَنۡهٰرٌ مِّنۡ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَ لَهُمۡ فِیۡهَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ وَ مَغۡفِرَۃٌ مِّنۡ رَّبِّهِمۡ ؕ کَمَنۡ هُوَ خَالِدٌ فِی النَّارِ وَ سُقُوۡا مَآءً حَمِیۡمًا فَقَطَّعَ اَمۡعَآءَهُمۡ
'পরহেযগারদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তার অবস্থা নিম্নরূপ- তাতে আছে পানির নহর, নির্মল দুধের নহর যারা স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তথায় তাদের জন্যে আছে রকমারি ফল-মূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা। পরহেযগাররা কি তাদের সমান, যারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি অতপর তা তাদের নাড়িভূঁড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেবে?' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ১৫)

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰهَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ لَا تُبۡطِلُوۡۤا اَعۡمَالَکُمۡ
'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৩৩)

'অতএব, তোমরা হীনবল হয়ো না এবং সন্ধির আহবান জানিও না, তোমরাই হবে প্রবল। আল্লাহই তোমাদের সাথে আছেন। তিনি কখনও তোমাদের কর্ম হ্রাস করবেন না। পার্থিব জীবন তো কেবল খেলাধুলা, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও এবং সংযম অবলম্বন কর, আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান দেবেন এবং তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ চাইবেন না।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৩৫-৩৬)

সর্বশেষে মুসলমানদেরকে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করার আহবান জানানো হয়েছে। যদিও সে সময় মুসলমানদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। কিন্তু সামনে প্রশ্ন ছিল এই যে, আরবে ইসলাম এবং মুসলমানরা টিকে থাকবে কি থাকবে না। এ প্রশ্নের গুরুত্ব ও নাজুকতার দাবী ছিল এই যে, মুসলমানরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের দীনকে কুফরের আধিপত্যের হাত থেকে রক্ষা করার এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য তাদের জীবন কুরবানি করবে এবং যুদ্ধ প্রস্তুতিতে নিজেদের সমস্ত সহায় সম্পদ যথা সম্ভব অকৃপণভাবে কাজে লাগাবে । সুতরাং মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, এ মুহুর্তে যে ব্যক্তি কৃপণতা দেখাবে সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কোন ক্ষতিই করতে পারবে না , বরং নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করবে । আল্লাহ মানুষের মুখাপেক্ষী নন । আল্লাহ বলেন-
هٰۤاَنۡتُمۡ هٰۤؤُلَآءِ تُدۡعَوۡنَ لِتُنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۚ فَمِنۡکُمۡ مَّنۡ یَّبۡخَلُ ۚ وَ مَنۡ یَّبۡخَلۡ فَاِنَّمَا یَبۡخَلُ عَنۡ نَّفۡسِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ الۡغَنِیُّ وَ اَنۡتُمُ الۡفُقَرَآءُ ۚ وَ اِنۡ تَتَوَلَّوۡا یَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَیۡرَکُمۡ ۙ ثُمَّ لَا یَکُوۡنُوۡۤا اَمۡثَالَکُمۡ
'শুন, তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার আহবান জানানো হচ্ছে, অতঃপর তোমাদের কেউ কেউ কৃপণতা করছে। যারা কৃপণতা করছে, তারা নিজেদের প্রতিই কৃপণতা করছে। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্থ। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না।' (সুরা মুহাম্মাদ : আয়াত ৩৮)

এ সুরায় মক্কার কাফেরদের ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে মদিনার মুনাফিকদের চক্রান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এবং এ সুরার সমাপ্তিতে মুসলিম জাতিকে আল্লাহর রাহে জিহাদের আহ্বান করা হয়েছ। কেননা জিহাদের মাধ্যমেই মুসলিম জাতি বিজয় ও সাফল্য অর্জন করতে পারে।

সুরা ফাতহ : আয়াত ০১-২৯
সুরাটি মদিনায় অবতীর্ণ। যা ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কেন্দ্র করেই নাজিল হয়। আলোচ্য সুরায় মুসলমানদের বিজয়ের সুসংবাদ রয়েছে। প্রকৃত ‍মুমিনদের গুণাবলী, ইখলাস, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য ও সহনশীলতা সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার প্রতি আনুগত্য এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পরিপূর্ণ আনুগত্য প্রভৃতি গুণাবলীর কারণে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে যে সুস্পষ্ট ও মহান বিজয় দান করেছেন এ সুরায় তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

১. প্রথম তিন আয়াতেই চূড়ান্ত বিজয় ও প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার ও সাহায্য করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয় আমি আপনার জন্যে এমন একটা ফয়সালা (বিজয়ের ব্যবস্থা) করে দিয়েছি, যা সুস্পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতিত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আপনাকে দান করেন বলিষ্ঠ সাহায্য।' (সুরা ফাতহ : আয়াত ১-৩)

২. মুমিন মুসলমানের ঈমান বেড়ে যাওয়ার বিষয় সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। যা তাদের জন্য মহা সাফল্য। আল্লাহ বলেন-
' তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। ঈমান এজন্যে বেড়ে যায়, যাতে তিনি ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তারা চিরকাল বসবাস করবে এবং যাতে তিনি তাদের পাপ মোচন করেন। এটাই আল্লাহর কাছে মহাসাফল্য।' (সুরা ফাতহ : আয়াত ৪-৫)

৩. মক্কা বিজয়ের সুস্পষ্ট ঘোষণা তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
لَقَدۡ صَدَقَ اللّٰهُ رَسُوۡلَهُ الرُّءۡیَا بِالۡحَقِّ ۚ لَتَدۡخُلُنَّ الۡمَسۡجِدَ الۡحَرَامَ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ اٰمِنِیۡنَ ۙ مُحَلِّقِیۡنَ رُءُوۡسَکُمۡ وَ مُقَصِّرِیۡنَ ۙ لَا تَخَافُوۡنَ ؕ فَعَلِمَ مَا لَمۡ تَعۡلَمُوۡا فَجَعَلَ مِنۡ دُوۡنِ ذٰلِکَ فَتۡحًا قَرِیۡبًا
'আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়।' (সুরা ফাতহ : আয়াত ২৭)

৪. প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লােম ও তার সাথীগণ কাফের প্রতি কঠোর হলেও নিজেদের পরস্পরের প্রতি ছিল খুবই দয়াবান। আল্লাহ তাআলা তা তুলে ধরে বলেন-
مُحَمَّدٌ رَّسُوۡلُ اللّٰهِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَهُمۡ تَرٰىهُمۡ رُکَّعًا سُجَّدًا یَّبۡتَغُوۡنَ فَضۡلًا مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضۡوَانًا ۫ سِیۡمَاهُمۡ فِیۡ وُجُوۡهِهِمۡ مِّنۡ اَثَرِ السُّجُوۡدِ ؕ ذٰلِکَ مَثَلُهُمۡ فِی التَّوۡرٰىۃِ ۚۖۛ وَ مَثَلُهُمۡ فِی الۡاِنۡجِیۡلِ ۚ۟ۛ کَزَرۡعٍ اَخۡرَجَ شَطۡـَٔهٗ فَاٰزَرَهٗ فَاسۡتَغۡلَظَ فَاسۡتَوٰی عَلٰی سُوۡقِهٖ یُعۡجِبُ الزُّرَّاعَ لِیَغِیۡظَ بِهِمُ الۡکُفَّارَ ؕ وَعَدَ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ مِنۡهُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا
'মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন। তওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা যেমন একটি চারা গাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কান্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে-চা ষীকে আনন্দে অভিভুত করে-যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন।' (সুরা ফাতহ : আয়াত ২৯)

সুরা হুজরাত : আয়াত ০১-১৮
এ সুরাটিও মদিনায় অবতীর্ণ। মুসলমানদের ঈমান উপযোগী আদব-কায়দা ও নিয়ম-নীতির শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কোনো কিছু শুনার পর সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করার পূর্বে সে বিষয়ে সুক্ষ্ন, বিশ্বস্তসূত্র ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনে ভাঙ্গন, বিপর্যয় বা অশান্তি সৃষ্টি করে এমন সব অন্যায় ও অনুচিত কাজ-কর্ম হতে বিরত থাকতে মুসলিম উম্মাহকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ সুরায়। যেমন-পরস্পরকে ঠাট্টা-বিদ্রোপ, গালাগালি, মন্দ নামে ডাকা, অন্যের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ ও পরনিন্দার চর্চা করা।

সুরাটির শুরুতেই আল্লাহর রাসুলের সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে সংযত হওয়ার শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং তাকে ভয় করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
'মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন। মুমিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।' (সুরা হুজরাত : আয়াত ১-২)

মুমিনরা এক অপরের ভাই। তাই পরস্পরের মাঝে কোনো সমস্যা বা দ্বন্দ্ব হলে তা মিটিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পরস্পরকে মন্দ নামে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে আর তা থেকে বিরত থাকায় রয়েছে কল্যাণ। আল্লাহ বলেন-
'মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম।' (সুরা হুজরাত : আয়াত ১০-১১)

মন্দ ধারণা কী? কেন ধারণা করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে?
এ সুরায় মন্দ ধারণা করা থেকে বিরত থাকার বিষয়টিও ফুটে ওঠেছে। আর তা জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ وَّ لَا تَجَسَّسُوۡا وَ لَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡهِ مَیۡتًا فَکَرِهۡتُمُوۡهُ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ
'মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গুনাহ। আর গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।' (সুরা হুজরাত : আয়াত ১২)

এই আয়াতে পারস্পরিক হক ও সামাজিক রীতি-নীতি ব্যক্ত হয়েছে এবং এতে তিনটি বিষয় হারাম করা হয়েছে-
১. ধারণা;
২. কোনো গোপন দোষ সন্ধান করা এবং
৩. গীবত। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কথা বলা; যা সে শুনলে অসহনীয় মনে করতো।

প্রথম বিষয় : الظن বা প্ৰবল ধারণা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কারও আল্লাহর প্রতি সু-ধারণা পোষণ ছাড়া মৃত্যুবরণ করা উচিত নয়।' (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

অন্য এক হাদিসে এসেছে, 'আমি আমার বান্দার সঙ্গে তেমনি ব্যবহার করি, যেমন সে আমার সম্বন্ধে ধারণা রাখে। এখন সে আমার প্রতি যা ইচ্ছা ধারণা রাখুক।' (মুসনাদে আহমাদ)

এ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা ফরজ এবং কু-ধারণা পোষণ করা হারাম।

এমনিভাবে যেসব মুসলিম বাহ্যিক অবস্থার দিক দিয়ে সৎকর্মপরায়ণ দৃষ্টিগোচর হয়, তাদের সম্পর্কে প্রমাণ ব্যতিরেকে কু-ধারণা পোষণ করা হারাম। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কেননা, ধারণা মিথ্যা কথার নামান্তর।’ (বুখারি, মুসলিম)

দ্বিতীয় নিষিদ্ধ বিষয় : কারও দোষ সন্ধান করা। এর দ্বারা নানা রকম ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়। এ কারণে একবার নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খুতবার দোষ অন্বেষণকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, 'হে সেই সব লোকজন! যারা মুখে ঈমান এনেছো কিন্তু এখনো ঈমান তোমাদের অন্তরে প্ৰবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের গোপনীয় বিষয় খোঁজে করিও না। যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ-ত্রুটি তালাশ করে বেড়াবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটির অন্বেষণে লেগে যাবেন। আর আল্লাহ যার ত্রুটি তালাশ করেন তাকে তার ঘরের মধ্যে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।' (আবু দাউদ)

হজরত মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি নিজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তুমি যদি মানুষের গোপনীয় বিষয় জানার জন্য পেছনে লাগো। তাদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে কিংবা অন্তত বিপর্যয়ের দ্বার প্রান্তে পৌছে দেবে।' (আবু দাউদ)

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'মুসলিমদের গিবত করো না এবং তাদের দোষ অনুসন্ধান করো না। কেননা, যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন, তাকে নিজ ঘরেও লাঞ্ছিত করে দেন।' (আবু দাউদ)

দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান না করার এ নির্দেশ শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, বরং দায়িত্বশীল এবং সমাজেরও। এ ক্ষেত্রে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ ঘটনা অতীব শিক্ষাপ্ৰদ। একবার রাতের বেলা তিনি এক ব্যক্তির কণ্ঠ শুনতে পেলেন। সে গান গাইতেছিল। তাঁর সন্দেহ হলো। তিনি তার সঙ্গী আব্দুর রহমান ইবন আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, এ ঘরটি কার? বলা হলো- এটা রবীআ ইবন উমাইয়া ইবন খালফ এর ঘর। তারা এখন শরাব খাচ্ছে। আপনার কি অভিমত?


এরপর আব্দুর রাহমান ইবন আওফ বললেন, আমার অভিমত হচ্ছে যে, আমরা আল্লাহ যা নিষেধ করেছে তা-ই করে ফেলছি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করে বলেছেন, 'তোমরা গোপন বিষয়ে অন্বেষণ করো না' (সুরা হুজুরাত : আয়াত ১২)

তখন ওমর ফিরে আসলেন এবং তাকে ছেড়ে গেলেন। (মুস্তাদরাকে হাকেম, মাকারিমুল আখলাক, মুসান্নাফে আব্দির রাজ্জাক)

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, খুঁজে খুঁজে মানুষের গোপন দোষ-ত্রুটি বের করা এবং তারপর তাদেরকে পাকড়াও করা শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি সমাজ বা সরকারের জন্যও বৈধ নয়। হাদিসে আরও এসেছে-
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'শাসকরা যখন সন্দেহের বশে মানুষের দোষ অনুসন্ধান করতে শুরু করে তখন তাদের চরিত্র নষ্ট করে দেয়।' (আবু দাউদ)

নিষিদ্ধ তৃতীয় বিষয় : গিবত। গিবতের সংজ্ঞায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কারো এমন কথা বলা যা শুনলে সে অপছন্দ করবে।' প্রশ্ন হলো- আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থেকে থাকে তাহলে আপনার মত কি? তিনি বললেন, তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলেই তো তুমি তার গিবত করলে। আর তা যদি না থাকে তাহলে অপবাদ আরোপ করলে।' (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি)

এই আয়াতে তিনটি বিষয় নিষিদ্ধ করতে গিয়ে গিবতের নিষিদ্ধতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং একে মৃত মুসলিমের মাংস ভক্ষণের সমতুল্য প্রকাশ করে এর নিষিদ্ধতা ও নীচতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মেরাজের রাতের হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তারপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছ দিয়ে গেলাম যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহের মাংস আচড়াচ্ছিল। আমি জিবরিল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা তাদের ভাইয়ের গিবত করতো এবং তাদের ইজ্জতহানি করতো। '(মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ)

পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন মুসলমানকে ঈমান গ্রহণের তাওফিক দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। এ কথার ঘোষণা এভাবে এসেছে-
'বলুনঃ তোমরা কি তোমাদের ধর্ম পরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহকে অবহিত করছ? অথচ আল্লাহ জানেন যা কিছু আছে ভূমন্ডলে এবং যা কিছু আছে নভোমন্ডলে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না। বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাক।' (সুরা হুজরাত : আয়াত ১৬-১৭)

সর্বোপরি এ সুরায় সাধনার মাধ্যমে মুসলমানের আত্মশুদ্ধি অর্জনের বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ হয়েছে।

সুরা ক্বাফ : আয়াত ০১-৪৫
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা ক্বাফে পরকাল, কিয়ামাত, মৃতদের পুনরুজ্জীবন ও হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। এ সময় ইসলামবিরোধীদের আচরণ খুব বাজে অবস্থায় পৌছেছিল ঠিকই কিন্তু তখনো মুসলমানদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন শুরু হয়নি, তখন সুরাটি নাজিল হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরাটি বেশি বেশি পড়তেন।

উম্মে হিশাম ইবনে হারেসা নামে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক নারী প্রতিবেশি বর্ণনা করেছেন- প্রায়ই আমি প্রিয় নবির মুখ থেকে জুমআর খুতবায় এ সুরাটি শুনতাম এবং শুনতে শুনতেই তা আমার মুখস্থ হয়েছে। অপর কিছু রেওয়ায়াতে আছে যে, তিনি বেশির ভাগ ফজরের নামাযেও এ সুরাটি পাঠ করতেন। এ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নবীর দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরা। সে জন্য এর বিষয়বস্তু অধিক সংখ্যক লোকের কাছে পৌছানোর জন্য বারবার চেষ্টা করতেন।

সুরাটির মূল বক্তব্য হলো- বিশ্ব সৃষ্টির প্রথম অবস্থা; মৃত্যুর পর পুনর্জীবন; আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান হওয়ার বিষয়; ভালো ও মন্দের হিসাব-নিকাশ; জান্নাতের সুখ-শান্তি ও জাহান্নামের আযাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। সর্বোপরি মানুষকে জান্নাতের জন্য অনুপ্রাণিত করে দোজখের প্রতি ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।

এ সুরায় মুত্তাকিদের গুণ ও প্রাপ্তির বর্ণনা ওঠে এসেছে। যারা আল্লাহকে ভয় করবে, তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার। আল্লাহ বলেন-
জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে খোদাভীরুদের অদূরে। তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারীকে এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। যে না দেখে দয়াময় আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করত এবং বিনীত অন্তরে উপস্থিত হত। তোমরা এতে শান্তিতে প্রবেশ কর। এটাই অনন্তকাল বসবাসের জন্য প্রবেশ করার দিন। তারা তথায় যা চাইবে, তাই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে আরও অধিক।' (সুরা ক্বাফ : আয়াত ৩১-৩৫)

সুরা যারিয়াত : আয়াত ০১-৬০
সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। একত্ববাদ, নবুয়ত ও হাশরের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে সুরাটিতে। সুরার প্রথম শব্দ আয যারিয়াত থেকে এর নাম নেয়া হয়েছে। যে সময় প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসলামী আন্দোলনের মোকাবিলা অস্বীকৃতি, ঠাট্রা-বিদ্রুপ ও মিথ্যা অভিযোগ আরোপের মাধ্যমে অত্যন্ত জোরে শোরেই করা হচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু তখনো জুলুম ও নিষ্ঠুরতা-নিষ্পেষণ শুরু হয়নি, ঠিক সেই যুগে সুরাটি নাজিল হয়।

এর অধিকাংশটাই জুড়ে আছে আখেরাত সম্পর্কিত আলোচনা এবং শেষভাগে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করা হয়েছে। সাথে সাথে মানুষকে এ বিষয়েও হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে যে, নবি-রাসুলদের কথা না মানা এবং নিজেদের জাহেলী ধ্যান-ধারণা আকড়ে ধরে একগুঁয়েমী করা সেসব জাতির নিজেদের জন্যই ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে যারা এ নীতি অবলম্বন করেছিলো ।

এ সুরার ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত অর্থপূর্ণ আয়াতসমূহে আখেরাত সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে, মানব জীবনের পরিণাম ও পরিণতি সম্পর্কে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করে । এটাই প্রমাণ করে যে, এসব আকীদা-বিশ্বাসের কোনটিই জ্ঞানগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

প্রত্যেকেই নিজের অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে নিজ নিজ অবস্থানে যে মতবাদ গড়ে নিয়েছে সেটাকেই সে তার আঁকিদা-বিশ্বাস বানিয়ে আঁকড়ে ধরেছে। কেউ মনে করে নিয়েছে, মৃত্যুর পরে কোন জীবন হবে না। কেউ আখেরাত মানলেও জন্মান্তর বাদের ধারণাসহ মেনেছে। কেউ আখেরাতের জীবন এবং পুরস্কার ও শাস্তির কথা বিশ্বাস করলেও কর্মের প্রতিফল থেকে বাঁচার জন্য নানা রকমের সহায় ও অবলম্বন কল্পনা করে নিয়েছে।

যে বিষয়ে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার গোটা জীবনকেই ব্যর্থ এবং চিরদিনের জন্য তার ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দেয় এমন একটি বড় ও সর্বাধিক গুরুত্ববহ মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান ছাড়া শুধু অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে কোন আকীদা-বিশ্বাস গড়ে নেয়া একটি সর্বনাশা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

এরপর অতি সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করে বলা হয়েছে তোমাদের স্রষ্টা তোমাদেরকে অন্যদের বন্দেগী ও দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করেননি, বরং নিজের বন্দেগে ও দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন । তিনি তোমাদের মিথ্যা উপাস্যদের মত নন । তোমাদের মিথ্যা উপাস্যরা তোমাদের থেকে রিযিক গ্রহন করে এবং তোমাদের সাহায্য ছাড়া তাদের প্রভুত্ব অচল । তিনি এমন উপাস্য যিনি সবার রিযিকদাতা । তিনি কারো নিকট থেকে রিযক গ্রহণের মুখাপেক্ষী নন এবং নিজ ক্ষমতাবলেই তার প্রভুত্ব চলছে ।

অতপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তিনি এসব বিদ্রোহীদের আদৌ ভ্রুক্ষেপ না করেন এবং নিজের দাওয়াত ও নসিহতের কাজ চালিয়ে যান । কারণ, তা এ লোকদের কোনো উপকারে না আসলেও ইমানদারদের জন্য অবশ্যই উপকারে আসবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কোরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরাগুলো বুঝে পড়ার এবং তাঁর ওপর আমল করার পাশাপাশি নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/কেএসআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]