উৎপাদন বাড়লেও বছরে ঘাটতি ২০১ কোটি ডিম

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৫৬ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০১৭
উৎপাদন বাড়লেও বছরে ঘাটতি ২০১ কোটি ডিম

প্রতি বছরই ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। তবুও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় বছরে ২০০ কোটি ৮৫ লাখ পিস ডিমের ঘাটতি রয়েছে।

অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিস ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। আর চাহিদা রয়েছে এক হাজার ৬৯৪ কোটি ১৬ লাখ। যার মধ্যে একটি অংশ বেকারির বিস্কুট, কেক, পুডিং ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়। এছাড়া বাকিগুলো সরাসরি বিক্রি হয় ভোক্তাদের কাছে। এ হিসাবে প্রতি বছর বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় ২০০ কোটি ৮৫ লাখ পিস ডিমের ঘাটতি রয়েছে।

পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন হয়েছে ৫৬৫ কোটি ৩২ লাখ পিস। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৪৬৯ কোটি ৬১ লাখ। এরপর ধারাবাহিকভাবে ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন দাঁড়ায় ৭৬১ কোটি ৭৪ লাখ পিস। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয় এক হাজার ১৬ কোটি ৮০ লাখ পিস। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৯৯ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ১৯১ কোটি ২৪ লাখ।

সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন হয় এক হাজার ৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিস। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাহিদা ছিল এক হাজার ৬৯৪ কোটি ১৬ লাখ পিস।

বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি (বিপিআইসিসি) সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ডিম নানা খাদ্যপণ্যে ব্যবার হচ্ছে। এ চাহিদার ওপর গড়ে উঠেছে বিশাল এক বাণিজ্য। এর সঙ্গে দেশের পোলট্রি খাত, ডিম সরবরাহকারী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জড়িত। দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সোয়া দুই কোটি পিস ডিম লাগছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩০ কোটি ৬৮ লাখ টাকার। আর বছরে ডিম বাণিজ্য ঘিরে লেনদেন হচ্ছে ১১ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া একজন মানুষ বছরে সরাসরি ডিম খাচ্ছে ৪৫-৫০টি। এ হিসাবে প্রতিদিন খাওয়ার জন্য ডিম কেনা হচ্ছে ১৬ কোটি টাকার।

সম্ভাবনাময় ডিম ব্যবসা সরাসরি যুক্ত পোলট্রি খাতের সঙ্গে। এ বিষয়ে বিপিএসসিসি বলছে, গার্মেন্টের পর পোলট্রি খাতে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান বেশি, যে সংখ্যা বর্তমানে ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এ খাতে বর্তমানে বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। আর জিডিপিতে পোলট্রির অবদান ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরাসরি পোলট্রি ব্যবসার সঙ্গে ৬০ লাখ মানুষ যুক্ত থাকলেও ডিমের বিষয়টি আলাদা। ডিম রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফুটপাতের ব্যবসা, তারকা হোটেলের অন্যতম আনুষঙ্গিক খাদ্য। তাই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান।

পোলট্রি খাত অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে পোলট্রি শিল্পে বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১ সালে দেশে বছরে ডিমের প্রয়োজন হবে দুই হাজার ৪৮০ কোটি পিস। আর প্রতিদিন প্রয়োজন হবে চার কোটি পিস। এ চাহিদা পূরণ করতে হলে ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৫-১৮ শতাংশ। ২০০৭ সালের আগে তা ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। জিডিপিতে পোলট্রি খাতের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে।

প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বাড়ছে। এ হিসাবে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় সাড়ে চার কোটি ডিম এবং প্রায় সাড়ে তিন-চার হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। মাংস ও মুরগির এ চাহিদা মেটাতে পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে বাড়তি ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আমানাতুল্লাহ জানান, ৮৬টি ডিমের আড়তে গড়ে প্রতি রাতে ৫০-৫৫ হাজার ডিম বিক্রি হয়। এসব আড়তে প্রায় ৭০০-৮০০ কর্মচারী রয়েছেন। সবার আয়ের উৎস ডিম বেচাকেনা। ৮৬টি আড়তেই রয়েছে বেতনভুক্ত কর্মচারী। গড়ে এসব কর্মচারীকে ৫-৬ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হয়। এছাড়া থাকা ও তিন বেলা খাওয়া খরচ বহন করে আড়তগুলো।

ডিমের চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়াতে করণীয় কী- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমদ সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, পোলট্রি খাত একটি কৃষিভিত্তিক খাত। দেশে সেচ খাতে যেমন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এক টাকায় দেয়া হয়েছে। আমরাও এ খাতে এক টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ চাই। মুরগির বিভিন্ন রোগের টিকা সব আমদানিনির্ভর। দেশে এ ধরনের টিকা উৎপাদন করলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়।

‘মহাখালীতে মুরগির বিভিন্ন রোগের টিকা পাওয়া গেলেও তা নিয়মিত নয়। আমরা চাই সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের টিকা উৎপাদন করা হোর’- যোগ করেন তিনি।

এমইউএইচ/একে/এমএআর/বিএ