পেঁয়াজেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ, মন্ত্রী-সচিবের কাজটা কী?

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩৫ পিএম, ০১ ডিসেম্বর ২০১৯

গোলাম রহমান। সভাপতি, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ আমলা।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, ভোক্তা অধিকার, সরকারের দায় নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দীর্ঘ আলোচনায় দুর্নীতি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়েও আলোকপাত করেন এ বিশ্লেষক। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : পেঁয়াজে বিপর্যস্ত বাজার। সরকারও বেসামাল পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। আপনি ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দায়িত্ব পালন করছেন। কী বলবেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে?

গোলাম রহমান : ২০১৭ সালেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল। পরিস্থিতি এত জটিল হয়নি। এবার পরিস্থিতি জটিল হয়েছে, কারণ বিশ্বব্যাপী পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়েছে। ভারত, শ্রীলংকায়ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।

মার্কেট যখন ফেল করে, তখন সরকারকে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতে হয়। প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের অর্থ হলো, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার ব্যবসা করবে না, কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করবে।

চালের ক্ষেত্রে আমরা এমনটি দেখতে পাই। চাল উৎপাদন কমে গেলে বা ব্যবসায়ীরা আমদানি না করলে সরকার জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনে। সরকার সরাসরি বিক্রিতেও অংশ নেয়। বাজারে ভারসাম্য চলে আসে।

চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিতেই সাধারণত পণ্যের দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে। যদি চাহিদা কমে আসে অথবা সরবরাহ বেড়ে যায়, তাহলে দাম কমে আসবে। এর উল্টো ঘটলে দাম বেড়ে যাবে।

জাগো নিউজ : এবার পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কী ঘটল?

গোলাম রহমান : পেঁয়াজের বাজারে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের দরকার ছিল। অথচ, কার্গো বিমানে করে বিশেষ পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে এখন। যদিও এটি ব্যয়বহুল। কিন্তু সরকারকে এমনটিই করতে হয়।

সরকার পেঁয়াজের বাজারে এখন যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যদি আগে থেকে করত, তাহলে আজকের পরিস্থিতি দেখতে হতো না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে বিলম্ব, তার-ই মাশুল দিতে হচ্ছে এখন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাজার ব্যবস্থাপনায় সবসময় বাজারের ওপর নির্ভর করলে চলে না। কখনও কখনও সরকারকে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতে হয়। এটিই মূলত সরকারের দায়িত্ব।

জাগো নিউজ : হস্তক্ষেপ প্রশ্নে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিল কি-না?

গোলাম রহমান : এক বাক্যে সরকারকে ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না। ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার যে ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিল, তা পায়নি।

জাগো নিউজ : মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীরা মুনাফাকেই বড় করে দেখে। জনদায় গুরুত্ব নাও পেতে পারে। কিন্তু সরকার তো দায় এড়াতে পারে না।

গোলাম রহমান : ঠিকই বলেছেন। ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য বড় ধরনের ভর্তুকি ব্যবসায়ীদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। কারণ জনকল্যাণের জন্যই সরকার। জনকল্যাণে সরকারকে যেকোনো উপায়ে ব্যবস্থা নিতেই হবে। ব্যবসায়ীরা তা পারবেন না।

সরকার ঠিকই ব্যবস্থা নিলো, তবে জনদুর্ভোগ চরমে উঠিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হলো সবাইকে। পেঁয়াজেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ! মন্ত্রী-সচিবের কাজটা কী? সরাসরি আমদানি করা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অংশগ্রহণই অধিক কার্যকর। কিন্তু দুই বা তিন মাস আগে থেকে তারা কী করলেন? নিজেরা আলোচনায় বসলেন না কেন? এমন প্রশ্ন যে কেউ-ই তুলতে পারেন।

জাগো নিউজ : ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের পরই বাজার নিয়ন্ত্রণ হারালো। ভারতের ওপর একক নির্ভরতার কারণেই কি আজকের পরিস্থিতি?

গোলাম রহমান : প্রত্যেক দেশই বা ব্যবসায়ীদের নিজস্ব স্বার্থ থাকে। তারা তো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম না। ভারত থেকে আমদানি করলে মুনাফা বেশি এবং সহজেই আমদানি করা যায়। মিশর থেকে আমদানি করলে যদি বেশি লাভ হতো, তাহলে ব্যবসায়ীরা তা-ই করত।

পণ্যের ধরন এবং ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমাদের ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়। পেঁয়াজ একটি পচনশীল দ্রব্য। ভারত থেকে আমদানি করলে ঝুঁকি কম।

জাগো নিউজ : হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়া, ভারতের অসৌজন্যমূলক আচরণ মনে করছেন অনেকে…

গোলাম রহমান : ভারতের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি নেই যে, ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদন না হলেও বাংলাদেশে রফতানি করতে হবে। আমরা তো ইলিশ মাছ রফতানি বন্ধ করেছিলাম ভারতে। আমরা অন্য দেশেও শাকসবজি রফতানি বন্ধ করেছি।

ভারত রফতানি বন্ধ করেছে, কারণ তাদের উৎপাদন ভালো হয়নি। ভারতেও পেঁয়াজের দাম বেশি। ভারত তো নিজেদের চাহিদা পূরণ না করে আপনার চাহিদা পূরণ করবে না।

তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু ভারতের নিবিড় সম্পর্ক, সুতরাং একদিনের ঘোষণায় রফতানি বন্ধ করার আগে বাংলাদেশকে সতর্ক করা উচিত ছিল। ভারত আগে থেকে আভাস দিলে বাংলাদেশ অন্য প্রস্তুতি নিতে পারত।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

ভারতের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি নেই যে, পেঁয়াজ উৎপাদন না হলেও বাংলাদেশে রফতানি করতে হবে। আমরা তো ইলিশ মাছ রফতানি বন্ধ করেছিলাম

এক বাক্যে সরকারকে ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না। ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার যে ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছিল, তা পায়নি

বাজার ব্যবস্থাপনায় সবসময় বাজারের ওপর নির্ভর করলে চলে না। কখনও কখনও সরকারকে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতে হয়

প্রত্যেক দেশই বা ব্যবসায়ীদের নিজস্ব স্বার্থ থাকে। তারা তো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]