৮ বছর পর ভাগ্য খুলছে মাধ্যমিকের শিক্ষকদের

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫০ পিএম, ২১ মার্চ ২০১৮ | আপডেট: ০৯:৫৩ পিএম, ২১ মার্চ ২০১৮
ছবি-ফাইল

আট বছর পর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি হচ্ছে। মামলা, পদমর্যাদা পরিবর্তন হওয়াসহ নানা জটিলতার কারণে শিক্ষকদের পদোন্নতি স্থগিত হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেকেই ভারপ্রাপ্ত পদবি নিয়ে অবসরে যান। এ সংকট কাটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুনভাবে পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সারা দেশে ৩১৭টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। দুই শিফটে সাত হাজার ৭৪৬টি সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার পদ রয়েছে। সেখানে প্রায় দুই হাজার ২৭৪টি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষক শূন্য রয়েছে ১৪০টি বিদ্যালয়ে। এছাড়া চাকরির শেষ সময়ে এসেও পদোন্নতি না হওয়ায় ৪৫৭ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়ে আছেন।

জানা গেছে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দূরীকরণে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের সভাপত্বিতে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শিক্ষক সংকট নিরসনে নতুন করে শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

মাউশির পরিচালক (বিদ্যালয়) অধ্যাপক আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, মামলাসহ নানা জটিলতায় গত আট বছর ধরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি বন্ধ ছিল। বর্তমানে আমরা শিক্ষক সংকট দূরীকরণের উদ্যোগ নিয়েছি। এ প্রস্তাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষকদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। সেটি চূড়ান্ত হলে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেয়া হবে।

প্রস্তাবনা তালিকায় দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেয়া হবে। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক, ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষকদের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে বসানোর প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের গ্রেড পরিবর্তন হওয়া ও পদোন্নতি জন্য তাদের মামলার কারণে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনেক দিন পদোন্নতি বন্ধ ছিল। এ কারণে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা সমস্যা দেখা দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। এসব কারণে এ স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাব্যবস্থার মান কমে যাচ্ছে। এসব আমলে নিয়ে দ্রুত শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

জানা গেছে, নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদটি প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা ছিল। সহকারী শিক্ষকের পদটি তৃতীয় শ্রেণির ছিল। তবে ২০১২ সালের ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঘোষণার মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করেন।

সন্তোষজনকভাবে আট বছর চাকরির পর তাদের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড (নন-ক্যাডার) মর্যাদা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তাদের পদবিও পরিবর্তন হবে। আট বছর চাকরির পর তারা পদোন্নতি পেয়ে ‘সিনিয়র শিক্ষক’ হবেন। যেহেতু সহকারী শিক্ষকদের মোট পদের অর্ধেক প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে, তাই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এ পদোন্নতি দেয়া হবে। এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও দেয়া হয়নি।

তবে এতেও খুশি ছিলেন না শিক্ষকরা। কারণ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সীমিত হওয়ায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করলেও অনেককেই ৩০ বছর একই পদে থেকে অবসরে যেতে হয়। এমনকি পদের নামেরও কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলে দ্বিতীয় শ্রেণির ঘোষণা পেয়েও শিক্ষকরা মানববন্ধন, আলোচনা, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে যান। অনেকে মামলা পর্যন্ত করেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি সহকারী শিক্ষকদের চাকরির আট বছর পর প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ করে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মোট পদের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ তিন হাজার ৮৮২টি পদ সিনিয়র শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসেবে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯ অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক হিসেবে তারা দশম বেতন স্কেলে (৮০০০-১৬৫৪০ টাকা) বেতন পেতেন। কিন্তু এখন তারা আট বছর সন্তোষজনক চাকরি শেষে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হবেন। তারা জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯ অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির গেজেটেড (নন-ক্যাডার) পদে নবম স্কেলে (১১০০০-২০৩৭০ টাকা) বেতন পাবেন। তবে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেতে তাদের ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন, বিএড, বিপিএড বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে।

মাউশি সূত্র জানায়, ৩১৭টি সরকারি স্কুলে ৬০ জন প্রধান শিক্ষক, ৪৫০ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রায় দুই হাজার সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আর পদোন্নতির জন্যও মাউশির প্রস্তাবনা সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হয়েছে। ফলে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে অনেকেই সহকারী প্রধান শিক্ষক হবেন। এতে সহকারী শিক্ষকের আরও পদ শূন্য হয়ে যাবে। সহকারী শিক্ষকদের মোট পদের অর্ধেক প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হলেও শর্ত পূরণ করা বেশির ভাগ শিক্ষকই পদোন্নতি পেয়ে যাবেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব চৌধুরী মুফাদ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, নানা জটিলতার কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের প্রাপ্ততা দেয়া হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়া হবে। ইতোমধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা অনুমোদন করা হয়েছে। সেটি মাউশিতে পাঠানো হবে। একটি পরিপত্র জারির মাধ্যমে এ পদোন্নতি বাস্তবায়ন হবে।

এমএইচএম/জেএইচ/এমএআর/জেআইএম