ভারত প্রশ্নে বিএনপি নীতির পরিবর্তন করবে না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৬ পিএম, ০৩ জুলাই ২০১৮

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাবেক মন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দলীয় কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজের।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। আসছে সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে বলেও মত দেন। আলোচনায় উঠে আসে সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে ভারত সফর এবং লন্ডনে থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গও।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবুতিন পর্বের দ্বিতীয়টি থাকছে আজ

জাগো নিউজ : সরকার তো আত্মবিশ্বাসী এখন। আওয়ামী লীগ উন্নয়ন দিয়েই জনআস্থা টানতে চাইছে…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সরকার তাহলে সেটাও পরিষ্কার করুক। উন্নয়ন প্রশ্নে গণতন্ত্রের কোনো দরকার নেই, এটি সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে বলুক। উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই বলে আওয়ামী লীগ মনে করলে, তাহলে নির্বাচনে যাচ্ছে কেন? বন্ধ করে দিক এ নির্বাচন নির্বাচন খেলা। উন্নয়ন করা শুধু আওয়ামী লীগের দায়িত্ব এবং জনগণ আর কিছু চায় না, এটি খুলে বলুক।

প্রশ্ন হচ্ছে এত উন্নয়ন করে জনআস্থায় ভয় কেন? উন্নয়ন করলে তো জনগণের ওপর ভরসা থাকার কথা। তা করছে না কেন? কারণ উন্নয়নের নামে আওয়ামী লীগ কী পরিমাণ লুটপাট করছে, তা জনগণ জানে এবং ভয় মূলত এখানেই।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সাধ্যের বাইরে। গত দশ বছরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটুকু কমেছে, তা সরকারের পরিসংখ্যানেই মিলছে। যারা লুটপাট করছে, সরকার তাদের পক্ষেই বাজেট করছে। আইন করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। ব্যাংকের মালিকরাই সরকারকে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে। খরচ বাড়িয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। এসব তথ্য এখন প্রকাশ্যে। গণমাধ্যম ভয়ে লিখছে না। মন্ত্রীদের দেশের বাইরে কী পরিমাণ সম্পদ তা প্রমাণসহ সামাজিক মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে।

জাগো নিউজ : এরপরও তো জনগণ সরকারের উন্নয়নের প্রতি আস্থা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সরকারের প্রতি জনগণ আস্থা রাখলে ভালো কথা। তাহলে নির্বাচনের এ অবস্থা কেন? জনগণকে কেন ভয় করছে সরকার?

সরকারের লুটপাটের উন্নয়নে মানুষের কোনো ভরসা নেই। গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরা হয়েছে। নইলে সবই আজ বেরিয়ে আসতো। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশ না পেলেও জনগণ এখন সবই জানে।

উন্নয়ন একটি ক্রমবর্ধমান বিষয়। যে কোনো সরকারের সময় উন্নয়নের একটি ধারা অব্যাহত থাকে। বর্তমান উন্নয়নের জন্য প্রথমত জনগণকে ক্রেডিট দিতে চাই। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন প্রশ্নে সকল সংস্কার বিএনপির আমলেই হয়েছে, যার সুবিধা আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ কোনো সংস্কার করেনি, যা জনকল্যাণে কাজে এসেছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, গার্মেন্টস, আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য সবই জিয়াউর রহমানের সময় করা। বিদেশে শ্রমিক পাঠানো জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই শুরু।

স্বাধীনতার পর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির নামে তো গোটা দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। প্রবৃদ্ধির ৭ শতাংশের কোটা আমাদেরই সৃষ্টি। বিএনপির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত। আওয়ামী লীগের লুটপাটের কারণে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না।

জাগো নিউজ : এমন লুটপাটের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তুলতে পারল না বিএনপি। তাহলে সংকট কি বিএনপির মধ্যেও?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে সব সময় দাঁড়ানো যায় না। বিএনপির মধ্যে কোনো সংকট নেই।

জাগো নিউজ : সামরিক সরকার এরশাদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অভিযোগ আনেন আপনারা। এরশাদ পতনের আন্দোলনে বিএনপিও নেতৃত্ব দিল। অথচ এখন...

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : এরশাদের সময় একটি হত্যাকাণ্ডের (মিলন হত্যা) পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আর তো গুলির ঘটনা ঘটেনি। এরশাদের শাসনামলের সময়ও গণমাধ্যম স্বাধীন ছিল। আমরাও সমালোচনা করেছি।

আর এখন! প্রতিনিয়ত মানুষ গুম হচ্ছে। খুন হচ্ছে। বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে যাচ্ছে। হাজার হাজার মামলায় লাখ লাখ আসামি করা হচ্ছে। এরশাদের সময় এত স্বৈরনীতি ছিল না।

জাগো নিউজ : ক্রসফায়ার বিএনপির-ই সৃষ্টি…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : বিএনপির সময় কোনো রাজনৈতিক নেতা ক্রসফায়ারে মারা যাননি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে মারা গেছে। অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় বিএনপির নেতারাই মারা গেছে। কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মরেনি।

কিন্তু আওয়ামী লীগ তো এখন টোটালি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে ক্রসফায়ার চালাচ্ছে। নিজ দলের মাদকসম্রাটকে সুরক্ষা দিয়ে অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। সমাজে হত্যার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে সরকার। শেখ হাসিনার জুলুমের কাছে এরশাদের স্বৈরনীতি আসলে কিছুই না।

জাগো নিউজ : ‘জুলুম’, এর শক্তি কোথায় পাচ্ছে সরকার?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সবই পরিষ্কার। আমি নাম না বললেও মানুষ এখন জানতে পারছে বিশেষ দু-একটি দেশের ওপর ভরসা করে সরকার এমন ভয়ের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ : সম্প্রতি ভারত সফরে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিলেন। ভারতকে কেন এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমরা ভারতকে আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছি না। যে প্রশ্নে আমেরিকা, ইউরোপকে গুরুত্ব দিয়ে আসছি, একই গুরুত্ব ভারতের বেলাতেও।

আমি যখন ভারতে, তখন আমাদের আরেকটি টিম অস্ট্রেলিয়াতে ছিল। সবার কাছে আমাদের একই ম্যাসেজ ছিল।

জাগো নিউজ : ভারত সফরের তাৎপর্য নিয়ে কী বলবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ভারত সরকার বা বিশেষ কোনো দলের আমন্ত্রণে এ সফর ছিল না। আমাদের সফর ছিল ভারতের নীতিনির্ধারকদের আমন্ত্রণে। তারা বাংলাদেশের রাজনীতির অবস্থা জানতে চেয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং নির্বাচনের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

media

জাগো নিউজ : আপনারা কী বললেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : বাংলাদেশে আইনের শাসনের যে ঘাটতি তার ওপর জোর দিয়েই আমরা আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, বাংলাদেশে এখন জনবিরোধী অনির্বাচিত সরকার রয়েছে। এমন একটি সরকারকে সমর্থন দেয়া মানে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচালিত হোক, এটি আমরা সবার কাছেই বলেছি।

জাগো নিউজ : ভারতে যাদের সঙ্গে আলোচনা করলেন, তাদের মনোভাব কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : গত নির্বাচন নিয়ে ভারতের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব কী তা এখন ভারতও জানে। আমরাও সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছি।

আমরা বলেছি, বিশেষ কোনো দলের সঙ্গে নয়, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকুক মানুষ।

জাগো নিউজ : সম্পর্ক তো বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। বিএনপি-জামায়াতকে ভারত কেন বিশ্বাস করবে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয় নয়। বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে দুটি দেশের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন হয় না বরং বিশেষ একটি দলের ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক গড়ালেই সমস্যা বাড়ে। যে সমস্যা এখন বাংলাদেশ মোকাবিলা করছে।

জাগো নিউজ : ‘ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছিল বিএনপি সরকার’ -এমন অভিযোগ ভারতের। বর্তমান সরকারের সময় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারল না। ভারতকে সুরক্ষা দিল শেখ হাসিনা…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : দেখুন, ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য নিয়ে যে অভিযোগের কথা বলা হয়, একই অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের পার্বত্য জেলায়। ভারত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকা অশান্ত করে আসছিল।

জাগো নিউজ : তাহলে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো উঠতেই পারে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু প্রমাণ তো লাগবে। বিএনপি অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি হতে পারে না। সময় বদলে গেছে। দেশ বদলে গেছে। প্রত্যেক দেশ চায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

সুতরাং আগামী দিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের অভিযোগ যেন বিষয়বস্তু না হয়, সেটাই হচ্ছে সময়ের দাবি। ভারত ও বিএনপি নিয়ে বিশেষ অপপ্রচার রয়েছে।

জাগো নিউজ : বিএনপি কেন সে অপপ্রচারের সুযোগ তৈরি করে দেয়?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমরা মনে করি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করে হওয়া উচিত নয়। কোনো বিশেষ দল যদি সেটা করে থাকে তাহলে সেটা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের অপকর্মের দায় ভারত কেন নেবে। আবার ভারতের খবরদারি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেন মানবে?

আমরা ভারতে বলে এসেছি, আওয়ামী লীগের অপকর্মের দায় ভারতের ওপরও বর্তায়। কিন্তু কেন ভারতের জনগণ সে দায় নেবে? সরকার আসবে সরকার যাবে। কিন্তু সম্পর্ক তো চিরদিনের। আমরা দুদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক চাই।

ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ভাষায় কথা বলেছেন, তাতে অবাক হয়েছি। দেশের মানুষের প্রতি আস্থা নেই বলেই অন্য একটি দেশের প্রতি নির্ভর হতে হয়। এ নির্ভরতা কোনো দেশের জন্যই মঙ্গল নয়। সবার আগে সার্বভৌমত্ব।

জাগো নিউজ : ভারত প্রশ্নে বিএনপির নীতির কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ভারত প্রশ্নে বিএনপি তার নীতির পরিবর্তন আনবে না। আগে দেশের মানুষ। দেশের মানুষের স্বার্থ বাইরে রেখে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মানে হয় না। ভারতের কোনো সরকার কি তার দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখবে?

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানের। গোঁজামিল দিয়ে কোনো সমাধান হয় না।

এএসএস/এমএআর/এমএস

প্রশ্ন হচ্ছে এত উন্নয়ন করে জনআস্থায় ভয় কেন? উন্নয়ন করলে তো জনগণের ওপর ভরসা থাকার কথা। তা করছে না কেন

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে সব সময় দাঁড়ানো যায় না। বিএনপির মধ্যে কোনো সংকট নেই

আমরা বলেছি, বিশেষ কোনো দলের সঙ্গে নয়, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকুক মানুষ

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানের। গোঁজামিল দিয়ে কোনো সমাধান হয় না

আপনার মতামত লিখুন :