স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ হলেই তা রাজনীতির বিপক্ষে নয়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০০ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮

রাশেদ খান মেনন। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। মন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দীর্ঘ আলোচনায় কোটা সংস্কার আন্দোলন, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান, নির্বাচনসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও মতামত ব্যক্ত করেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অরাজনৈতিক হলেও বিশেষ মহল এই আন্দোলন থেকে সুবিধা নিতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ তোলেন। কোটা ব্যবস্থার পক্ষেও মত দেন তিনি। ‘আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে’- বলেন বামপন্থী এই নেতা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। তিন পর্বের প্রথমটি থাকছে আজ।

জাগো নিউজ : ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ষাটের দশকে। আছেন রাজনৈতিক আন্দোলনেই। শিক্ষার্থীদের অরাজনৈতিক আন্দোলন কেমন দেখলেন?

রাশেদ খান মেনন : সমাজের নানা ত্রুটি ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলন। আইন প্রয়োগ, বিশেষ করে গণপরিবহনে বহুদিন ধরে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেই শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছিল বলে আমি মনে করি।

অপরদিকে একজন মন্ত্রী দূরদর্শিতার অভাবে দু’জন শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার ঘটনায় যে মন্তব্য করেন, তাও এই আন্দোলনের তেজ বাড়িয়ে দিতে সহায়ক হয়। মূলত, রাষ্ট্রের অসঙ্গতিগুলো শিক্ষার্থীরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

জাগো নিউজ : রাষ্ট্র ও সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে আগেও আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু এমন রূপে নয়। কিশোরদের এই আন্দোলন একটু আলাদা করে দেখা যায় কি-না?

রাশেদ খান মেনন : আলাদা তো করতেই হয়। এই আন্দোলনের শুরুতে নেতৃত্ব ছিল না, রাজনীতিও ছিল না। বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীদের আন্দোলনে এমন রূপ ছিল। ভ্যাট আন্দোলন নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

এমনকি কোটা আন্দোলনও আলাদা করে দেখতে হয়, যদিও এই আন্দোলন সংগঠিতভাবে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : তার মানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের রূপ এমনই হয়?

রাশেদ খান মেনন : সমাজের নানা বিষয় নিয়ে গণমানুষের আন্দোলন আর রাজনৈতিক আন্দোলন এক বিষয় নয়। মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলনের রূপ নাগরিকরাই নির্ধারণ করেন।

কিশোর আন্দোলনে আমরা অনন্য কিছু বিষয় লক্ষ্য করলাম। তারা একেবারে দাঁড়িয়ে থেকে এই সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিলো। সড়কে লেন চিনিয়ে দিলো। লাইসেন্স চেক করলো। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে অন্যরা অবশ্যই শিক্ষা নিতে পারেন।

আমরা কোটাবিরোধী আন্দোলনে ভিসির বাড়িতে আক্রমণ করতে দেখলাম। ভাঙচুর হলো। কিন্তু কিশোররা তা করেনি। তারা ত্রুটিগুলো খুব আবেগের সঙ্গে দেখিয়ে দিলো। এ কারণে আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অনন্য।

জাগো নিউজ : আপনি রাষ্ট্রের অসঙ্গতির কথা বললেন। আস্থা-অনাস্থার প্রশ্নে নাগরিকের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল কি-না, যে পরিস্থিতি উৎরাতে একেবারে মাঠে নামতে হচ্ছে মানুষকে?

রাশেদ খান মেনন : আমি তা মনে করি না। আস্থা-অনাস্থা বা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার বিষয় নয়। একটি ইস্যু সামনে আসতেই পারে এবং সেই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হতেই পারে। এখানে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন?

জাগো নিউজ : রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ভরসা রাখতে পারছে না মানুষ। যারা রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন করছেন, জনঅধিকারকে ধারণ করতে পারছেন না বলে নাগরিক সমাজ মনে করছেন…

রাশেদ খান মেনন : অনেক আন্দোলনই রাজনীতির ওপর ভরসা করে হয় না। তাই বলে যে মানুষ রাজনীতির ওপর ভরসা রাখছে না, তা বলা ঠিক হবে না। সব আন্দোলন একই কাঠামোতে মিলিয়ে মূল্যায়ন করলে চলবে না।

প্রতিটি আন্দোলনের নিজস্ব রূপ থাকে। এই আন্দোলনেরও একটি রূপায়ণ আছে। কিন্তু সেটা রাজনীতি বা সরকারের ওপর অনাস্থার প্রকাশ আমি তা মনে করি না। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ হলেই তা রাজনীতির বিপক্ষে নয়।

জাগো নিউজ : কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা মাঠে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোররাও মাঠে নামলো। সরকার অরাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে পড়লো কিনা?

রাশেদ খান মেনন : না, আমি তা মনে করি না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন তার সঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে একেবারেই মেলাতে চাই না। কোটাবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত রূপে হয়েছে। সেখানে বিশেষ চেতনার প্রভাব কাজ করেছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে নিয়ে আসা। আমি হলফ করে বলতে পারি, প্রধানমন্ত্রী যদি কোটা কমিয়ে ১০ ভাগে আনার ঘোষণা দিতেন তবুও তারা মানতেন না। কারণ তাদের আন্দোলনের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব সর্বশেষ কোটা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ, তা থেকেই বোঝা যায় এই আন্দোলনের বিশেষ লক্ষ্য আছে। কোটা আন্দোলন অরাজনৈতিক আন্দোলন বলা ঠিক হবে না।

জাগো নিউজ : কোটা পদ্ধতি নিয়ে আপনার নিজস্ব মূল্যায়ন কী?

রাশেদ খান মেনন : কোটা পদ্ধতির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। যদি এই পদ্ধতি না থাকতো তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের অনেকেই সিএসপি অফিসার হতে পারতেন না।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুও দেখলেন, যদি কোটা সিস্টেম না থাকে তাহলে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য বাড়বে। যেমন- নোয়াখালী, কুমিল্লা বা বরিশালের মতো জেলা অন্যান্য জেলাগুলোকে ডমিনেট করতো। এখনও কিন্তু কিছুটা করছে। এই কারণেই বঙ্গবন্ধু কোটা রাখলেন।

এরপর নারী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, উপজাতি কোটার প্রচলন হলো। মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংযুক্ত করা হলো এবং সেটা সমতা বিধানের জন্য। তবে কোটা থাকলেও মেধাই গুরুত্ব পাচ্ছে সর্বাগ্রে। গত তিন বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ এসেছে মেধার ভিত্তিতে।

প্রশ্ন এসেছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের কোটার সুবিধা দেয়ার পর থেকেই কোটার বিষয়টি সামনে আসে।

তবে আমরা মন্ত্রিসভায় স্পষ্ট করে বলেছিলাম, যদি কোটায় কোনো পদ খালি থাকে তাহলে সেখানে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। যদিও আদালতের রায় ভিন্ন।

জাগো নিউজ : কোটা নিয়ে কমিটি হয়েছে, গবেষণা হয়েছে। বর্তমান কোটা পদ্ধতির সমালোচনা করে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খানও…

রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ, ড. আকবর আলি খানের পরামর্শ সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম। তিনি মত দিয়েছেন কোটা নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে তিনিও আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। কাজ তো হচ্ছে।

জাগো নিউজ : কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রসঙ্গে...

রাশেদ খান মেনন : মুক্তিযোদ্ধা কোটার নাম শুনলে অনেকেরই জ্বলে। কেন জ্বলে আমরা সেটা জানি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমতা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু যখনই মুক্তিযোদ্ধা কোটার কথা বললেন, তখনই সমালোচনা শুরু হলো।

জাগো নিউজ : প্রধানমন্ত্রী তো দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। কোটা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের মধ্যে দ্বিচারিতা আছে কি-না?

রাশেদ খান মেনন : কোটা নিয়ে সরকারের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বিচারিতা নেই। এটি একটি জটিল বিষয়। হুট করে টকশোতে বলে দিলাম বা পত্রিকায় লিখে দিলাম আর হয়ে গেলো- এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। সংবিধানে বিষয়গুলো সংরক্ষিত আছে। পাকিস্তান আমল থেকে এই পদ্ধতি চলে এসেছে।

এএসএস/এমএআর/এমআরএম/জেআইএম

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে অন্যরা অবশ্যই শিক্ষা নিতে পারেন

কোটাবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে নিয়ে আসা

কোটা নিয়ে সরকারের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বিচারিতা নেই। এটি একটি জটিল বিষয়