গতি নেই ২০ দলে, পাত্তাও নেই শরিকদের

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১০ পিএম, ২৩ জুন ২০১৯

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কার্যকর নেই বলে দাবি করছেন জোটের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, কার্যকর জোট গঠনে সংস্কারের প্রস্তাব দিলেও তা আমলে নিচ্ছে না বিএনপি। তবে বিএনপির দাবি, শরিকদের ক্ষোভ থাকলেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সবার।

বিএনপির বিরুদ্ধে ২০ দলীয় জোটে শরিকদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ পুরনো হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর তা আরও জোরালো হয়। পুরনো মিত্রদের অবজ্ঞা করে বিএনপি তাদের নতুন জোট ঐক্যফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে- এমন অভিযোগ এনে সে সময় জোট ত্যাগ করে বাংলাদেশ ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। ওই দুটি দল জোট ত্যাগের পর ২০ দলীয় জোট অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় পৃথক বাংলাদেশ ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করে জোটের সঙ্গে রাখা হয়। পরবর্তীতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর আরও বেশি ঐক্যফ্রন্টমুখী হয় বিএনপি।

আরও পড়ুন >> বিএনপির শূন্য তিন পদে আলোচনায় যারা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে যোগদানে বিরত থাকার কথা বললেও শেষ মুহূর্তে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। অপর শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির একাংশের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগের আল্টিমেটাম দেন। পাশাপাশি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে ২০ দলীয় জোট নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয় বিএনপিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জোটের শরিকদের নিয়ে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রমজান মাসে একটি বৈঠক এবং ইফতারের আয়োজন করে বিএনপি। ওই বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্তের কথা জোটের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- জোটকে কার্যকর করতে প্রতি মাসের ৮ তারিখে জোটের বৈঠক, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শরিক দলগুলো এবং জোটের ব্যানারে কর্মসূচি পালন। এর মধ্যে এলডিপিসহ কয়েকটি দল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সভা-সেমিনারের আয়োজন করলেও অধিকাংশ শরিক দল ছিল নিষ্ক্রিয়।

আরও পড়ুন >> ছাত্রদল নিয়ে বিএনপি নেতাদের কপালে ভাঁজ

ঈদুল ফিতরের আমেজ শেষ হলেও ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মসূচি পালনের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। পাশাপাশি জোটের পরবর্তী বৈঠক কবে হবে, তা নিয়ে শরিকদলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জোটের শরিক এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদৎ হোসেন সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, জোটের শরিকদলগুলোর মধ্যে কয়েকটি দল রয়েছে যাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে আমাদের অস্বস্তি লাগে। আমরা চাইছি তাদের বাদ দিয়ে জোটকে কার্যকর করতে। ২০ দলীয় জোট তেমন একটা কার্যকর নেই। তবে শরিকদলগুলোর মধ্যে যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান বলেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে ২০ দলের গুরুত্ব নানা কারণে কমে গেছে। এরও নানা কারণ আছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যখন ২০ দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোটের আবেদন ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০১৪ সালের নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আন্দোলন-সংগ্রামে মুখোর ছিল। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি দল ২০ দলীয় জোট ছেড়ে চলে যায়। তাদের শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে নামমাত্র নেতা দিয়ে গঠিত কয়েকটি দলের। এতে জোটের শীর্ষনেতাদের লেভেল ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। বিএনপির কাছে ২০ দলীয় জোটের গুরুত্ব কমে যায়।

bnp-01.jpg

২০ দলীয় জোট নেতাদের বৈঠক

তিনি বলেন, একদিকে জোটনেত্রী জেলে, অন্যদিকে নির্বাচন। এ অবস্থায় বিএনপির শীর্ষনেতাদের আগ্রহে ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম হয় এবং বিএনপির কাছে নানা কারণে ফ্রন্টের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এতে জোটের শরিক অনেক নেতা অভিমান করে বসেন। কিন্তু জোটবদ্ধ রাজনীতি ছাড়া নিজ নিজ দলের শক্তি বা সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে কেউ কি ভেবেছেন?

আরও পড়ুন >> সরকারবিরোধীদের নিয়ে বড় জোট গড়ে তোলা হবে : রব

‘জোটের শরিক দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপির কাছে দিন দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এ অবস্থায় আমি মনে করি, কাউকে ছোট করে নয় বরং চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জোটে সংস্কার দরকার, নামমাত্র দলের পরিবর্তন দরকার। জোটের পরিধি ছোট হলেও একটি কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে জোটনেত্রীর মুক্তি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা এখন সময়ের দাবি। আশা করি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি উপলব্ধি করবেন।’

ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, জোট পরিস্থিতি নিয়ে আমরা খুশি নই। বিএনপি আমাদের মূল্যায়ন করছে না। গত রমজানের বৈঠকে আমি কৃষকদের স্বার্থে এবং বেকার যুবকদের স্বার্থে পুরনো চারটি বিভাগীয় শহরে কৃষক সমাবেশ ও যুব সমাবেশ কর্মসূচি পালনের প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু বিএনপি আমার প্রস্তাব আমলে নেয়নি। তারা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শরিকদের মূল্যায়ন করছে না।

বিএনপি যেহেতু শরিকদের মূল্যায়ন করছে না সেক্ষেত্রে জোট ত্যাগ করা বা নতুন জোট হলে সেখানে যাওয়ার চিন্তা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেই আছি, তারেক রহমানের সঙ্গেই আছি এবং থাকব। কিন্তু জোটকে কার্যকর করতে হবে।’

ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামন ফরহাদ বলেন, ‘জোট আছে, জোট পরিস্থিতি নিয়ে আমরা খুশি। তবে জোটকে আরও কার্যকর করতে হবে বলে আমি মনে করি। প্রতি মাসে অন্তত এক থেকে দুটি বৈঠক হওয়া দরকার।’ চলতি মাসের মধ্যে শিগগিরই জোটের বৈঠক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও পড়ুন >> বিএনপি ছাড়তে চান শাহজাহান ওমর!

জোটের সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে সবাই বিএনপির সঙ্গে জোট করেছে। আমি কারও সঙ্গে জোট করিনি বা অন্য কেউ আমার সঙ্গে জোট করেনি। সেক্ষেত্রে জোটে কে থাকবে, কে থাকবে না- এমন প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।

২০ দলীয় জোটের শরিকদলগুলোর ক্ষোভ নিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটর সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘২০ দলীয় জোটে ক্ষোভ-হতাশা থাকতেই পারে। কিন্তু সবার লক্ষ্য একটা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার।’

কেএইচ/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :