দ্বিধা থাকলেও জোটেই আছি

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৭ পিএম, ০১ জুলাই ২০১৯

রাশেদ খান মেনন। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। সাবেক মন্ত্রী। বামপন্থী এ রাজনীতিক মহাজোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন জোটে থেকেও। জোট গঠনের সার্থকতা, রাজনীতি, উন্নয়ন, অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

চলমান উন্নয়ন ধারার সমালোচনা করে বলেন, ‘এতে সমাজে বৈষম্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।’ রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারছে না উল্লেখ করে বলেন, ‘ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে সমাজে সহিংসতা বাড়ছে।’ দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

আরও পড়ুন >> চলমান উন্নয়ন ধারা ভয়ঙ্কর বৈষম্য সৃষ্টি করছে

জাগো নিউজ : আগের পর্বে বৈষম্যের তীব্রতার কথা বলছিলেন। এজন্য প্রধানত কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেবেন?

রাশেদ খান মেনন : প্রথমত, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা। দ্বিতীয়ত, সুশাসনের অভাব এবং তৃতীয়ত, দুর্নীতি। দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আমি ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। তার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ আমার জানা নাই।

কিন্তু ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে যে বলয় সৃষ্টি হয়েছে, তা মূলত দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দিয়েই। দুর্নীতিই সমাজকে গ্রাস করছে। নইলে বৈষম্য কমিয়ে আসত সব ক্ষেত্রেই।

জাগো নিউজ : কিন্তু ক্ষমতার বলয়ে থাকা দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অবগত থাকার কথা…

রাশেদ খান মেনন : প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ার অবস্থা প্রায়। তারা শৃঙ্খলায় থাকছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সত্যিকার অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বরং দুদকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এটা তো ভয়াবহ চিত্র।

জাগো নিউজ : দুদকের আইনি সীমাবদ্ধতা আছে কি-না?

রাশেদ খান মেনন : আমি তা মনে করি না। আমরা আইন করে ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছি। অথচ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে আটকাতে পারছে না। টাকা পাচারকারীদের আটকাতে পারছে না।

দুদক চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। কারা টাকা পাচার করছে, কারা কানাডা-মালয়েশিয়ায় বাড়ি করছে, সুইস ব্যাংকে কাদের টাকা জমা আছে, তা চাইলে এক মাসের মধ্যেই দুদক বের করতে পারবে।

আরও পড়ুন >> দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে মহামারির রূপ নিয়েছে ধর্ষণ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও বিদেশে ৩৬শ’ কোটি টাকা পাচার করেছে। একটা সভ্য দেশে এমনটা কল্পনা করা যায়! গোয়েন্দারা, বাংলাদেশ ব্যাংক তাহলে কী করছে?

জাগো নিউজ : দুর্নীতি দেখছেন, সমালোচনা করছেন। আবার জোটেও থাকছেন…

রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ। এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে বহু জায়গায়। জোটে আছি মাত্র দুই কারণে। আমরা জনমুখী উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি করতে চাই। আর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির যে বিস্তার, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নাই।

জাগো নিউজ : চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতি আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় এলেন। অথচ, এ দুই বিষয় নিয়ে ভয়াবহতার কথা বলছেন। জোটে এসে এখন হতাশ কি-না?

রাশেদ খান মেনন : না। আমি হতাশার কথা বলছি না। আক্ষেপও করছি না। বাস্তবতা নিয়ে কথা বলছি।

২০১০ সালে আমরা জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলাম। আজও তার বাস্তব রূপ দিতে পারলাম না। নারীনীতি নিয়ে এখন কোনো আলোচনা নেই। এ বিষয়গুলো আমি অস্বীকার করতে পারি না।

ধর্ম, রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ নিয়ে সমাজ রীতিমতো ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা প্রায় একই গোত্রীয়। এখানে প্রায় একই ভাষা। ইসলাম ধর্মের মানুষ ৯২ ভাগ। অথচ মানসিকভাবে আমরা ভাগ হয়ে গেলাম।

জাগো নিউজ : কেন এমন হলো?

রাশেদ খান মেনন : আমরা আমাদের জাতিসত্তা দাঁড় করাতে পারিনি। ধনী-গরিব ব্যবধান অন্য প্রসঙ্গ। তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন মাদরাসার। অথচ মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা আধুনিক কোনো ভাবনা করতে পারলাম না।

আরও পড়ুন >> রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বকে চাপ দেয়ার সময় এসেছে

আমি মাদরাসা শিক্ষা তুলে দেয়ার কথা বলছি না। সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, আমি তার মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলেছি। কওমি শিক্ষার্থীদের সনদ দেয়া হলো। ভালো কথা। কিন্তু তাদের পাঠ্যসূচি কী, তা আমরা জানি না।

বাজেটে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলা হলো। কিন্তু তার জন্য কী ধরনের শিক্ষার প্রয়োজন তা নিয়ে আলোচনা নেই। এ কারণে আমি মনে করি, শুধু টাকার উন্নয়ন দেখিয়ে সুফল আসবে না। শিক্ষা, মানসিকতার উন্নয়ন জরুরি।

জাগো নিউজ : আপনি মাদরাসা শিক্ষার সংস্কারের কথা বলে সংসদে বক্তব্য রেখেছেন। হেফাজতে ইসলামের সমালোচনা করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে নিয়ে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। আসলে এসবের মধ্য দিয়ে কী দাঁড়াচ্ছে?

রাশেদ খান মেনন : রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য কিছুটা কৌশলের প্রয়োজন হয়। আমি এটা অস্বীকার করি না। প্রধানমন্ত্রী হয়তো কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।

কিন্তু আমি বারবারই বলছি, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে সমঝোতার ফল কখনই ভালো হবে না। কওমি শিক্ষাকে স্বীকৃতি দিতেই পারি। কিন্তু সেখানে কী শিক্ষা হচ্ছে, তার জন্য তো রাষ্ট্রকে তদারকি করতে হবে।

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মানুষ জীবনযাপন করলে তাতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু ধর্মীয় বিভাজন তো সমাজের জন্য বিপজ্জনক। তাবলিগ জামায়াতের লোকেরাও এখন একে অপরকে হত্যা করছে। ওয়াজ-মাহফিলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

জাগো নিউজ : এ বিভাজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

রাশেদ খান মেনন : আমি বিশ্বাস করি নতুন প্রজন্ম এ বিভাজনকে গ্রহণ করবে না। তাদের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আজ হোক আর কাল হোক, নতুনরা আলোর পথেই হাঁটবে।

জাগো নিউজ : নতুন প্রজন্মের মধ্যেও হতাশা আছে। বিশেষ করে রাজনীতি, রাষ্ট্র নিয়ে…

রাশেদ খান মেনন : হতাশা আমাদের সামনেও ছিল। ষাটের দশকের আন্দোলনে আমাদের রাজনৈতিক বড় দল ছিল না। তরুণরাই আন্দোলন করেছে। এক দশক লড়াই করে আমরাই বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

আরও পড়ুন >> দুর্নীতি অবশ্যই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

তরুণরা এখন নতুন দুনিয়া দেখছে। প্রযুক্তি দেখাচ্ছে। তাদের সামান্য জায়গা করে দিলেই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবে।

জাগো নিউজ : বলা হচ্ছে, রাজনীতিই সেই স্পেস (সুযোগ) রুদ্ধ করে দিচ্ছে…

রাশেদ খান মেনন : জায়গা তৈরি করে নিতে হয়। রুদ্ধ পথ খুলে নিতে হয়। ষাটের দশকে আমরা তা-ই করেছি। পথ কেউ আটকাতে পারে না। আমি গণতান্ত্রিক স্পেস দিতে সংসদে বলেছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটি কেউ দেয় না। আদায় করে নিতে হয়।

জাগো নিউজ : তার মানে এ সরকারও ঠিক জায়গা দিতে চাইছে না…

রাশেদ খান মেনন : আমি অন্তত গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলছি। তবে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে হয় হারিয়ে ফেললাম। তা হচ্ছে, সুশীল সমাজ তাদের সাহস হারিয়ে ফেলছে। এ সাহস ফিরিয়ে আনা জরুরি।

জাগো নিউজ : সাহস হারিয়ে ফেলার কী কারণ থাকতে পারে?

রাশেদ খান মেনন : দেশি-বিদেশি নানা কারণই আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মানসিক বিকারগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট! নরেন্দ্র মোদির মতো উগ্রবাদী নেতা ফের ক্ষমতায়! ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সময়ের এমন পরিবর্তনে মানুষ সাহস হারিয়ে ফেলতেই পারে।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী বলবেন?

রাশেদ খান মেনন : বাংলাদেশেও উগ্রবাদের বিস্তার ঘটছে না, তা নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারসাম্য নীতি অবলম্বন করে চলছেন বলে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে পারছে না। এ ভারসাম্য আমরা সব জায়গাতেই দেখতে পাচ্ছি। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।

জাগো নিউজ : প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর কীভাবে দেখছেন?

রাশেদ খান মেনন : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফর। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া বারবার বাংলাদেশের বিপক্ষে ভেটো দিয়েছে। আমি মনে করি, এ সফরের মধ্য দিয়ে চীনকে বোঝানো দরকার, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে কেউ ভালো থাকবে না। এ মুহূর্তে চীন সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে। চীন বাংলাদেশের ভালো বন্ধু। সেই সম্পর্ক আরও জোরাল হোক এ সফরে।

আরও পড়ুন >> স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ হলেই তা রাজনীতির বিপক্ষে নয়

জাগো নিউজ : মানুষ অতিমাত্রায় সহিংস হয়ে উঠছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারছে। ধর্ষণ ভয়াবহ মাত্রায় ঘটছে। কী বলবেন এমন সহিংসতা নিয়ে?

রাশেদ খান মেনন : গোটা সমাজ অস্থির হয়ে উঠছে। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, আমরা দীর্ঘদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বসবাস করেছি। আমি মনে করি, এ সহিংসতা ক্ষমতার বলয় থেকেই ঘটছে।

জাগো নিউজ : জোটে কোনো টানাপোড়েন আছে কি-না?

রাশেদ খান মেনন : দ্বিধা থাকলেও জোটেই আছি। আমরা এখনও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই এবং সেটা ঐক্যবদ্ধভাবেই।

এএসএস/এমএআর /এমএস

আমরা এখনও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আশা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই এবং সেটা ঐক্যবদ্ধভাবেই

আমরা দীর্ঘদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বসবাস করেছি। আমি মনে করি, এ সহিংসতা ক্ষমতার বলয় থেকেই ঘটছে

এ সফরের মধ্য দিয়ে চীনকে বোঝানো দরকার, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে কেউ ভালো থাকবে না

সুশীল সমাজ তাদের সাহস হারিয়ে ফেলছে। এ সাহস ফিরিয়ে আনা জরুরি

জায়গা তৈরি করে নিতে হয়। রুদ্ধ পথ খুলে নিতে হয়। ষাটের দশকে আমরা তা-ই করেছি। আজ হোক আর কাল হোক, নতুনরা আলোর পথেই হাঁটবে

আপনার মতামত লিখুন :


আরও পড়ুন