বেশি দামে পণ্য বিক্রি, জেল-জরিমানা সমাধান নয়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০১ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

গোলাম রহমান। সভাপতি, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ আমলা।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, ভোক্তা অধিকার ও সরকারের দায় নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দীর্ঘ আলোচনায় দুর্নীতি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়েও আলোকপাত করেন এ বিশ্লেষক। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : চলতি বছরেই দেশের কৃষকরা ১৩ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না, এ অভিযোগ বহুদিনের। অথচ আমদানি বন্ধ হওয়াতে দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ভোক্তা-কৃষকের স্বার্থে কী বলবেন?

গোলাম রহমান : পেঁয়াজের উৎপাদন দেশেও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। সারাদেশে পেঁয়াজের আবাদ হয় না। কয়েকটি জেলায় হয়। আবার বাংলাদেশে যে জাতের পেঁয়াজ আবাদ হয়, তার উৎপাদনও কম। ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ ফলন হয়। মিসর, চীনে উৎপাদন আরও বেশি।

আমি জানি না, বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসল উৎপাদন সম্পর্কিত কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে কি-না। এটি এখন সময়ের দাবি। অধিক ফলন হয় পেঁয়াজের এমন বীজ কৃষককে আগে থেকেই সরবরাহ করা উচিত ছিল। কৃষককে ঋণ দিতে হবে। উৎপাদনের মৌসুমে ন্যায্যমূল্য দিতে হবে। কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিলে পেঁয়াজের বাজার এমন হতো না।

মনে রাখতে হবে, আমাদের যখন পেঁয়াজের মৌসুম, তখন ভারতেরও মৌসুম। ভারতে অধিক ফলন হওয়ার কারণে কৃষক লাভবান হয়। তারা বাংলাদেশে রফতানি করেও লাভ পায়। আর বাংলাদেশে উৎপাদন কম হওয়ায় কৃষকরা লোকসান গুনতে থাকে।

জাগো নিউজ : ভোক্তার স্বার্থে কী বলবেন?

গোলাম রহমান : বাংলাদেশে কৃষকের স্বার্থই ভোক্তার স্বার্থ। কৃষক তার ন্যায্যমূল্য পেলে উৎপাদন বাড়াবেই। উৎপাদন বাড়লে বাজারে ভারসাম্য থাকবে।

আমি মনে করি, পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুমে অল্প সময়ের জন্য ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। তবে সেটা বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। এ সময় আমদানি বন্ধ থাকলে কৃষক লাভবান হবে। কিন্তু দীর্ঘকাল আমদানি বন্ধ রাখা ঠিক হবে না। আবার উচ্চ শুল্ক আরোপও ঠিক হবে না। এমন কৌশল নিলেই ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা হবে।

জাগো নিউজ : মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এমন কৌশলে কি কাজ হয়?

গোলাম রহমান : এর সঙ্গে মুক্তবাজারের কোনো সম্পর্ক নেই। ট্যারিফ ম্যানেজমেন্ট কৌশল নির্ধারণ করলেই কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা হবে। মুক্তবাজার মানেই তো এমন নয় যে, কোনো শুল্ক থাকবে না।

জাগো নিউজ : ভারতের সঙ্গে আমরা সে কৌশলে যাওয়ার ক্ষমতা রাখি কি?

গোলাম রহমান : আমি আমদানি করব, কি করব না; কী শুল্ক নির্ধারণ করব তা আমার বিষয়। যদি সে ক্ষমতা না রাখি, তাহলে জনকল্যাণে আমি দায়িত্বশীল হতে পারলাম না।

জাগো নিউজ : পেঁয়াজ ছাড়াও অন্যান্য পণ্যের দামও চড়া। চালের দাম বাড়ছে। বাড়ছে শীতকালীন শাকসবজির দামও…

গোলাম রহমান : এবার বন্যার কারণে শাকসবজির উৎপাদন বিলম্বিত হয়েছে। এ কারণেই হয়তো দাম কিছুটা বেশি। কিছুদিন আগেও চালের দাম কমে এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, কৃষকের জন্য সংকট তৈরি করেছিল। উৎপাদনের সঙ্গে বাজারমূল্যে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না কৃষক। তাদের স্বার্থেই প্রচুর ধান কিনেছে সরকার।

প্রশ্ন হচ্ছে, চালের সঙ্গে ধানের মূল্যের অসঙ্গতি নিয়ে। চালের যে দাম, তার সঙ্গে ধানের দাম মেলে না। এখানেই সরকারকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখতে হয়। চালের বাজার কেন ঊর্ধ্বমুখী? প্রতিনিয়ত সরকারকে এটার মনিটরিং করতে হয়। মনে রাখতে হবে, চালের বাজার অস্থির হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব মানুষ। তাদের স্বার্থে সরকারকে সরবরাহ বাড়াতে হয়, খোলা বাজারে চাল বিক্রি করতে হয়। সরকার যথাসময়ে যথা কাজটি করছে না বলেই বাজার লাগামহীন হচ্ছে।

জাগো নিউজ : নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করছেন কি-না?

গোলাম রহমান : যারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে, তাদের মধ্যে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এখন নানা কথা বলছে। আগে কী করেছে তারা?

মূল কথা হচ্ছে, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় এককভাবে কোনো মন্ত্রণালয় নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যে নীতিমালা আছে, সেখানে এক লাইনে ভোক্তা অধিকারের কথা বলা আছে। এর বেশি আপনি পাবেন না।

ভারতে ভোক্তা, খাদ্য ও সরবরাহ বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় রয়েছে। আমাদের এখানেও ভোক্তা অধিকার নিয়ে আলাদা বিভাগ থাকা জরুরি। যারা সরকারের পলিসি নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে। মন্ত্রণালয়ের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত তারা মানবে না। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে।

জাগো নিউজ : জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর তো আছে…

গোলাম রহমান : আপনি ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের আইন দেখবেন। সেখানে ভোক্তার মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়নি। ওজনে কম দিলে শাস্তি কী, এসব আইন নিয়েই তারা ব্যস্ত। সরকারের পলিসি নির্ধারণে সে আইনের কোনো কার্যকারিতা নেই।

আমি কয়েক বছর ধরে বলে আসছি, ভোক্তার অধিকার বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা উচিত। একটি মন্ত্রণালয় গঠন করতে পারলেই পলিসি দাঁড়িয়ে যাবে। উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে সে মন্ত্রণালয়। এটি করতে পারলে ভোক্তারা বারবার যে বেসামাল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাবে।

জাগো নিউজ : জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর যে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা কিছুটা হলেও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করছে…

গোলাম রহমান : আমি তা মনে করি না। এতে আরও হিতে বিপরীত হচ্ছে। উৎপাদন ও বাজারমূল্য সাধারণত ক্রেতা-বিক্রেতা ঠিক করে। বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না, এটি আপনি বলতে পারেন না। অপরাধীর শাস্তি হওয়া দরকার। কিন্তু বেশি দামের অপরাধে জেল-জরিমানা কোনো সমাধান নয়। যদি অনৈতিকভাবে মজুত রাখে শাস্তি দিতে হয়। ভোক্তা অধিকার কয়জন মজুতদারকে শাস্তি দিতে পেরেছে? কৃত্রিম সংকট কারা তৈরি করেছে? তার খোঁজ না নিয়ে আপনি মাঠে গিয়ে জরিমানা করে অস্থির অবস্থা সৃষ্টি করলেন। এতে কোনো লাভ হয় না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এমন হয়েছে। অনেক পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়েছে। এতে আরও সংকট বেড়েছে। আপনাকে মূলে যেতে হবে। হঠাৎ করে অভিযানে নেমে বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কোনো লাভ হবে না। তখন ব্যবসায়ীরাও ভিন্ন কৌশল নেবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভোক্তারা-ই।

এএসএস/এমএআর/এমএস

আপনাকে মূলে যেতে হবে। হঠাৎ করে অভিযানে নেমে বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কোনো লাভ হবে না

আপনি ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের আইন দেখবেন। সেখানে ভোক্তার মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়নি

ভারতে ভোক্তা, খাদ্য ও সরবরাহ বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় রয়েছে। আমাদের এখানেও ভোক্তা অধিকার নিয়ে আলাদা বিভাগ থাকা জরুরি

যারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে, তাদের মধ্যে দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এখন নানা কথা বলছে। আগে কী করেছে তারা?

পেঁয়াজের উৎপাদন মৌসুমে অল্প সময়ের জন্য ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। তবে সেটা বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে