লাখ লাখ ভারতীয় কাজ করছে অথচ দেশে এত শিক্ষিত বেকার!

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৮ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। নির্বাহী সভাপতি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা। উন্নয়ন প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর।

দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়নের সংকট এবং সমাধান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। গণতন্ত্র, সুশাসনের অভাবই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করেন এ বিশ্লেষক। অপরদিকে উদ্যমী মানুষের ওপর ভরসা রেখে নানা সম্ভাবনার দিকও তুলে ধরেন। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : একটু পেছনে ফিরে জানতে চাইব। ১/১১ তথা বিশেষ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন রাজনৈতিক দলের কাছে। এক দশক পর আজ কী বলবেন দেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র নিয়ে?

হোসেন জিল্লুর রহমান : এ মূল্যায়ন সমাজ করবে। আমরা আমাদের কাজের ভালোটাই দাবি করব। সার্বিক অর্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে- এ বিশ্লেষণ এক দশক পর নাগরিকরা করলেই ভালো হবে।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কোথায় ছিল আর এখন কোথায় আছে- এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থেকে মূল্যায়ন করলে মনে হয় ভালো হয়।

জাগো নিউজ : এ মূল্যায়নে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কী বলবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : একটি রাষ্ট্রের যাত্রা মূলত একমাত্রিক পথে নয়। নানা পথে, নানা মতে বা ডাইভার্সনের (ভিন্নমুখকরণ) মধ্য দিয়ে হতে পারে। বিশেষ কোনো খাত বা বিষয় ধরে আলোচনা সমাজে আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সমাজের সমস্যা ও অগ্রগতি নিয়ে গভীরভাবে বোঝার বিষয় আছে।

যেমন- বাংলাদেশের প্রথম তিন দশক প্রধান সমস্যা ছিল দারিদ্র্য। দারিদ্র্য এখনও আছে। কিন্তু একমাত্র প্রধান সমস্যা এখন দারিদ্র্য নয়। এটি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিরাট সফলতা অর্জন করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যেও সফলতা আছে।

hossain-zillur-03.jpg

কিন্তু গত এক দশকে বাংলাদেশে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আমরা যদি ২০২০ সালে বসে সত্তর দশকের খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলি, তাহলে বুঝতে হবে নীতিনির্ধারকরা সমস্যাটা বুঝতে পারছেন না। একেবারে ক্ষুধার প্রশ্নে দরিদ্রতা কিন্তু এখন অনেক কমে গেছে। জাতীয় আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও কিন্তু পরিবর্তন এসেছে। এ সরকার বলছে, মধ্যম আয়ের কথা। আগে বলা হতো, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কথা। এখন বলা হচ্ছে, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ। তার মানে, লক্ষ্যমাত্রাগুলো ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমরা কথায় বলছি মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ আর কাজে থাকছি ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশে! তাহলে তো হবে না।

জাগো নিউজ : চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কী বলবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : শিক্ষায় আমরা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছি। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর এটিই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। এত বেকার থাকার পরও বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে কাজ করছে ভারতের কয়েক লাখ মানুষ। তারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে রেখেছে। নিয়োগদাতারা বাংলাদেশের শিক্ষিতদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করছে না। দেশে এত শিক্ষিত বেকার! ভারতের লাখ লাখ জনবল এসে কাজ করছে কীভাবে? এটি তো রীতিমতো ভাবনার বিষয়।

জাগো নিউজ : প্রসঙ্গ তুলেছেন, দারিদ্র্যের। আপনার প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি এটি নিয়ে গবেষণা করছে, যার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলো দারিদ্র্য বিমোচন নিয়েও কাজ করছে। দারিদ্র্য, অতিদারিদ্র্যের সংখ্যাগত ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক আছে। এ বিতর্কে আপনার অভিমত কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান : দারিদ্র্যের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রা আছে। বিপন্নতা বলতে একটি শব্দ আছে দারিদ্র্যের মধ্যে। আপনি যদি নগর দরিদ্রতা দেখেন, দেখবেন বস্তিতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তার মানে দরিদ্র কারা, এ চিত্রে পরিবর্তন আছে। আবার আঞ্চলিক প্রশ্নেও ব্যবধান আছে।

দারিদ্র্যের তিনটি ধরন আছে। প্রথমে সার্বিক দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করা হতো। এরপর চরম দারিদ্র্য নিয়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, এদের বাইরেও একধরনের দারিদ্র্য আছে, যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র না, তারা সামাজিক, রাজনৈতিক বা ক্ষমতায়নের প্রশ্নেও দরিদ্র।

এ আলোচনাগুলো প্রচলিত। আমি এর বাইরে একটু আলোচনা করতে চাই। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যারা নীতিনির্ধারক তারা সমস্যাটা বুঝতে পারছেন কি-না? বরাদ্দ হচ্ছে, উদ্যোগ হচ্ছে, কর্মকাণ্ড চলছে। বাজেট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

hossain-zillur-03.jpg

এখানে দুটি সমস্যা আছে। প্রথমত, সরকার বা নীতিনির্ধারকরা একধরনের আত্মতুষ্টিতে ভোগে। এ আত্মতুষ্টির কারণে তারা সমস্যা বুঝতে পারছেন না এবং সমালোচনাও সহ্য করতে পারছেন না।

জাগো নিউজ : মূল সমস্যা...

হোসেন জিল্লুর রহমান : আগে মানুষ ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করেছে। এখন লড়াই করতে হচ্ছে পুষ্টি নিয়ে। পুষ্টিহীনতা এখন বড় সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে আপনি ক্ষুধা নিবারণের পথে গেলে তো হবে না। ভিন্ন পথ খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পগুলো ভালো করে বুঝতে হলে আপনাকে এর চালিকাশক্তিগুলো চিহ্নিত করতে হবে। রাষ্ট্র বা সমাজে দুই ধরনের চালিকাশক্তি থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে উদ্যমী মানুষের সংখ্যাটা অধিক। আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকায় আপনি এমন উদ্যমী মানুষ দেখতে পাবেন না।

আপনি দেখবেন, বাংলাদেশের মানুষ শত সমস্যার মধ্যেও ভাগ্য পরিবর্তনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এক পথে না পারলে দেখবেন অন্য পথে হাঁটছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন উদ্যমী এ মানুষগুলো। সরকারেরও নানা রকম উদ্যোগ আছে। কারণ গত ১০ বছরে হঠাৎ করে বাংলাদেশের কৃষিতে বিপ্লব আসেনি। উন্নয়নের একটি ধারাবাহিকতা আছে।

hossain-zillur-03.jpg

জাগো নিউজ : উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকারের ধারাবাহিকতাও সংযুক্ত হয়। অন্তত শাসক গোষ্ঠী তা-ই দাবি করেন…

হোসেন জিল্লুর রহমান : সরকারের ধারাবাহিকতা হলো অন্য আলোচনা। কিন্তু এ সরকার মধ্যম আয়ের কথা বলে একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে করি। তবে এ আকাঙ্ক্ষা পূরণে যে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন, সেখানে ঘাটতি আছে।

জাগো নিউজ : যেমন…

হোসেন জিল্লুর রহমান : গভীর বিশ্লেষণে সরকার হাত দিতে চায় না। এটিতে হাত দিলে নিজেদের অসঙ্গতিগুলো ধরা পড়ে যাবে। আপনি দেখেন, আত্মতুষ্টির সংকট থেকে অনেক সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পরিসংখ্যানগত সংকট। সরকারি পরিসংখ্যান এবং মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে।

সরকার তার একমাত্রিক সফলতা দেখাতে গিয়ে অন্য কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না। এখানেই মূল সমস্যা।

এএসএস/এমএআর /এমএস

সরকার তার একমাত্রিক সফলতা দেখাতে গিয়ে অন্য কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না। এখানেই মূল সমস্যাটা

মধ্যম আয়ের কথা বলে একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পেরেছে সরকার। তবে এ আকাঙ্ক্ষা পূরণে যে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন, সেখানে ঘাটতি আছে

বাংলাদেশের মানুষ শত সমস্যার মধ্যেও ভাগ্য পরিবর্তনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এক পথে না পারলে দেখবেন অন্য পথে হাঁটছেন তারা

পুষ্টিহীনতা এখন বড় সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে আপনি ক্ষুধা নিবারণের পথে গেলে তো হবে না। ভিন্ন পথ খুঁজতে হবে

আমরা যদি ২০২০ সালে বসে সত্তর দশকের খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলি, তাহলে বুঝতে হবে নীতিনির্ধারকরা সমস্যাটা বুঝতে পারছেন না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]