‘জোট’ রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছে বিএনপি!

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৭ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০২০

এক-এগারোর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের ভরাডুবির পর ‘জোট’ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে দলটি। সেই সময় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এসে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টি নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলে বিএনপি চারদলীয় জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১৮ দলীয় জোট গঠন করে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দল (একাংশ) ১৮ দলীয় জোটে যোগ দিলে ২০ দলে পরিণত হয় জোট

২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়া, অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ— এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সর্বপ্রথম জোট ত্যাগ করে শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ-ভাসানী। সামরিক জান্তার কায়দায় বিএনপি জোটের সংখ্যাতত্ত্ব ঠিক রাখার জন্য তৎকালীন কল্যাণ পার্টির নেতা আজহারুল ইসলামকে দিয়ে রাতারাতি ন্যাপ-ভাসানী সৃষ্টি করে। তার পরই অল্প সময়ের মধ্যে জোট ত্যাগ করে শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি- এনপিপি। এক্ষেত্রেও বিএনপি এনপিপি’র মহাসচিব ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে এনপিপি'র জন্ম দেয়।

ওই সময় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল’র তৎকালীন মহাসচিব আতিকুল ইসলাম ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এনডিপি’র মহাসচিব আলমগীর মজুমদারের নেতৃত্বে দল দুটির অংশ ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে। একপর্যায়ে বিএনপির দীর্ঘ সময়ের বন্ধু মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীর নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে জোট ত্যাগ করে। এক্ষেত্রেও বিএনপি সংখ্যাতত্ত্বের হিসাব ঠিক রাখতে ইসলামী ঐক্যজোটের জন্ম দেয়। গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে নতুন ইসলামী ঐক্যজোটের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা রসের জন্ম দেয়।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং ঐক্যফ্রন্টের মঞ্চে ১/১১ সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের উপস্থিতি নিয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জেবেল রহমান গানির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ এবং খোন্দকার গোলাম মোর্তজার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এনডিপি জোট ত্যাগ করে। এক্ষেত্রেও বিএনপি সামরিক জান্তার মতো নতুন দল তৈরি করতে ভুল করেনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফলাফল বর্জন এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে যোগদান নিয়ে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি- বিজেপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ।

অন্যদিকে, জোট ত্যাগ না করলেও জোটের মধ্যে আলাদা অবস্থান গ্রহণ করে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠন করলে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপা করার কারণে ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি। ফলে বিএনপির প্রচ্ছন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় দলগুলোতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। জোটের মধ্যে আস্থা ও সঙ্কটের জন্ম দেয়।

এর মধ্যেই জামায়াত নিয়ে বিএনপিতে নতুন ভাবনার জন্ম হয়। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে ‘জামায়াত ছাড়’ নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর জোটের শরিকদের মধ্যে নতুন করে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই জামায়াত ছাড়তে একমত হলেও এই ইস্যুতে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি।

তবে বিএনপির বিভিন্ন সূত্র জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে জোট বিলুপ্ত না করে ‘একলা চলো’ নীতি অবলম্বন করবে দলটি। ফলে জোট অকার্যকর হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, জোটের বর্তমান শরিকগুলোও যাতে বিএনপিকে জোট ভাঙার দায় দিতে না পারে সেজন্য এই কৌশল অবলম্বন করছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনগুলোতে বিএনপি তার ‘একলা চলো’ নীতিই অবলম্বন করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও এটি অবলম্বন করবে বলে জানা যায়।

গত ঈদুল আজহার দিন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা সাক্ষাৎ করেন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গণফোরামজাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়।

আগামী দিনে ‘জোট-ফ্রন্ট’ নিয়ে বিএনপি কত দূর এগোতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। দলটির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ বলছে, বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় একটি রাজনৈতিক দল। লাখ লাখ নেতাকর্মী তৃণমূলে সক্রিয়, সেখানে তাদের নিজস্ব একটি শক্তি আছে। আগামী দিনেও দলটিকে নিজের শক্তিতেই দাঁড়ানো উচিত। জোট-ফ্রন্টের নির্ভরতা থেকে সরে আসা জরুরি। তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় বিএনপি নিতে পারে না। এতে দলের নেতাকর্মীরাও মূল্যায়িত হবেন এবং সংগঠন হিসেবেও দল আরও শক্তিশালী হবে।

মূলত, সবকিছু মিলিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠন করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর ২০ দলীয় জোট অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, বিএনপির নেতাকর্মীরাও এখন জোট নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। জানা যায়, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের বক্তৃতা বিএনপির নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নেননি। একইভাবে ভোটযুদ্ধে জামায়াতের হাতে ধানের শীষের প্রতীক তুলে দেয়ায় বিএনপির প্রতি ক্ষুব্ধ হন ড. কামাল।

এটা সত্য যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন অনেকটাই কাগজে-কলমে। এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের অনেকেই মনে করেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ‘কার্যকর’ করতে গিয়ে বিএনপি জোটকে ‘গুরুত্বহীন’ করে তুলেছে। তাদের দাবি, ফ্রন্ট গঠনের পর ২০ দলের কিছু বৈঠক হলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে জোটকে শুধু তা শুনিয়ে দেয় বিএনপি। এতে ক্ষুব্ধ হন জোটের শরিক দলের নেতারা। তারপরও পুরোনো মিত্র অর্থাৎ ২০ দলীয় জোটের শরিকদের প্রত্যাশা, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে জোটের কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৮ সালের ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং সেই নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। কার্যত, ২০ দলীয় জোট এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত আকারে হচ্ছে। রাজনীতি এখন ভার্চুয়াল সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ। বিএনপি ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দল। তাদেরই ২০ দলীয় জোট চাঙা করার ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা জোটগত রাজনীতি চালু রাখার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে বলে আমি মনে করি।

‘কার্যত, বিএনপির একলা চলো নীতির ফলেই বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার আরও দানবীয় হয়ে উঠছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।’

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ২০ দলীয় জোটের কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান নয়। তবে জোট আছে। করোনার প্রকোপ কমলে কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে।’

বিএনপি তাদের কর্মসূচি এককভাবে অব্যাহত রেখেছে। শরিকদের কাছে ডাকছে না। এটা জোটের প্রতি বিএনপির অনাগ্রহ কি-না, এমন প্রশ্নে ইরান বলেন, ‘এটা বিএনপি জোটের শরিকরা ভালো বলতে পারবে। আমরা বিএনপির ওপর নির্ভরশীল।’ তিনি বলেন, জোটের কর্মসূচি না থাকলেও আমাদের প্রধান সমন্বয়কারীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম বলেন, আমাদের জোট ‘কাগজে-কলমে’ রয়েছে। কার্যক্রম নেই করোনার কারণে। কোভিডের প্রকোপ কমলে কার্যক্রম শুরু হবে, আন্দোলনও হবে।

বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতিতে চলছে। জোটের কোনো কর্মসূচি নেই। কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি জোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। আপনি কী মনে করেন? জবাবে ন্যাপ চেয়ারম্যান আজহারুল বলেন, ‘না, বিএনপি জোট ভাঙবে না। জোট ভাঙলে তারা আন্দোলনে সফল হবে না। এই সরকারের পতন ঘটাতে পারবে না। জোটবদ্ধ থেকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এই সরকারের পতন ঘটাব এবং সরকার গঠন করব।’

এলডিপি’র একাংশের নেতা শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, জোটের কার্যক্রম নেই। করোনার প্রকোপ কমলে কার্যক্রম শুরু হবে। আমাদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ রয়েছে। বিএনপি মূলত সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে চায়। এ কারণে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট- এই দুই জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারবিরোধী সবাইকে একত্রিত করার কৌশলগত অবস্থানে রয়েছি আমরা।

কেএইচ/এমএআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]