লকডাউনে ঠাকুরগাঁওয়ের আমচাষিদের মাথায় হাত

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ঠাকুরগাঁও থেকে
প্রকাশিত: ০৪:৪৩ পিএম, ১৪ জুলাই ২০২১

>> ফলন বেশি, ক্রেতা নেই

>> পেকে পচে যাচ্ছে আম

>> অর্ধেক দাম তুলতেই কৃষকের নাভিশ্বাস

উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁও। রাজধানী থেকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরের সীমান্তবর্তী এই জেলায় নীরবে ঘটেছে কৃষি বিপ্লব। আম-কাঁঠালসহ নানা ধরনের ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদন হয় জেলার সর্বত্র। চলমান লকডাউনে আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় আমচাষিরা পড়েছেন বিপাকে। বাগানে আম পেকে ফেটে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ক্রেতা কম।

ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার বিভিন্ন আম বাগান ঘুরে এ চিত্র চোখে পড়েছে জাগো নিউজের। মেঠোপথ পেরিয়ে জেলা শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের গ্রাম ছোটুয়াপাড়া। সেখানকার রাস্তার দুই ধারে আমের বাগান। নানা জাতের আম ঝুলছে থোকায় থোকায়। চোখ জুড়ানো সবুজ বাগান অতিথিদের জন্য উপভোগ্য হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য এখন তা চরম দুশ্চিন্তার। কারণ এ বাগানের আয়ের ওপরই চাষি ও বাগান কর্মীদের পরিবার নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে আম পেকে গেলেও বিক্রি না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

কথা হয় বাগান লিজ নেয়া দিনাজপুরের ব্যবসায়ী আশরাফ আলীর সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ২৫ বিঘা জমির ওপর ৪ হাজার আম গাছের বিশাল বাগান তার। হাড়িভাঙ্গা, মিশরিভোগ, আম্রপালি ও বারি ফোর- এই চার জাতের আম আছে সেখানে। গতবার এ বাগান থেকে ২ হাজার মণ আম বিক্রি হয়েছিল। এবার ফলন বেশি হয়েছে। আড়াই থেকে তিন হাজার মণ বিক্রির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্রেতার অভাবে আম পেকে বাগানেই পড়ে যাচ্ছে (ব্যবসায়ীদের কাছে বিষয়টি পচে যাওয়ার মতোই)।

এবার আম বিক্রি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন আম কিনতে। তাদের আম নিয়ে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু সমস্যা হলো লকডাউনের কারণে মানুষ বাজারে আসতে পারে না। মানুষ বাজার করতে পারছে না। যে কারণে বাগানের আম বিক্রি হচ্ছে না। বাগানেই পেকে ফেটে পড়ে যাচ্ছে আম।’

jagonews24

আশরাফ আরও বলেন, ‘গতবার ভালো দাম পেয়েছি। এবার ফলন বেশি, চাহিদা কম, দামও কম।’

‘সরকারের আমের প্রতি কোনো উদ্যোগই নেই। আম চাষিদের প্রতি তাদের কোনো নজর নেই। কৃষি বিভাগ খবরও নেয় না,’ অভিযোগ করেন এ ব্যবসায়ী।

আশরাফ আলীর ছেলে নুরুজ্জামান ইসলামও ব্যবসা করেন আমের। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৭০ মণ আম বিক্রি করেছি মাত্র। বাকি আম বিক্রি না করায় পেকে পড়ে যাচ্ছে। এজন্য কিছু ঘাটতিও আসছে। গতবার ২ হাজার ২০০ টাকা ছিল আমের মণ। এবার ১ হাজার ২০০ টাকা মণ যাচ্ছে। এই দামে আমাদের আসল (পুঁজি) টাকাই উঠবে না।’

নুরুজ্জামান বলেন, ‘দাম কমের কারণ হলো লকডাউন। জুনের ২৫-২৬ তারিখে আম পরিবহনের অনুমতি দেয়। এর কয়েকদিন পরই ১ তারিখ থেকে লকডাউন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আম্রপালির মাথার আম (বড় সাইজ) তুলি ১ তারিখের মধ্যে, বের হয়ে যায় ৮-১০ তারিখের মধ্যে। কিন্তু এখন ১২-১৩ তারিখ, কিন্তু আম তোলা শুরুই করতে পারিনি।’

নুরুজ্জামান বলেন, ‘চাহিদা কমে গেছে। মানুষ বাজারমুখী না হলে এই চাহিদা বাড়বে না। এ কারণে আম পেকে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে।’

jagonews24

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘১০ মণ পাকা আম দুই হাজার টাকায় বিক্রি করি। অথচ সময়মতো বিক্রি করলে সেটা ২০ হাজার টাকা হতো। এখানে ১৮ হাজার টাকা আমার লোকসান হবে।’

আম সংরক্ষণের কোনো উপায় আছে কি-না জানতে চাইলে এই তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই ক্যাপাসিটি আমাদের নেই। সরকার ব্যবস্থা করলে তো আমাদের সুবিধা হবে। যত দিন যাবে আমাদের দাম তত বাড়বে।’

এখানকার আমগুলোর মধ্যে দাম বেশি বারি ফোরের। গতবার এ আমটি বিক্রি হয়েছিল ৯ হাজার টাকা মণ দরে। এবার লকডাউনে চাহিদা না থাকায় এখনও বাগানেই রেখে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এভাবে কদিন রাখা যাবে সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মাথায়।

ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান বলেন, ‘তিন লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি। ন্যূনতম ২০ লক্ষ টাকার আম বিক্রি করলে আমার রক্ষা হবে। না হলে সব শেষ।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘জমির লিজের টাকা। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি; আজকে ৩০ জন লোক ডিউটি করছে, প্রতিদিন ১০ জন কাজ করে, তাদের খরচ। সঙ্গে আমাদের খরচ। এসব তুলে নিজের ব্যবসা করতে হবে। কিন্তু যা দেখছি, তাতে তো কুল কিনারা পাচ্ছি না, কী করব?’

একই পরিস্থিতি চোখে পড়েছে ঠাকুরগাঁও সদরের পূর্ব নারগুন ইউনিয়নের শাপলা গ্রামের একটি আম বাগানে। স্থানীয় চাষি আবদুর রহমানের ৫ বিঘা জমির ওপর ১২৫টি আম গাছ। ব্যাপারী সাদেকুল ইসলাম ৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। বছরে ১ লাখ টাকা করে দিতে হয়। পরিচর্যার জন্য তিনজন লোক আছে। মূলত চট্টগ্রামে আম পাঠান তারা।’

বাগানের তত্ত্বাবধায়ক মো. আরিফ বিল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে নতুন দুই জাতের আম আছে- বন্দিগুটি ও জামাইপচন। আমাদের আম তোলা শুরু করিনি। কোরবানির ঈদের পর তুলব। এখন লকডাউনে তো মানুষ বের হচ্ছে না। আম কিনছেও না। তাই চাহিদা নেই। আর চাহিদা না থাকায় দাম কমে গেছে। পাশাপাশি আম পড়ে আছে। পচনশীল পণ্য তো বেশিদিন রাখাও যায় না।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘গতবার ১৭৫ মণ আম হয়েছিল, এবার ফলন আরও ভালো হয়েছে। কিন্তু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি দামও কমে গেছে।’

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি অফিসার (উপ-পরিচালক)  আবু হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলায় সুর্যপুরী, বারি ফোর, আম্রপালি, হাড়িভাঙা, মিশ্রিভোগ, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, হিমসাগর, বান্দিগুটি, জামাইপচন, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আম হয়। প্রায় ৫ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিজুড়ে আম বাগান। এবারে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আমের ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমের ফলন ভালো হয়েছে, আমরা আশা করছি, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।’

করোনা পরিস্থিতিতে চাহিদা কম থাকার কারণে কৃষকরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দাম কম বলে স্বীকার করেন কৃষি কর্মকর্তা। তবে তিনি বলেন, ‘আম বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে আমরা সব ব্যবস্থা নিয়েছি। পরিবহনের ব্যবস্থা রাখছি। এছাড়াও আম বিক্রি বাড়াতে আমাদের সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রামের অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে আমকেও অন্তর্ভুক্ত করতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বলেছি।’

সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা তো হঠাৎ করে করা যাবে না। তবে আমরা সব সময় সরকারকে অবহিত করে আসছি। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি উৎপাদন মৌসুমটা যাতে সম্প্রসারিত হয়। আম্রপালি, বাটিমন, বানানা, সুর্যপুরি, বারিফোরসহ অনেক আম পরে আসে। এছাড়াও চাষিদের প্রশিক্ষণ, জাত সরবরাহসহ নানা কার্যক্রম আমরা নিয়ে থাকি; যাতে আমের উৎপাদন সময় বা সৃজনটা বাড়ানো যায়।’

এসইউজে/এসএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]