বাংলাদেশ-পাকিস্তান টেস্ট

দ্বিতীয় দিনে ব্যাটারদের পর বোলাররাও হাঁটলেন ভুল পথে

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ০৯ মে ২০২৬

ভক্ত ও সমর্থকরা হতাশ।

চমৎকার এক সুন্দর দিন কাটানোর পর তারা আশায় ছিলেন আরও ভালো কিছুর প্রত্যাশায়; কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টোটা। প্রথমদিন নাজমুল হোসেন শান্তর অনবদ্য শতরান, সঙ্গে মুমিনুল হক (৯১) আর মুশফিকুর রহিমের (৪৮ নট আউট) দৃঢ়তায় ৪ উইকেটে ৩০০ পেরিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় দিন শেষে আর এতটা মজবুত অবস্থানে নেই। শনিবার দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানিরাও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

পেসার মোহাম্মদ আব্বাস বল হাতে পাকিস্তানকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনার মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর দুই ওপেনার অভিষেক হওয়া আজান আওয়াইজ আর ইমাম-উল-হক এবং আরেক ডেব্যুট্যান্ট আব্দুল্লাহ ফজল মিলে পাকিস্তানকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। আর দায়িত্ব নিয়ে ইনিংসটাকে বড় করার লক্ষ্যে না ব্যাটিং করে বাংলাদেশ নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করেছে।

উইকেটে কোনো বাড়তি গতি ছিল না। বিপজ্জনক বাউন্সও নেই। সুইং নেই বললেই চলে। ধৈর্য ধরে উইকেটে থাকাই শেরে বাংলার এ পিচে রান করার একমাত্র কার্যকর কৌশল। বাংলাদেশের দুই ব্যাটার নাজমুল শান্ত আর মুমিনুল হক সেই কাজটি ঠিকমতো করলেও আজ শনিবার দ্বিতীয় দিন মুশফিক, লিটন দাস আর মিরাজরা সে পথে না হেঁটে প্রথম ভুল করেন। আর পরের ভুল পথে পা বাড়ান বোলাররা। বিশেষ করে তিন পেসার নাহিদ রানা, তাসকিন আর এবাদত। ভালো জায়গায় বল ফেলে পাকিস্তানিদের ধৈর্যের পরীক্ষা না নিয়ে বেশি গতিতে বল করা আর অযথা বাউন্সার ছোড়ার চেষ্টায় উইকেটশূন্য ছিলেন বাংলাদেশের ৩ দ্রুতগতির বোলার।

আজ দ্বিতীয় দিন শেষে পাকিস্তানিরা পিছিয়ে ২৩৪ রানে। শান মাসুদের দলের হাতে আছে ৯ উইকেট।

ইনিংসের শুরুর দিকে বাংলাদেশের স্পিডস্টার নাহিদ রানার বলে মাথায় আঘাত পেয়ে ভড়কে না গিয়ে সাহস ও আস্থায় বাকি সময় দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যাট করে শতরানের কাছাকাছি চলে গেছেন আজান আওয়াইজ। আর মাত্র ১৫ রান করতে পারলেই তৌফিক ওমর আর ইয়াসির হামিদের পর তৃতীয় পাকিস্তানি হিসেবে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে শতরানের কৃতিত্ব দেখাবেন এ বাঁ-হাতি তরুণ।

প্রথম দিন যত কথা হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্ত আর মুমিনুল হককে নিয়ে। শান্তর কাউন্টার অ্যাটাক আর মুমিনুল হকের অতি সতর্ক-সাবধানী অ্যাপ্রোচ নিয়েই মেতেছিলেন টাইগার সমর্থকরা। আজ সেখানে জেগেছে হতাশা। সকালে হতাশ করেছেন মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস আর মেহেদি হাসান মিরাজ।

তাদের তিনজনের সামনে সুযোগ ছিল যার যার ইনিংসগুলোকে বড় করার। মুশফিকুর রহিম অনেকক্ষণ খেলেছেন; কিন্তু শতরান করতে পারেননি। ফিরে গেছেন ৭১ রানে। লিটন দাস ৩২ রানে একবার গালিতে ক্যাচ আউট হওয়ার হাত থেকে রিভিউতে বেঁচে গিয়ে ৩৭ রানে ফিরে গেছেন।

আর মিরাজও ওয়ানডে মেজাজে খেলতে গিয়ে এক ছক্কা ও বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ১৭ রানে ফিরে গেছেন। লিটন ও মিরাজের একজন মুশফিকের সঙ্গে জুটি গড়তে পারলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের চিত্র বদলে যেতো। কিন্তু তারা কেউ দায়িত্ব নিয়ে লম্বা ইনিংস খেলতে না পারায় আজ প্রথম সেশনে ১১২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ৪১৩ রানে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।

সেটাই ছিল ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রথম সুযোগ হাতছাড়া করা। তারপর দরকার ছিল মাপা ও বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং; কিন্তু নাহিদ রানা, এবাদত আর তাসকিনরা বাড়তি গতি সঞ্চারের পাশাপাশি বাউন্সার ছুড়ে পাকিস্তানিদের ঘায়েল করতে গিয়ে উল্টো বিপদ ডেকে এনেছেন।

শুরুতে নাহিদ রানা বাউন্সারে পাকিস্তানি ওপেনার আজান আওয়াইজের মাথায় আঘাত করে জানান দিলেন গতিতে ঝড় তোলার; কিন্তু বাকি সময়ে নাহিদ রানা আর কিছুই করতে পারেননি। বরং বলে কারুকাজ না করে, সুইং ও একটা চেইনে বল ফেলে পাকিস্তানিদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টায় না গিয়ে এলোমেলো বল করে ব্যর্থ দিন কাটিয়েছেন।

৯ ওভারের স্পেলে ৪৭ রানে উইকেটশূন্য থাকা দ্রুতগতির বোলার নাহিদ রানা খুব বেশি খাটো লেন্থে বল ফেলে পাকিস্তানি ব্যাটারদের ঘায়েল করতে গিয়ে এক ওভারে পরপর তিন বলে পাক ওপেনার আজান আওয়াইজের কাছে বাউন্ডারি হজম করেন।

তাসকিন আর এবাদতের কেউ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। এ উইকেটে সে অর্থে বোলারদের জন্য তেমন কিছু নেই। এ কন্ডিশনে জায়গামতো বল করাই হলো একমাত্র কাজ। ভালো লাইন ও লেন্থে বল ফেলতে পারলেই কেবল প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের পরীক্ষা নেওয়া যাবে। সেই উপলব্ধি থেকেই এক চেইনে ধারাবাহিকভাবে বল করে সফল হয়েছেন পাকিস্তানের মধ্যম গতির বোলার মোহাম্মদ আব্বাস। ঠিকই ৫ উইকেট শিকার করেছেন তিনি।

তার দেখানো পথে হাঁটার চেষ্টাই করেননি নাহিদ রানা, তাসকিন ও এবাদতের কেউ। ২ স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ আর তাইজুলও সুবিধা করতে পারেননি। টেস্টে সাকিব ছাড়া বাংলাদেশের আশা-ভরসা তাইজুল। কিন্তু পাকিস্তান ব্যাটিং লাইনআপে বাঁ-হাতি ব্যাটার বেশি থাকায় তাইজুলকে ব্যবহার করতে বারবার ভাবতে হচ্ছে অধিনায়ক শান্তকে। আজান আওয়াইজ আর ইমাম-উল-হক দুই বাঁহাতি প্রায় ২ ঘণ্টা ব্যাট করায় তাইজুলকে ৫ ওভারের বেশি বোলিং করাননি বাংলাদেশ অধিনায়ক।

টেস্ট ক্রিকেটই এমন। ৫ দিনের খেলায় ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় না। সেশন টু সেশন খেলা। একদিন ভালো কাটলে পরদিন খারাপ যেতেই পারে। সেই ভালোর পর খারাপ আসতে পারে, আর খারাপের পর ভালো করতে হবে- এই বোধ, অনুভবটা খুব জরুরি।

পাকিস্তানিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন ম্যাচে ফিরতে বাংলাদেশকে আবার নতুন উদ্যমে, কার্যকর কৌশলে সামনে এগোতে হবে। মোহাম্মদ আব্বাস আজ শনিবার দেখিয়ে দিয়েছেন, বাড়তি কিছু না করে, জোরে বল না করে গড়পড়তা ১২৫ কিলোমিটার গতিতে বল ফেলেও সফল হওয়া যায়। বাড়তি গতি, মুভমেন্ট, সুইংয়ের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে জায়গামতো বল ফেলতে পারলেই বল হাতে সফল হওয়া সম্ভব।

নাহিদ রানা, তাসকিন আর এবাদতের কেউ একজন আব্বাস হতে না পারলে ম্যাচে ফেরা কঠিন। এখন দেখার বিষয়, আগামীকাল রোববার তৃতীয় দিন বাংলাদেশ কোন কৌশলে, কার হাত ধরে ম্যাচে ফিরে?

এআরবি/আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।