তিন ফাইনালেও হলো না স্বপ্ন পূরণ

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ০৭:৪০ পিএম, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশে কোন খেলাটি এখন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়? প্রশ্নটা শুনলে যে কেউ পাগলও ভাবতে পারেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে ক্রিকেটের ধারে-কাছেও কি রয়েছে অন্য কোনো খেলা? ফুটবলের জনপ্রিয়তা একসময় ছিল। এখনও হয়তো আছে; কিন্তু ক্রিকেটের মত এতটা নেই। দেশীয় ফুটবল যেন নিজে থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অন্য কোনো খেলার তো ক্রিকেটের ধারে-কাছে আসারও সুযোগ নেই।

কিন্তু সাফল্য? বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাফল্য কি? কোন টুর্নামেন্ট জিতেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিন্তু দেশের অগণিত ক্রিকেট ভক্ত এবং সমর্থককে মাথা চুলকাতে হবেই। সবশেষে ব্যর্থ-মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হবে সবাইকে। কারণ, টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর জাতীয় ক্রিকেট দল তো সত্যিকারার্থেই কোনো টুর্নামেন্টের ট্রফি জিততে পারেনি।

১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়া অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফি জয়ই কোনো টুর্নামেন্ট থেকে শিরোপা জেতার একমাত্র সম্বল বাংলাদেশের। যে টুর্নামেন্টটি এখন আর বাংলাদেশকে খেলতে হয় না। বাংলাদেশ সেই লেভেল থেকেই উঠে গেছে অনেক উঁচুতে।

দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ছাড়া ত্রিদেশীয় কিংবা তার বেশি দেশ নিয়ে অনুষ্ঠিত কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা ওঠেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) শো কেসে। বরং, বেশ কয়েকবার ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে না পারার হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়েছে টাইগারদের।

২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে মাত্র ২ রানে হেরে শিরোপা জিততে না পারার বেদনা সবচেয়ে বেশি পুড়িয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের। তারও আগে, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে এবং শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রিদশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে সেবার লঙ্কানদের হারিয়েছিল সাকিব আল হাসানরা। কিন্তু ফাইনালে গিয়ে মুত্তিয়া মুরালিধরনের অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ের কারণেই শিরোপা জেতা হয়নি আর বাংলাদেশের।

bd

এরপর ২০১২ সালের এশিয়া কাপের ফাইনাল। ভারত এবং শ্রীলঙ্কার মত প্রতিষ্ঠিত শক্তির দলকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের ফাইনাল খেলা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ২ রানের আক্ষেপ এখনও পোড়ায় পুরো বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের।

চার বছর পর, ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হলো টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। এবার গ্রুপ পর্ব থেকেই শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানকে বিদায় করে দিয়ে বাংলাদেশ খেলে ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ভারত। কিন্তু ফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি টাইগাররা। ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হেরে যেতে হয়েছে।

২ বছর বিরতি দিয়ে ২০১৮ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের সামনে অন্তত একটি ফাইনাল জয়ের হাতছানি। তিন-তিনবার ফাইনালে উঠেও অধরা স্বপ্নটা ধরা দেয়নি বাংলাদেশের হাতে। তিনবারই হারতে হলো টাইগারদের। ফলে ট্রফি কেসে কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ের ট্রফিটা এখনও পর্যন্ত শোভা পাচ্ছে না বাংলাদেশের।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতেই জিম্বাবুয়ে এবং শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ঘরের মাঠে বসেছিল ত্রি-দেশীয় টুর্নামেন্ট এবং এই একটি মাত্র টুর্নামেন্ট ছিল, যেখানে শুরু থেকেই বাংলাদেশ টপ ফেবারিট। শিরোপা জয়টা যেন নিশ্চিত। টুর্নামেন্টের শুরুটাও ছিল চমৎকার। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে (১৬৩ রানে) জয়ের রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ।

bd

কিন্তু গণেশ উল্টে গেলো গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা শেষ ম্যাচ দিয়ে। ওই ম্যাচে বাংলাদেশকে লঙ্কানরা হারালো ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। বাংলাদেশ অলআউট হয়ে গিয়েছিল ৮১ রানে। জবাব দিতে নেমে ২২৯ বল এবং পুরো ১০ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় লঙ্কানরা।

তবুও প্রত্যাশা ছিল ফাইনালে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু লঙ্কানদের করা ২২১ রানের জবাব দিতে পারেনি টাইগাররা। সাকিব আল হাসান পড়লেন আঙ্গুলের ইনজুরিতে এবং বাংলাদেশ অলআউট হলো মাত্র ১৪২ রানে। ৭৯ রানে হেরে শিরোপা অধরাই থেকে গেলো বাংলাদেশের।

মার্চেই বাংলাদেশ আমন্ত্রিত হয়ে খেলতে গেলো শ্রীলঙ্কার নিদাহাস ট্রফিতে অংশ নিতে। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ত্রিদেশীয় এই টুর্নামন্টের বাকি দেশটি ভারত। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশ থেকে ত্রিদেশীয় ট্রফি জিতে নিয়ে গেছে। জিতেছে টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজও। সে হিসেবে নিদাহাস ট্রফিতে ভারতের সঙ্গে তারাও ফেবারিট।

কিন্তু লঙ্কানদের দুইবার হারিয়ে ফাইনাল খেললো বাংলাদেশই। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ভারত। প্রথমে ব্যাট করে ১৬৬ রান করার পর বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু নাটকীয় এই ফাইনালে একেবারে শেষ বলে এসে হেরে গেলো বাংলাদেশ। ভারতের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান দিনেশ কার্তিক শেষ মুহুর্তে ৮ বলে করলেন ২৯ রান। তার এই ঝড়ো ব্যাটিংয়ের সামনেই হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে।

bd

বছরের শুরুতেই দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে শিরোপা বঞ্চিত থাকতে হলো বাংলাদেশকে। বছরের শেষভাগে এসে আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ খেলতে গিয়েছিল ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়েই। ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানও শক্তিশালী। বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠা হবে অনেক বড় কিছু।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৩৭ রানের বিশাল জয় দিয়ে এশিয়া কাপে যাত্রা শুরু। কিন্তু নিজেদের পরের ম্যাচেই আফগানিস্তানের মতো দলের কাছে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ টাইগাররা। রশিদ খান আর মুজিব-উর রহমানের লেগ ও অফ স্পিনের ঘূর্ণির সামনে বালির বাধের মতো ধসে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন। হারতে হয়েছিল ১৩৬ রানের বিশাল ব্যবধানে।

আফগানদের কাছে হেরে গ্রুপ রানারআপ হিসেবেই সুপার ফোরে ওঠে বাংলাদেশ। সুপার ফোরের শুরুতেই ভারতের কাছে বাংলাদেশের হার ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে। টিকে থাকতে হলে পরের ম্যাচগুলোতে অবশ্যই জিততে হবে।

সেই মিশনের শুরুটা হলো আফগানদের ৩ উইকেটে হারিয়ে। অন্যদিকে ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচ টাই হওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি। বাংলাদেশের জন্য হলো সুবিধা। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠার জন্য বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচটি রূপ নেয় অঘোষিত সেমিফাইনালে। সেই ম্যাচে সাকিব-তামিমকে ছাড়াই বাংলাদেশ জিতে গেল ৩৭ রানের ব্যবধানে।

bd

ফাইনালে আবারও মুখোমুখি ভারতের। যারা যে কোনো টুর্নামেন্টের নকআউটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল হোক কিংবা ২০১৭ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমি ফাইনাল- ভারতের সামনে পড়লেই যেন হার বাংলাদেশের।

একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি হলো এশিয়া কাপের ফাইনালেও। এবারও বেশ নাটকীয়তা তৈরি হয়েছিল। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ অলআউট ২২২ রানে। ওপেনার লিটন দাস ১২১ রানের অনবদ্য ইনিংসটা না খেললে হয়তো কম রানে অলআউট হওয়ার লজ্জায় পড়তে হতো টাইগারদের।

লিটন ক্যারিয়ার সেরা ১২১ রান করার পরও বাংলাদেশ করতে পারলো মোটে ২২২ রান। এই রান নিয়েও লড়াই করলো বোলাররা। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ওপর দারুণ চাপ তৈরি করে মাশরাফি-মোস্তাফিজরা। কিন্তু ইনিংসের একেবারে শেষ বলে এসে জয় তুলে নেয় ভারত। আরও একবার শিরোপা বঞ্চিত থাকতে হলো টাইগারদের।

অর্থ্যাৎ, ২০১৮ সালে তিনবার ফাইনালে উঠেও একটিমাত্র শিরোপা জয়ের আক্ষেপ ঘোচাতে পারলো না টাইগাররা। বারবার ছোট্ট কিছু ভুল কিংবা শ্বাসরূদ্ধকর লড়াই শেষে স্বপ্নটা অধরাই থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের।

আইএইচএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :