ছিলেন লর্ডসের মাঠকর্মী, কোচ হয়ে নিউজিল্যান্ডকে তুললেন ফাইনালে

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা লর্ডস, লন্ডন থেকে
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৯

গ্যারি স্টিড নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন। তার মত সৌভাগ্যবান মানুষ ক্রিকেট দুনিয়ায় আর কজন আছে? এক সময় যে মাঠের গ্রাউন্ড স্টাফ (মাঠকর্মী) ছিলেন, ২৯ বছর পর সেই ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে তার কোচিংয়েই এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছে নিউজিল্যান্ড।

১৪ জুলাই ফাইনালের ৪৮ ঘন্টা আগে সেই লর্ডসের প্রেস কনফারেন্সে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিকের সামনে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অবলীলায় বলে দিলেন, ১৯৯০ সালে এমসিসির (মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব, লর্ডসের মালিক ক্লাব) স্টাফ ছিলাম আমি। গ্রাউন্ড স্টাফ হিসেবেও কাজ করেছি।’

নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত সাংবাদিক ও দীর্ঘ দুই যুগ ক্রিকেট রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতায়পুষ্ট এ্যান্ড্রু আর খানিকটা জুড়ে দিলেন, ‘হ্যাঁ, ১৯৯০ সালে এমসিসির হয়ে কাজ করতে এসেছিলেন গ্যারি স্টিড। সে সময় গ্যারি ছিলেন শুধুই এমসিসির স্টাফ। লর্ডসের দরজা-জানালা পরিষ্কারের কাজও করেছেন।’

১৯৯০ সালে যে মাঠে তিনি ছিলেন সাধারণ কর্মী, সেই ক্রিকেট ‘মক্কায়’ ২৯ বছর পর তার কোচিংয়ে নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে। এর চেয়ে ভাল লাগার, সুখের আর আনন্দের কি হতে পারে?

গ্যারি স্টিড জাতীয় দলের কোচ হয়েছেন এক বছর পুরো হয়নি। গত বছর আগস্টে নিউজিল্যান্ডের প্রশিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন গ্যারি। বছর না ঘুরতেই তার কোচিংয়ে দল বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চের ফাইনালে।

১৪ জুলাই লর্ডসের ফাইনালে স্বাগাতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবার আগে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকটিই উপহার দিয়েছে গ্যারি স্টিডের শিষ্যরা। কেন উইলিয়মাসনের নেতৃত্বে বিরাট কোহলির ভারতকে ২৮ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্ল্যাক ক্যাপসরা। এত অল্প সময়ে এমন আকাশ ছোঁয়া সাফল্য জোটে কজনার ভাগ্যে?

কে জানে, রোববারের বহুল প্রত্যাশিত ফাইনালে স্বাগতিক ইংলিশদের স্বপ্ন ভেঙ্গে প্রথমবার বিশ্বসেরা মুকুট মাথায় পড়তে পারে কিউইরা। আর তা হলে গ্যারি স্টিড সাফল্যের নৈপথ্য রূপকার হিসবে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পুরো দলের সাথে তার নামও লিখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।

১৪ জুলাই লর্ডসে জেসন রয়, জস বাটলার, ইয়ন মরগ্যান, বেন স্টোকস আর জোফরা আর্চারদের বিপক্ষে শেষ হাসি না হাসলেও নিউজিল্যান্ড এরই মধ্যে নজর কেড়েছে ক্রিকেট বিশ্বর। অনেক ক্রিকেট অনুরাগির মনও জয় করেছে স্টিডের শিষ্যরা।

ফাইনালের ৪৮ ঘন্টা আগে লর্ডসের ঠিক পাশের প্র্যাকটিস কমপ্লেক্সে তিন ঘন্টার নিবিড় ও পুরো প্র্যাকটিস সেশনে দেখা মিললো সদা তৎপর গ্যারির। এর ওর সাথে কথা বলছেন। নেটে যাবার আগে ব্যাটসম্যানের পাশে দু মিনিট দাঁড়িয়ে শলা পরামর্শ করে নিলেন। তারপর আসলেন লর্ডসের প্রেস কনফারেন্স রুমে।

এবারের বিশ্বকাপে রেকর্ড ৫ সেঞ্চুরিয়ান রোহিত শর্মা, সময়ের সেরা ক্রিকেটার বিরাট কোহলি আর মিস্টার ‘কুল’ মহেন্দ্র সিং ধোনির ভারতের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙ্গে তার কোচিংয়ে দল ফাইনালে। ভাবছেন কলার উঁচিয়ে বুঝি প্রেস কনফারেন্সে এসেছিলেন নিউজিল্যান্ড কোচ! মোটেই তা নয়। দেখে আর কথা বার্তা শুনে মনে হলো ‘বিনয়ের অবতার’ যেন।

এমনিতেই কিউইরা মাঠ ও মাঠের বাইরে বিনয়ী, গ্যারি স্টিডের কথা শুনে মন হলো তিনি এক প্রস্থ বেশি ভদ্র। ১৩ মিনিটের প্রেস কনফারেন্সে একটি বার জোর গলায় কথা বললেন না। তাই বলে ভাববেন না, ফাইনালে উঠেই নিজেদের কাজ শেষ ভাবছে কিউইরা।

কেন্টারব্যুরির ৪৭ বছর ১৮৪ দিন বয়সী কিউই কোচের কথা বার্তা আর শরীরি অভিব্যক্তি পরিষ্কার বলে দিল, তারা শুধু কথা বার্তায় নয় চিন্তা-ভাবনায়ও সতর্ক সাবধানি। জানেন, ঘরের মাঠে দারুণ খেলে ফাইনালে আসা ইংলিশদের হারিয়ে বিশ্বসেরা হওয়া সহজ হবে না। সেই কাজ করতে চাই সামর্থ্যের সেরাটা উপহার দেয়া চাই।

তাই গ্যারি স্টিড জানিয়ে দিলেন, ‘ফাইনালের আগে আমরা ভীত নই। আবার খুব বেশি চাপেও ভুগছিনা। কারণ ফাইনাল মানেই অন্যরকম চাপ। আমার মনে হয় দু দলের জন্যই চাপটা সমান।’

এক কিউই সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আচ্ছা স্টিভ, ফাইনালে ইংলিশদের চাপটা কি একটু বেশি থাকবে? কারণ তারা স্বাগতিক, দর্শক ও সমর্থনপুষ্ট হয়ে মাঠে নামবে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ফাইনাল, সেটাও কি এক ধরনের চাপ নয়?’

গ্যারির সাজানো গোছানো ব্যাখ্যা, ‘আমার তা মনে হয়না। আমি মনে করি দুই দলের জন্যই চাপটা সমান থাকবে।’

টপ ফেবারিট ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে আসা দল, শেষ হাসি হাসতে নিশ্চয়ই বদ্ধ পরিকর? কিউই কোচের উত্তর, ‘হ্যাঁ, তা অবশ্যই।’

সেটা প্র্যাকটিসে কেন উইলিয়ামস, মার্টিন গাপটিল, রস টেলর, জেমস নিশাম, কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম, ট্রেন্ট বোল্ট আর ম্যাট হেনরিদের হাঁটা চলা ও চোখ মুখই বলে দিচ্ছিল। সবাই যেন আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আস্থার মাত্রাও খুব বেশি।

ফাইনালে ওঠাই শেষ কথা নয়। কাপ জেতা আর বিশ্বসেরা হতে পারাই আসল- এ কঠিন সত্য উপলব্ধি করছেন প্রতিটি কিউই ক্রিকেটার। তার প্রমাণও মিলল। আজ (শুক্রবার) ছিল ঐচ্ছিক অনুশীলন। কিন্তু পুরো দল ঠিক চলে এসেছে প্র্যাকটিসে। সেটাও এক দেড় ঘন্টার নয়, তিন ঘন্টার পুরো প্র্যাকটিস সেশনে ব্যাটিং, বোলিং আর ফিল্ডিং প্র্যাকটিসটাই হলো পুরোদমে।

তবে কোচ গ্যারি কিন্তু একবারের জন্য মুখ থেকে উচ্চারণ করেননি, ‘ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিততে চাই আমরা। ’

বুঝিয়ে দিলেন লক্ষ্য অটুট, কাপ জয় । তবে সেই কথাটি উপস্থাপন করলেন ভিন্ন ভাবে, ‘ আমরা কাপ জয়ের কথা মাথায় নিয়ে নয়, ১৪ জুলাই লর্ডসে খেলতে নামবো নিজেদের সামর্থ্যের সেরাটা দিতে। আমরা যতটা ভাল পারি, ঠিক ততটাই ভাল খেলার চেষ্টা থাকবে।’

নিউজিল্যান্ডের এক ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ পরিবারের সন্তান গ্যারি স্টিড। দেশের হয়ে ৫ টি টেস্ট খেলেছেন। ব্যাটসম্যান কাম লেগস্পিনার গ্যারির টেস্ট ক্যারিয়ার মোটেই উজ্জ্বল নয়। টেকেওনি বেশি দিন। ১৯৯৯ সালের মার্চে ঘরের মাঠে টেস্ট অভিষেক। ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে সাদামাঠা পারফরমেন্সেই শেষ ক্যারিয়ার। ৫ টেস্টের ৮ ইনিংসে রান করেছিলেন ২৭৮। সর্বোচ্চ ৭৮ । ৩৪.৭৫ গড়।

খেলা শেষ করে নিউজিল্যান্ড হাই পারফরমেন্স ইউনিটের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০০৮ সালে কোচ হন কিউই নারী ক্রিকেট দলের। তার কোচিংয়ে নিউজিল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল ২০০৯ সালে বিশ্ব নারী ক্রিকেট কাপের ফাইনাল খেলে এবং ২০১০ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্টি কাপ ফাইনাল খেলে।

তারপর নিউজিল্যান্ডে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কেন্টারব্যুরির কোচের দায়িত্ব পালন করেন ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে নিউজিল্যান্ড মূল দলের কোচ হন। মাইক হেসনের জায়গায়। স্টিডের পিতা ডেভিড কেন্টারব্যুরির হয়ে ৮০ টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছেন। একই দলের হয়ে খেলেছেন লিস্ট 'এ' ক্রিকেটেও।

এআরবি/এমএমআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :