তবে কি কাপের নামটি আইরিশ!

পবিত্র কুন্ডু
পবিত্র কুন্ডু পবিত্র কুন্ডু , বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১১:০২ এএম, ১৪ জুলাই ২০১৯

১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে সর্বশেষ এবং একমাত্র শিরোপার পর দ্বিতীয়টি জয়ের বৃহত্তম’ সম্ভাবনা জাগিয়েছিল ইংল্যান্ড গত বছর। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে। সামারায় সুইডেনকে যেদিন কোয়ার্টারফাইনালে ২–০ গোলে হারিয়ে দিল ইংল্যান্ড, সব জায়গাতেই ইংলিশ সমর্থকদের কণ্ঠে শুনেছি সমবেত গান- ইট’স কামিং হোম, কামিং হোম..., ফুটবল এবার ঘরে ফিরছে, জন্মভূমিতে ফিরছে।

অর্থাৎ খেলাটির জনক ইংল্যান্ড আবারো জিততে চলেছে বিশ্বকাপ, আবারো হচ্ছে বিশ্বসেরা। শেষ পর্যন্ত সেই আশা আর স্বপ্ন সেমিফাইনালে চুরমার করে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। ইংল্যান্ডের আরেকটি বিশ্বকাপ ফুটবল জয়ের স্বপ্ন ৫৪তম বছরের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারিয়ে গেছে দূরে কোথাও।

Morgan

ফুটবলের বিশ্ব শিরোপা তাও একটি আছে; কিন্তু ক্রিকেটে তো তাও নেই ইংল্যান্ডের। দেশটি ক্রিকেট নামের এই মোহনীয় খেলাটিরও জন্মদাতা। ক্রিকেট শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর কেটে গেছে ৪৪টি বছর।

শুধু হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসেই ভারী হয়েছে ইংলিশদের অন্তর। বিশ্বকাপের প্রথম তিনটি আয়োজন তাদের ফিরিয়েছে শূন্যহাতে। পরের তিনবার বাদ দিয়ে সপ্তম বিশ্বকাপের আয়োজনেও রিক্ত ইংল্যান্ড।

এবার ঘরের মাঠে দ্বাদশ বিশ্বকাপের মেলায় বৃত্তটি কি হবে পূর্ণ, ঘুচবে হাহাকার? নাকি পুরোনো গল্পই নতুন করে লেখা হবে? নিজের উঠোন থেকে সদর্পে কাপ নিয়ে যাবে অন্য দল আর ইংল্যান্ড বিষন্ণ চোখে দেখবে সেই দৃশ্য?

বাজির দরে ইংল্যান্ড নিউজিল্যান্ডের চেয়ে অনেক ওপরে। নিজেদের চিরপরিচিত মাঠ, সপ্রাণ–সরব দর্শক। আর যে আগ্রাসী ব্র্যান্ডের ক্রিকেট শেষ লড়াইতে এনে তুলেছে ইংল্যান্ডকে, তাদেরই মাথায় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দেখছে বৃহত্তর ক্রিকেট–সংসার।

Morgan

হতেই পারে ক্রিকেটের অন্তরাত্মা এবার ইংল্যান্ডকে শিরোপাটা দেবে বলে ভেবে রেখেছে। ১৪ জুলাই, রবিবাসরীয় লর্ডসের চোখ ঝলসানো আলোর রাজ্যে অতি প্রার্থিত ট্রফিটা হয়তো উঠছে ইয়ন মরগ্যানের হাতে।

ইয়ন মরগ্যান নামটিই হয়তো স্বপ্নপূরণের উপলক্ষ্য বলে তার হাতে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলের অধিনায়কত্ব টানা দুটি বিশ্বকাপে। না হলে গড়পড়তা মানের একজন আইরিশ, যার অধিনায়কত্বে গত বিশ্বকাপে অতলে ডুবেছিল ইংল্যান্ড, এমন করে কেন জেগে উঠবে? এ তো সেই মাইথোলজির গল্প, ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে ওঠা! আর একেই বলে ঘটনাচক্র।

এর আগে তিনজন ইংলিশ শেষ লড়াইয়ে নিয়ে গিয়েও বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি ইংল্যান্ডকে। একজন আইরিশের হাত ধরে ইংলিশরা আবার অধরা কাপ জয়ের নিঃশ্বাস দূরত্বে পৌঁছে গেছে।

১.৭৫ মিটার উচ্চতার এই আইরিশের ছায়া পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে আমি যেন লর্ডসের গ্যালারিতে দেখতে পাচ্ছি সেই প্ল্যাকার্ড, শুনতে পাচ্ছি সেই কোরাস : ইট’স কামিং হোম, কামিং হোম...।

যার দিকে তাকিয়ে এখনো আদি ইংরেজ অহমে চোট লাগে, এখনো যাকে ড্রেসিংরুমে আইরিশ কৌতুকের উপাদান হতে হয়, জাতীয় সংগীত ‘গড সেভ দ্য দি কুইনে’ গলা না মেলানোর অবিরাম অপবাদ যাকে সইতে হয়, সেই ইয়ন মরগ্যানের হাত দিয়েই হয়তো লেখা হতে যাচ্ছে ইংলিশ ক্রিকেটের নতুন ম্যাগনাকার্টা।

morgan

অথচ এই আইরিশম্যান নিজে অধিনায়কত্ব কেন, আবারো ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে তোলার কথাই ভাবতে পারেননি। ভাবতে পারেননি, গত বিশ্বকাপে শূন্য রানে রুবেলের বলে সাকিবকে ক্যাচ দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল আশা শেষ করে দেওয়ার পরও তার ওপর আস্থা রাখা হবে।

কিন্তু মরগ্যানের ওপরই আস্থা রেখেছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড। রেখেছে, কারণ তার নীল চোখের তারায় সেদিন ছিল অপরাধবোধ এবং ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সুযোগ পাওয়ার আকুতি।

আর ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ওই নিদারুণ আঘাতে মরগ্যান অ্যাডিলেডের ড্রেসিংরুম থেকেই বুঝেছিলেন ইংলিশ ওয়ানডে ক্রিকেটের আগাপাশতলা বদলাতে হবে। খেলতে হবে অন্যস্তরের ক্রিকেট। যেখানে ফল কেন্দ্রিক চিন্তার বদলে প্রক্রিয়াটাই গুরুত্ব পাবে বেশি। হার–জিত পরের কথা, খেলার ধরনটাই যেখানে আসল। নতুন এই ব্র্যান্ডের ক্রিকেট আজ যদি ইংল্যান্ডকে শিরোপা দেয়, তাতে বাংলাদেশেরও একটু অবদান থাকবে। অবদান ওই আঘাতের, যে আঘাতে তাদের রূপান্তর।

morgan

কী আশ্চর্য! রূপান্তরের অনুঘটক এই আইরিশম্যানের দাদার বাবা ইংল্যান্ড থেকে ক্রিকেট খেলাটা মরগ্যান পরিবারে আমদানি না করলে নিয়তি তাকে ক্রিকেটারই হতে দিত না। কারণ আয়ারল্যান্ডে ক্রিকেট তখন নিতান্তই অচ্ছুৎ এক ইংলিশ খেলা।

সেটি আইরিশরা কেন খেলবে? আইরিশদের খেলা হলো গেলিক ফুটবল ও হার্লিং। মরগ্যান পরিবারে জন্ম না হলে ইয়ন শৌখিন এই দুটি খেলার কোনোটিতে গিয়ে ভিড়তেন। পেশাদার ক্রীড়াজগত তার নাম জানত না। পড়ে থাকতেন কোন অপরিচিতির অন্ধকারে।

বাবার কাছেই তার প্রকৃত ঋণ। পারিবারিক ক্রিকেট ডিএনএর নিকটতম যোগসূত্র বাবা জোডি মরগ্যান। ডাবলিনের এক স্কুলের গ্রাউন্ডসম্যান তার বাবা ক্রিকেটের এমনই পোকা ছিলেন যে ছয় সন্তানের একজনের জন্মের সময় স্ত্রীর পাশেই থাকতে পারেননি। তখন যে মালাহাইডে তার ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল! বাবার পথ ধরে মরগ্যানরা ছয় ভাইবোনই হয়েছেন ক্রিকেটার, তিন ভাই এবং দুই বোন খেলেছেন আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলে। একজন আয়ারল্যান্ড ছাড়িয়ে আজ ইংল্যান্ডেরই স্বপ্ন–সারথি।

মরগ্যান যেমন চুপচাপ আর নিজেতেই মগ্ন স্বভাবের, তাতে খেলার জগতে না এলে নির্ঘাত কবি–সাহিত্যিক হতেন। আয়ারল্যান্ড তো আর কম কবি–সাহিত্যিকের জন্ম দেয়নি।

আয়ারল্যান্ডের কথা ভাবলেই আমার মনে ভিড় করেন জোনাথন সুইফট, স্যামুয়েল বেকেট, ডব্লিউ বি ইয়েটস, বার্নার্ড শ, অস্কার ওয়াইল্ড, জেমস জয়েস প্রমুখ কালজয়ী কবি, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপনাস্যিকেরা যাদের অকৃপণ অবদানে ধন্য ইংরেজি সাহিত্য। আর এই মুহূর্তে আরেকজন আইরিশ ইংলিশ ক্রীড়াঙ্গনকে এনে দাঁড় করিয়েছেন অভূতপূর্ব এক গৌরবের উপত্যকায়।

আয়ারল্যান্ডের কথা ভাবলেই আপনার হয়তো মন টানবে আইরিশ কফি। পাবের বড় মগে ধোঁয়া ওঠা কফির সুঘ্রাণ, ওপরে সাদা ক্রিমের ফেনা, ভেতরে কালো কফিতে ক’ফোঁটা হুইস্কির মিশেল।

এই মুহূর্তে যখন কবি শ্রীজাতর কবিতা ‘কফির নামটি আইরিশ’ পড়ছি, নাকে এসে লাগছে যেন আইরিশ কফির ঘ্রাণ, ‘কী ঠান্ডা, কী ঠান্ডা.. তুমি আমার কাছে এসো, বর্ষা–শীতের এই দুপুরে, ফুটন্ত এসপ্রেসো।’

ওদিকে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি আইরিশ কফির বাদামি আর তপ্ত ফেনায় উপচে উঠছে যত ইংলিশ হৃদয়–কিনার। ক্রিকেটের পূণ্যতীর্থে তাদের হাতে উঠতে যাওয়া (আসলে উঠতে চাওয়া) কাপের নামটি আসলে আইরিশ!

আইএইচএস/

আপনার মতামত লিখুন :