এল ক্ল্যাসিকো ‘মহারণ’ শনিবার

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩৬ পিএম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭

এল ক্ল্যাসিকো। শব্দ দুটির মধ্যেই কেন যেন লুকিয়ে রণ ধ্বনি। শব্দ দুটির উচ্চারণেই বেঝে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বিশ্বের একক কোনো ম্যাচ এতটা আকর্ষণ, এতটা আগ্রহ নিয়ে কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর কাছে কখনও হাজির হতে পেরেছে কি না সন্দেহ, যেটা পেরেছে এল ক্ল্যাসিকো। স্পেনের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা মুখোমুখি হওয়া মানেই ‘এল ক্ল্যাসিকো’। যুদ্ধের আবহ তো এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে সব সময়ই বিরাজমান।

এল ক্ল্যাসিকো শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচের নামই নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে শত বর্ষের স্প্যানিশ ইতিহাস। বিশেষ করে স্প্যানিশ এবং কাতালোনিয়া- এই দুটি জাতি-গোষ্ঠির বিরোধের ইতিহাস। ১৯২৯ সাল থেকে এল ক্ল্যাসিকোর সূচনা হলেও ১৯৩০ সালে যখন কাতালোনিয়া নিজেদের জাতীয়তা ‘কাতালান’ পরিচয়ে পরিচিতি নিতে শুরু করে, তখন থেকেই রিয়াল-বার্সার মুখোমুখি হওয়াটা হয়ে ওঠে পুরোপুরি রাজনৈতিক।

একদিকে রিয়াল মাদ্রিদ হচ্ছে স্প্যানিশ রাজন্যবর্গ এবং শাসকদের প্রতিনিধিত্বকারী। মূলতঃ নামটা হচ্ছে ‘রয়্যাল মাদ্রিদ’। সেখান থেকেই ফুটবল ক্লাব হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের নামকরণ। অন্যদিকে কাতালোনিয়ার শোসিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় বার্সেলোনা। স্পেনের দুটি বৃহৎ শহর মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার মর্যাদার লড়াইও বটে এই ‘এল ক্ল্যাসিকো’। ক্ল্যাসিকোর গায়ে যে তকমাই থাকুক না কেন, সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের সামনে ক্ল্যাসিকো মানেই তো ধুন্দুমার এক ফুটবল লড়াই!

মূলতঃ স্প্যানিশ লা লিগায় প্রতি বছর দু’বার রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা মুখোমুখি হবেই। লা লিগার ইতিহাসে এই দুটি ক্লাবের সঙ্গে আরেকটি ক্লাব রয়েছে যারা কখনও রেলিগেশনের খাঁড়ায় পড়েনি। বাকি ক্লাবটি অ্যাথলেটিক বিলবাও। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে প্রতি বছর দুটি এল ক্লাসিকো নির্ধারিত। এছাড়া বিভিন্ন কারণে এল ক্ল্যাসিকোর সংখ্যা বাড়তে পারে। যেমন কোপা ডেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা কোনো প্রীতি ম্যাচ- ফুটবল প্রেমীরা আরও বেশি ক্ল্যাসিকো দেখার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে।

চলতি মৌসুমেই যেমন লা লিগার বাইরে আরও তিনটি এল ক্ল্যাসিকো বোনাস হিসেবে পেয়ে গেছে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। মৌসুম শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন্স কাপে একবার মুখোমুখি হয়েছিল বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ। ওই ম্যাচে খেলেননি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আবার ওই ম্যাচেই (এখনও পর্যন্ত) শেষ এল ক্ল্যাসিকো খেলে ফেলেছেন নেইমার।

এরপর স্প্যানিশ সুপার কাপে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেনের সেরা এই দুই ক্লাব। লা লিগা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ এবং কোপা ডেল রে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বার্সেলোনা। ওই দুই ম্যাচে রিয়ালের সামনে দাঁড়াতে পারেনি বার্সা। চির প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে শিরোপা জিতে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং কোপা ডেল রে তো এখনও বাকি। এই দুই টুর্নামেন্টের যে কোনো পর্যায়ে মুখোমুখি হয়ে যেতে পারে দুই সেরা দল। তাতে এল ক্ল্যাসিকোর সংখ্যা বাড়তে পারে আরও।

তবে লা লিগা মৌসুমের প্রথম এল ক্ল্যাসিকো একেবারে দরজায় উপস্থিত। যে ম্যাচ নিয়ে আকর্ষণ আর আগ্রহের বিন্দুমাত্র কমতি নেই ফুটবলামোদীদের। এবারের এই এল ক্ল্যাসিকো নিয়ে ভিন্নমাত্রার আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সবার মধ্যেই। এর অন্যতম কারণ, ক্রিসমাসের ঠিক আগেই এল ক্ল্যাসিকো বাড়তি আনন্দ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সবার সামনে। ক্রিসমাসের আগে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে তো বড় আনন্দ আর হতে পারে না।

শুধু ক্রিসমাস ডের জন্যই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এল ক্ল্যাসিকো ভিন্ন মাত্রা ছড়ায় দুই দলে দুই বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতির কারণে। এবার সেটার আকর্ষণ বেড়েছে আরও। কারণ, মেসিকে হারিয়ে ফিফা বর্ষসেরা এবং ব্যালন ডি’অর জিতেছেন রোনালদো। একই সঙ্গে মেসির সমতায়ও চলে এসেছেন তিনি। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট জয়ে রোনালদোকে ছুঁয়ে ফেলেছেন মেসি। দু’জনের রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় কিন্তু এবার এগিয়ে বার্সেলোনাই।

লা লিগার পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। ১৬ ম্যাচে বার্সার পয়েন্ট ৪২। অন্যদিকে ১৫ ম্যাচে রিয়ালের পয়েন্ট ৩১। অবস্থান বার্সা শীর্ষে, রিয়াল মাদ্রিদ ৪ নম্বরে। এক ম্যাচ কম খেললেও দু’দলের পয়েন্টের ব্যবধান ১১। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়, এই ম্যাচ জিতলো রিয়াল মাদ্রিদ। তাতেও ব্যবধান কমে দাঁড়াবে ৮ পয়েন্টের।

সুতরাং, বলাই যায় এবারের লা লিগার শিরোপা জয় বার্সার জন্য শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। রিয়ালের দৌড়াতে হবে এখন শুধু চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই। এমনই এক পরিস্থিতিতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বের সেরা এই দুই দল। বাংলাদেশ সময় শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হবে ম্যাচটি। মাদ্রিদের স্থানীয় সময় দুপুর একটা।

লা লিগা কর্তৃপক্ষ চিন্তা করে দেখেছে, এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের যে বাজার এবং যে জনপ্রিয়তা, তাতে ম্যাচটি এমন এক সময়ে আয়োজন করা উচিৎ যখন ম্যাচটা সবাই দেখতে পারে। এ কারণেই মূলতঃ স্পেনের স্থানীয় সময় ভর দুপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের এল ক্ল্যাসিকো।

ক্ল্যাসিকোর আগে রিয়াল মাদ্রিদ পুরোপুরি ফিট। রোনালদোকে নিয়ে একটু সংশয় থাকলেও তিনি অনুশীলনে ফিরেছেন। দানি কারভাহলও ফিরে এসেছেন ইনজুরি থেকে। সুতরাং, পূর্ণ শক্তির দলই এল ক্ল্যাসিকোতে হাতে পাচ্ছেন জিনেদিন জিদান। অন্যদিকে বার্সা দীর্ঘদিনের মত এই ম্যাচেও ওসমান ডেমবেলেকে পাচ্ছে না। ইনজুরির কারণে নেই স্যামুয়েল উমতিতি। এছাড়া মেসি, ইনিয়েস্তা সবাইকে পাচ্ছেন আর্নেস্তো ভালভার্দে। থামস ভার্মালিন খেলতে পারেন সেন্টার ব্যাকে। একই পজিশনে থাকতে পারেন হ্যভিয়ের ম্যাচেরানোও।

আইএইচএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :