ক্রিকেট-ফুটবলের বাইরে অন্য এক ঢাকা: আড়ালে থাকা স্টেডিয়াম ও মাঠের গল্প

সৌরভ কুমার দাস
সৌরভ কুমার দাস সৌরভ কুমার দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৫ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মিরপুরের গ্যালারিতে চার-ছক্কার গর্জন কিংবা ঢাকা স্টেডিয়ামে ফুটবলের টানটান উত্তেজনা-ঢাকার ক্রীড়াচিত্র বলতে আমাদের চোখে সাধারণত এই দৃশ্যগুলোই ভেসে ওঠে। কিন্তু ঢাকার ব্যস্ত রাজপথের পাশেই আছে বেসবল খেলার মাঠ, আন্তর্জাতিক মানের রোলার স্কেটিং ট্র্যাক কিংবা নিভৃতে পদক জয়ের প্রস্তুতি নেওয়া শুটিং রেঞ্জ। ক্রিকেট ও ফুটবলের তুমুল জনপ্রিয়তার আড়ালে ঢাকা শহরের বুকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য বিশেষায়িত স্টেডিয়াম, যেগুলোর গল্প অনেকেরই অজানা।

ঐতিহ্যের তিন স্তম্ভ: ঢাকা, শেরেবাংলা ও ভাসানী স্টেডিয়াম
ঢাকার ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাক্ষী ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম। ১৯৫৪ সালে নির্মিত এই মাঠেই ১৯৫৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এক সময় দেশের প্রধান ক্রিকেট ও ফুটবল ভেন্যু হলেও ২০০৫ সাল থেকে এটি ফুটবলের জন্য স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, মিরপুর-২ এ অবস্থিত শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘হোম অব ক্রিকেট’ নামে পরিচিত। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই মাঠের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা। এছাড়া হকির জন্য রয়েছে গুলিস্তানের মাওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম। মজলুম জননেতা ভাসানীর নামে নামাঙ্কিত এই মাঠটি দেশের হকির প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আশির দশকেই প্রথম কৃত্রিম ঘাস বা অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপন করা হয়।

পেশাদার ফুটবলের বিকল্প ভেন্যু ও ইনডোর গেমস ঢাকার ফুটবলের চাপ কমাতে এবং নারী ফুটবল ও বয়সভিত্তিক দলের জন্য তৈরি করা হয়েছে কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম। কৃত্রিম টার্ফে ঢাকা এই মাঠে নিয়মিত ঘরোয়া লিগের খেলা হয়। ইনডোর গেমসের জন্য মিরপুর-১০ এর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়াম এক অনন্য নাম। ১৯৮৬ সালে চীনের সহযোগিতায় নির্মিত এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামে বাস্কেটবল থেকে শুরু করে ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ও কারাতে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পল্টনের শহীদ ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী হ্যান্ডবল স্টেডিয়াম দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হ্যান্ডবল ভেন্যু হিসেবে পরিচিত।

সাঁতার, টেনিস ও শুটিংয়ের ঠিকানা
পানির খেলার জন্য মিরপুরে রয়েছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্স, যেখানে অলিম্পিক সাইজ পুল ও ডাইভিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা স্টেডিয়ামের ভেতরেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ব্রজেন দাস সুইমিং পুল। টেনিসপ্রেমীদের জন্য রমনার জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্স একমাত্র ভরসা, যেখানে অনেকগুলো কোর্টে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হয়। যারা লক্ষ্যভেদে বিশ্বাসী, তাদের জন্য গুলশান-১ এ রয়েছে জাতীয় শুটিং কমপ্লেক্স। দেশের শুটাররা অলিম্পিক বা কমনওয়েলথের জন্য এই নিরাপদ ও বিশেষায়িত রেঞ্জেই নিজেদের ঝালিয়ে নেন।

স্কেটিং, বেসবল ও মাঠের আধুনিকায়ন
পল্টনে অবস্থিত জাতীয় রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স এই অঞ্চলের অন্যতম আধুনিক ট্র্যাক, যেখানে রোলার স্কেটিং ও রোলবল খেলা হয়। খুব বেশি পরিচিত না হলেও পল্টন ময়দানের একটি অংশে রয়েছে জাতীয় কুইকবল ও বেসবল গ্রাউন্ড, যেখানে নিয়মিত বেসবল চর্চা চলে। এছাড়া পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠকে আধুনিকায়ন করে নাম দেওয়া হয়েছে শেখ রাসেল স্টেডিয়াম, যা স্থানীয় ক্রিকেট ও ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র। বনানীতে অবস্থিত বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম তার সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য পরিচিত, যেখানে খেলাধুলার পাশাপাশি বড় বড় কনসার্টও অনুষ্ঠিত হয়।

অগোচরে থাকা অ্যাথলেটদের আঁতুড়ঘর প্রচারের আলো থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে পল্টনের জাতীয় উশু ও জিমন্যাস্টিকস সেন্টার। জুডো, কারাতে আর জিমন্যাস্টিকসের মতো কঠিন খেলায় যারা দেশের হয়ে পদক আনেন, তাদের দিন কাটে এই সেন্টারের ম্যাটেই। ঢাকার এই বহুমুখী ক্রীড়া পরিকাঠামো প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও প্রচারণা পেলে শুধু ক্রিকেট-ফুটবল নয়; সব খেলাতেই বাংলাদেশ সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

এসকেডি/এমএমআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।