দিনে ১০০ বারের বেশি আপনার ফোনের ডাটা ট্র্যাক হচ্ছে

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩৭ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
দিনে শতবারের বেশি আপনার ফোনের ডাটা ট্র্যাক করা হচ্ছে

আজকের দিনে আমরা যতটা শারীরিকভাবে সচেতন, ডিজিটালভাবে ততটা সচেতন থাকি না। অথচ, একদিনে আমাদের প্রতিটি ডিজিটাল পদক্ষেপে আমাদের তথ্য ট্র্যাক করা হয়। আপনার ফোন, অ্যাপ, ব্রাউজার, সোশ্যাল মিডিয়া সবকিছুই আমাদের কার্যকলাপ নজরে রাখে।

আপনার প্রতিটি ক্লিক, সোয়াইপ বা সার্চের মাধ্যমে আমরা একটি ডিজিটাল ট্রেল রেখে যাই। এই ডেটা প্রায়শই বিশ্লেষণ করা হয়, ট্র্যাক করা হয় এবং অনেক সময় বিক্রি করা হয় অবচেতনভাবেই। কে আপনার ডাটা ট্র্যাক করছে?

আপনি হয়তো মনে করেন, শুধু আপনার ফোন বা অ্যাপগুলো আপনার তথ্য জানে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বড় টেক কোম্পানি, বিজ্ঞাপনদাতা, ডাটা ব্রোকার এবং সরকার আপনার অনলাইন কর্মকাণ্ড নজর রাখে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটে ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার হয়, যার অনেকগুলো তৃতীয় পক্ষের।

কোথায় ডাটা সংগ্রহ হচ্ছে?
১. সোশ্যাল মিডিয়া: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক আপনার লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, স্টোরি ভিউ সব কিছু ট্র্যাক করে। এই ডাটা ব্যবহার করে তারা কাস্টমাইজড বিজ্ঞাপন দেখায় এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয়।

২. সার্চ ইঞ্জিন: গুগল দিনে ৮.৫ বিলিয়ন সার্চ প্রসেস করে। লোকেশন, সার্চ ইতিহাস এবং ওয়েবসাইট ভিজিট ট্র্যাক করা হয়।

৩. অ্যাপ ও ওয়েবসাইট: অনেক অ্যাপ ব্যবহারকারীর অবস্থান, ব্রাউজিং হিস্ট্রি এবং ডিভাইসের আইডি ট্র্যাক করে। পিউ রিসার্স ২০১৯ অনুযায়ী, ৭২ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন তারা ক্রমাগত ট্র্যাক হচ্ছেন।

৪. সরকারি নজরদারি: অনেক সরকার অনলাইনে পর্যবেক্ষণ চালায়। প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনাল অনুসারে অন্তত ৮৯টি দেশ ইন্টারনেট নজরদারি করে।

মূলত ডাটার মাধ্যমে তৈরি বিজ্ঞাপন আপনার ক্রয় আচরণ প্রভাবিত করে। আপনার রাজনৈতিক মত, খরচের অভ্যাস, শখ এবং এমনকি আবেগও বিশ্লেষণ করা হয়। তবে ডাটা লঙ্ঘন ও পরিচয় চুরি একটি বড় সমস্যা। ২০২২ সালে ১.৪ বিলিয়ন রেকর্ড লঙ্ঘন হয়েছিল। পরিচয় চুরি বা আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। একবার ডাটা ছড়িয়ে গেলে তা ফেরানো কঠিন। অনেক কোম্পানি আপনার অনুমতি ছাড়া ডাটা বিক্রি বা ভাগ করতে পারে।

ডাটা কীভাবে সংগ্রহ হয়?

১. কুকিজ: ওয়েবসাইটে আপনার আচরণ ট্র্যাক করে। তৃতীয় পক্ষের কুকিজ বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার হয়।
২. লোকেশন ট্র্যাকিং: অনেক অ্যাপ আপনার অবস্থান সংগ্রহ করে, এমনকি যখন প্রয়োজনও হয় না।
৩. ডিভাইস ফিঙ্গারপ্রিন্টিং: ব্রাউজার, OS, স্ক্রিন রেজোলিউশন দিয়ে ডিভাইস শনাক্ত করা হয়।
৪. সার্চ ও ক্রয় হিস্ট্রি: আপনার সার্চ ও কেনাকাটার তথ্য ব্যবহার করে আপনার প্রোফাইল তৈরি হয়।

আসুন জেনে নেই ২৪ ঘণ্টায় কখন কে আপনার ডাটা ট্র্যাক করে

সকাল ৬-৮টা: ফোন আনলক এবং প্রথম ব্যবহার
সকাল শুরু হতেই আমাদের ফোন আমাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। ফোন আনলক করা মাত্র লোকেশন, সময়, নোটিফিকেশন ডাটা ট্র্যাক করা হয়। গুগল বা অ্যাপল আপনার ফোনের অবস্থান ও ডিভাইস ব্যবহার প্যাটার্ন যাচাই করে। যদি ডুয়াল সিম বা ওয়েলনেস অ্যাপ চালু থাকে, সে তথ্যও লগ হয়। চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে শুধু ফোন আনলক করলেই সাধারণত ৩-৫টি অ্যাপের মাধ্যমে ডাটা ট্র্যাক হয়।

সকাল ৮-১০টা: সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল
ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক সব সময়ই আমাদের কর্মকাণ্ড মনিটর করে। কে কোন পোস্টে লাইক দিল, কোন স্টোরি দেখল সব তথ্য রেকর্ড হয়। অ্যাড পার্সোনালাইজেশনের জন্য ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়। কনভারসেশন, মেসেজের ফ্রিকোয়েন্সি ও টাইমস্ট্যাম্পও লগ করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে ১০ মিনিটের স্ক্রলেই প্রায় ২০-৩০ ডাটা পয়েন্ট তৈরি হয়।

সকাল ১১-১টা: কাজ ও ব্রাউজিং
এই সময়টা সাধারণত সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই সময়টাতে গুগল সার্চ, ইউটিউব বা অন্যান্য ব্রাউজিং অ্যাপগুলো আপনার সার্চ হিস্ট্রি, ভিডিও দেখা, ক্লিক করা লিঙ্ক সংগ্রহ করে। কুকিজ ও থার্ড-পার্টি ট্র্যাকারস ঠিক এই সময়টাতে আপনার আগ্রহের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা অফিসে ব্যবহার করা মেসেজিং ও প্রজেক্ট টুলের ডাটা ব্যাকএন্ডে সংরক্ষিত হয়। এই সময় এক ঘণ্টার ব্রাউজিংয়ে সাধারণত ৫০-৬০টি ডাটা ট্র্যাকিং ইভেন্ট হয়।

দুপুর ২-৪টা: লোকেশন এবং লাইফস্টাইল অ্যাপ
ভাতঘুমের এই সময়টায় ম্যাপস, ডেলিভারি বা রাইড-হাইলিং অ্যাপ আপনার রুট, সময়, দূরত্ব ট্র্যাক করে। হেলথ/ফিটনেস অ্যাপের মাধ্যমে আপনার হাঁটা, ক্যালরি, হার্ট রেট সব কিছু লগ হয়। কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে, তাই ব্যবহার না করলেও ডাটা আপডেট হয়। প্রতিটি লোকেশন চেক বা রাউট আপডেট একটি আলাদা ডাটা পয়েন্ট হিসেবে গণ্য হয়।

বিকেল ৫-৭টা: শপিং এবং স্ট্রিমিং
এই সময় অনলাইন শপিং অ্যাপস যেমন-অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট আপনার ব্রাউজ করা প্রোডাক্ট, কার্টে রাখা আইটেম, সার্চ হিস্ট্রি ধরে রাখে। নেটফ্লিক্স, স্পোটিফাই, ইউটিউব-কতক্ষণ দেখলেন বা শুনলেন, কোন জনরা বেশি পছন্দ হলো, সব তথ্য লগ হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে এক ঘণ্টা কনটেন্ট দেখলেই ২০-৩০টি ডাটা পয়েন্ট তৈরি হয়।

রাত ৮ ১০টা: চ্যাট এবং ভয়েস সার্চ
হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোটস, গুগল ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, সিরি বা অ্যালেক্স আপনার কথোপকথন বা কমান্ড ট্র্যাক করা হয়। এআই ফিচারের জন্য কথোপকথনের কিছু ডাটা সংরক্ষিত হতে পারে। প্রাইভেসি সেটিং না থাকলে, ডাটা ব্যবহৃত হতে পারে বিজ্ঞাপন বা পার্সোনালাইজেশনের জন্য। শুধু ভয়েস কমান্ড নয়, প্রতিটি ট্যাপ বা স্বয়ংক্রিয় সাজেশনও লগ হয়।

রাত ১১-১টা: ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ ও স্লিপ মোড
ওয়েদার, হেলথ, লোকেশন সার্ভিসেস রাতেও ডাটা আপডেট হয়। অনেক অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলার কারণে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকে। পুশ নোটিফিকেশনস ও অ্যাপ অ্যানালিটিকস এই সময়েও চলতে থাকে। রাতের ব্যাকগ্রাউন্ড ডাটা সাধারণত সকালের তুলনায় কম, কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ নয়।

সংক্ষেপে বলা যায়, একজন ব্যবহারকারীর ডিভাইস প্রতিদিন শতাধিক, সম্ভবত কয়েকশোবার তার তথ্য ট্র্যাক করছে। লোকেশন চেক: ৩০-৫০ বার, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল: ২০-৩০ বার প্রতি ১০ মিনিট, ব্রাউজিং/শপিং: ৫০-৬০ বার, ভয়েস/এআই কমান্ডস: ১০-২০ বার। মোটামুটি সাধারণ দিনে শতাধিক ডাটা পয়েন্ট সংগ্রহ হচ্ছে আপনার ব্যবহার অনুসারে।

যেভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন

১. প্রাইভেসি সেটিংস ঠিক করুন: সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস নিয়মিত চেক করুন।
২. এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করুন: সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো নিরাপদ মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করুন।
৩. প্রাইভেসি টুল ব্যবহার করুন: প্রাইভেসি বাডজার, ইউব্লক অরিজিন বা ব্রেভ/ফায়ারফক্স ব্রাউজার ব্যবহার করুন।
৪. লোকেশন ট্র্যাকিং বন্ধ করুন: প্রয়োজন ছাড়া লোকেশন সেবা বন্ধ রাখুন।
৫. ভিপিএন ব্যবহার করুন: ভিপিএন ইন্টারনেট ট্রাফিক এনক্রিপ্ট করে আইপি লুকায়।
৬. অ্যাপ ও পারমিশন বেছে নিন: কেবল বিশ্বস্ত অ্যাপ ব্যবহার করুন এবং পারমিশন নিয়মিত চেক করুন।
৭. কুকিজ ও ব্রাউজিং ডেটা মুছে দিন: ইঙ্কগনিটো মোডে ব্রাউজ করুন, তবে লক্ষ্য রাখুন এটি সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয় না।

আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়া নজর রাখছে আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও
সত্যিই কি ভবিষ্যতে ফোন-কম্পিউটার থাকবে না?

সূত্র: লিংকডইন, টেকক্রাঞ্চ

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।