আপনার ক্রিয়েটিভি নষ্ট করছে এআই
একসময় নতুন কিছু ভাবতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথা খাটাতে হতো। একটি কবিতার লাইন, একটি গল্পের প্লট, কিংবা একটি ডিজাইনের ধারণা তৈরি করতে দরকার হতো কল্পনা, অভিজ্ঞতা আর গভীর চিন্তা। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মুহূর্তের মধ্যে লিখে দিচ্ছে গল্প, বানিয়ে দিচ্ছে ছবি, তৈরি করছে গান, এমনকি ভিডিও।
প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতি যেমন মানুষের কাজ সহজ করেছে, তেমনি একটি প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে এআই কি ধীরে ধীরে মানুষের সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে?
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ডিজাইনার, লেখক কিংবা অফিসকর্মী-অনেকেই প্রতিদিন বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করছেন। কোনো লেখা লিখতে না পারলে এআইকে বলা হচ্ছে, ‘একটা আর্টিকেল লিখে দাও।’ নতুন ডিজাইনের আইডিয়া না এলে বলা হচ্ছে, ‘একটা পোস্টার বানিয়ে দাও।’ ফলে ধীরে ধীরে মানুষ নিজের মস্তিষ্ককে কম ব্যবহার করছে, আর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে প্রযুক্তির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৃজনশীলতা মূলত মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতা। কিন্তু যখন কোনো মানুষ নিজে চিন্তা না করে সবকিছুর জন্য এআইয়ের সাহায্য নেয়, তখন তার মস্তিষ্কের সেই স্বাভাবিক চর্চা কমে যেতে শুরু করে। ঠিক যেমন দীর্ঘদিন ক্যালকুলেটর ব্যবহার করলে অনেকেই সহজ হিসাবও মুখে করতে ভুলে যায়, তেমনি অতিরিক্ত এআই ব্যবহার মানুষের চিন্তাশক্তিকেও অলস করে দিতে পারে।
বিশেষ করে লেখালেখির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আগে একজন লেখক একটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণা করতেন, তথ্য সংগ্রহ করতেন, তারপর নিজের ভাষায় একটি লেখা তৈরি করতেন। এখন অনেকে কয়েক সেকেন্ডে এআই দিয়ে পুরো লেখা তৈরি করে ফেলছেন। এতে সময় বাঁচলেও ব্যক্তিগত চিন্তা, ভাষার স্বকীয়তা এবং আবেগ অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে গ্রাফিক ডিজাইন, সংগীত এবং ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রেও।
তবে এর মানে এই নয় যে এআই পুরোপুরি খারাপ। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি মানুষের সৃজনশীলতার সহকারী হিসেবেও কাজ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন লেখক এআই ব্যবহার করে নতুন আইডিয়া নিতে পারেন, একজন ডিজাইনার রঙের কম্বিনেশন বুঝতে পারেন, কিংবা একজন শিক্ষার্থী কঠিন কোনো বিষয় সহজভাবে শিখতে পারেন। অর্থাৎ এআই তখনই উপকারী, যখন এটি মানুষের চিন্তার বিকল্প না হয়ে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মানুষ নিজে চিন্তা করার আগেই এআইয়ের কাছে সমাধান খুঁজতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এতে মানুষের কল্পনাশক্তি কমে যায়। নতুন কিছু তৈরির বদলে মানুষ ‘রেডিমেড চিন্তা’ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘ক্রিয়েটিভ ডিপেন্ডেন্সি’ বলছেন অর্থাৎ সৃজনশীলতার জন্য প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া।
শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়েই মানুষের কল্পনাশক্তি সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। যদি তারা সবসময় এআইয়ের তৈরি উত্তর, ছবি বা গল্পের ওপর নির্ভর করে, তাহলে নিজেরা নতুনভাবে ভাবার অভ্যাস হারিয়ে ফেলতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে মৌলিক চিন্তা ও উদ্ভাবনের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরাও বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক যত বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তত বেশি সক্রিয় থাকে। নতুন কিছু লেখার চেষ্টা, কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজা বা কল্পনা থেকে কিছু তৈরি করার মধ্য দিয়েই মস্তিষ্কের সৃজনশীল অংশ শক্তিশালী হয়। কিন্তু সবকিছু যদি প্রযুক্তি করে দেয়, তাহলে সেই মানসিক অনুশীলন কমে যেতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভরই হবে। তাই প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার। এআইকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে এটি মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রতিস্থাপন না করে বরং আরও সমৃদ্ধ করে।
দিনের শেষে সৃজনশীলতার আসল শক্তি এখনো মানুষের মধ্যেই। কারণ একটি যন্ত্র তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো অনুভব করতে পারে না। একটি এআই হয়তো হাজার গল্প লিখতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা, আবেগ, স্মৃতি এবং কল্পনার গভীরতা কখনো পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।
তাই প্রশ্নটা হয়তো এআই কি ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট করছে? এখানেই শেষ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজের চিন্তাশক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি ধীরে ধীরে সেটিকে প্রযুক্তির হাতে তুলে দিচ্ছি?
কেএসকে