দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রাম নগরীর ফলমন্ডি রেলওয়ে মেনস মার্কেটে নানা জাতের খেজুর, ছবি: জাগো নিউজ

আন্দামান সাগরে খেজুরভর্তি কনটেইনারসহ জাহাজডুবি
গত বছরের তুলনায় কম বেশিরভাগ খেজুরের দাম

বাজারে মানভেদে কেজিপ্রতি ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দামের খেজুর রয়েছে। ৫০টির বেশি জাত ও মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর ফলমন্ডি রেলওয়ে মেনস মার্কেটের ফলের পাইকারি বাজারে। এর মধ্যে ‘কম দামি’ খ্যাত জাহেদি জাতের খেজুরের দাম বেশি বেড়েছে।

১৫ দিন আগে ১০ কেজি প্যাকেটের ‘জাহেদি’ খেজুর বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। বর্তমানে একই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যান্য খেজুরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দাম হওয়ায় জাহেদি খেজুরকে ‘কম দামি’ খেজুর বলা হয়। নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের লোকজন এসব খেজুরের ভোক্তা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, থাইল্যান্ডে সাগরে ডুবে যাওয়া জাহাজে খেজুরও ছিল। এসব খেজুরভর্তি কনটেইনার সাগরে ডুবে গেছে। যার বেশিরভাগই কম দামি খেজুর। তবে বাজারে অন্য সব ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কম। বাজারে সরবরাহও স্বাভাবিক।

দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

গত ৭ ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডের ফুকেটের অদূরে আন্দামান সাগরে কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘এমভি সিলয়েড আর্ক’ ডুবে যায়। জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসছিল।

চট্টগ্রামের খেজুর ব্যবসায়ীদের দাবি, এমভি সিলয়েড আর্ক জাহাজটিতে প্রায় দেড়শ কনটেইনার খেজুর ছিল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, মিশর, জর্ডান, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত এবং চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে খেজুর আমদানি হয়। আবার স্বল্প পরিমাণে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া থেকে খেজুর আনেন সৌখিন ব্যক্তিরা।

আরও পড়ুন
রোজায় সারাবিশ্বে মূল্যহ্রাস চলে, আর বাংলাদেশে?
রোজার ছুটির জটিলতা কাটেনি, ‘আপাতত’ খোলা থাকছে স্কুল
৪৫০ ট্রাকে মিলবে টিসিবির পণ্য, ছোলা ৬০ ও খেজুর বিক্রি হবে ১৬০ টাকায়
রমজানে শেয়ারবাজারে লেনদেন ১০টা থেকে ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত

এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ফ্রেশ খেজুর আমদানি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৪ টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ২৮ টন। যা গত বছরের তুলনায় এবার ৭ হাজার ৫৫৬ টন বেশি আমদানি হয়েছে। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত এক মাসে ফ্রেশ খেজুর আমদানি হয়েছে ২৫ হাজার ৭৪৪ টন।

‘আমাদের মাদরাসার এতিমখানার জন্য খেজুর কিনতে এসেছি। রোজায় অনেক খেজুরের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাজারের চেয়ে এখানে অনেক সাশ্রয়ী দামে খেজুর কেনা যায়।’

খেজুরের জন্য বিখ্যাত চট্টগ্রামের ফলমন্ডি রেলওয়ে মেনস মার্কেট ফল বাজার। এখানে পাইকারি ও খুচরা দুইভাবেই খেজুর বিক্রি হয়। এ মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী খেজুর সরাসরি আমদানি করেন। অনেকে আমদানিকারকের কাছ থেকে নিয়ে দোকানে বিক্রি করেন। দেশের দূরদূরান্তের জেলা থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও আমদানিকারকদের কাছ থেকে খেজুর সংগ্রহ করেন।

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মার্কেটের ওপর থেকে নিচের সবগুলো দোকান খেজুরে সয়লাব। রমজান শুরু হবে, তাতে অনেকে বাসায় ইফতারে খাওয়ার জন্য খেজুর কিনতে এসেছেন ফলমন্ডিতে।

দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

হালিশহর এলাকার আশরাফ হোসেন ফলমন্ডিতে খেজুর কিনতে এসেছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খুচরা দোকানে ১ হাজার ২০০ টাকা, ১ হাজার ৫০০ টাকা ও ১ হাজার ৭০০ টাকা কেজিতে খেজুর বিক্রি হচ্ছে। যে খেজুর খুচরা দোকানে ১ হাজার ৭০০ টাকা, একই খেজুর ফলমন্ডিতে এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে কেনা যায়। তাই প্রতিবছর ফলমন্ডি থেকে খেজুর কিনে নিয়ে যাই।’

মাওলানা আলাউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি এসেছেন রাঙ্গুনিয়া থেকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদরাসার এতিমখানার জন্য খেজুর কিনতে এসেছি। রোজায় অনেক খেজুরের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাজারের চেয়ে এখানে অনেক সাশ্রয়ী দামে খেজুর কেনা যায়।’

ফলমন্ডির মায়েদা ফ্রুটস সরাসরি খেজুর আমদানি করে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব দোকানের মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা খেজুর বিক্রি করে।

বাজারে বিভিন্ন জাতের খেজুর রয়েছে। মাবরুম, মাশরুক, মরিয়ম, মেদজুল, সাফাবি, ভিআইপি মানের মাবরুম, মেদজুল খেজুরও রয়েছে। ২ কেজি, ৩ কেজি, ৫ কেজির প্যাকেটে খেজুর পাওয়া যায়। মানভেদে দাম ভিন্ন ভিন্ন

প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. জাহেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে প্রচুর খেজুর রয়েছে। আমদানিও ভালো হয়েছে। প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কম। তবে বস্তায় জাহেদি খেজুরের দাম বেড়েছে।’

দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

জাহেদ বলেন, ‘আন্দামানে ডুবে যাওয়া জাহাজে অনেক জাহেদি খেজুর ছিল। আটালো বস্তাভর্তি হওয়ায় বাজারে এনে দ্রুত বিক্রি করার জন্যে শেষ মুহূর্তে আমদানি করা হয়। কিন্তু রোজার আগে পিক টাইমে বাজারে না আসায় এসব খেজুরের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে ১৯০ টাকার জাহেদি খেজুর এখন ২৬০ টাকা। অর্থাৎ ১০ কেজি প্যাকেটে এসব খেজুরে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে বস্তায় আসা জাহেদি খেজুরের দাম ছিল কেজি ১৪৫ টাকা, এখন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

আরও পড়ুন
রোজায় সংকট ঠেকাতে থাইল্যান্ড থেকে আসবে ১ কোটি ৩৫ লাখ লিটার সয়াবিন
রোজায় দাম কমাতে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমালো সরকার
দেশের সব মসজিদে একই পদ্ধতিতে খতমে তারাবিহ পড়ার আহ্বান
রমজান মাস জুড়ে আদা-রসুন বাটা ভালো রাখার উপায়

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, বাজারে একই খেজুর কয়েক কোয়ালিটির হয়ে থাকে। কোয়ালিটিভেদে দাম কম বেশি হচ্ছে। আজোয়া, মরিয়ম, মসদুল, সাফাবি, সুফরি, মাসরুক, মাবরুর, জাহেদি, দাব্বাস, নাগাল, লুলু, সাইয়িদী, ফরিদী, রশিদী, কুদরী, মেদজুল, সুক্কারিসহ নানান জাতের ও নামের খেজুর রয়েছে।

ফলমন্ডির বাজারে সৌদি আরবের আজোয়া খেজুর ৫ কেজি প্যাকেটে ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকায়, মাশরুক ৩ কেজি প্যাকেটে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, মাবরুম ৫ কেজি প্যাকেটে ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা, ইরানি মরিয়ম ৫ কেজি প্যাকেটে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা, মিশরের মেদজুল ৫ কেজির প্যাকেটে ৭ হাজার ১০০ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা, দুবাইয়ের মেদজুল ৬ হাজার ৩০০ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

বাজারে সৌদির সাফাবি ভালো মানের বড় দানার খেজুর ৩ কেজি ২ হাজার ৩০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা ও অপেক্ষাকৃত ছোট দানার ৫ কেজি ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাফাবিকে কালমি খেজুরও বলে। অন্যদিকে সুক্কারি মুফাত্তল ৩ কেজি প্যাকেটে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা ও সুক্কারি রুতাব ৩ কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে পাইকারিতে নাগাল জাতের খেজুর ১০ কেজি প্যাকেটে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দাবাস ১০ কেজি প্যাকেজে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, লুলু ১০ কেজি ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে ইরাক থেকে আসা রিজিস ১০ কেজি ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রিজিস জাতের খেজুরকে অনেকে বরই খেজুরও বলে। আলজেরিয়ার ছড়া খেজুর ২ কেজি ৯৫০ টাকা ও ৫ কেজি ২ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন
রমজানে ব্যাংকের অফিস ও লেনদেন সূচিতে পরিবর্তন
ইফতারের দোয়া, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
রোজায় ৬৫০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করবে সরকার
রোজার নিয়ত, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

উমাইয়া এন্টারপ্রাইজের জালাল উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন জাতের খেজুর রয়েছে। মাবরুম, মাশরুক, মরিয়ম, মেদজুল, সাফাবি, ভিআইপি মানের মাবরুম, মেদজুল খেজুরও রয়েছে। ২ কেজি, ৩ কেজি, ৫ কেজির প্যাকেটে খেজুর পাওয়া যায়। মানভেদে দাম ভিন্ন ভিন্ন।’

তুহিন এন্টারপ্রাইজে মো. আরমান বলেন, ‘আমাদের প্রচুর খেজুর রয়েছে। পাইকারির পাশাপাশি খুচরাতেও বিক্রি করছি। আরব দেশগুলোতে রোজা শুরু হয়েছে। আমাদের এখানে অনেকে বাসায় খাওয়ার জন্য ফলমন্ডি থেকে খেজুর কিনে নিয়ে যান। আবার মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানায় খাওয়ার জন্য অনেকে বেশি পরিমাণে খেজুর কিনছেন। বাজারে খুচরা দামের চেয়ে ফলমন্ডিতে সাশ্রয়ে ভালো মানের খেজুর কিনতে পারে লোকজন। এতে বেচাকেনাও অনেক বেশি হচ্ছে।’

দাম বেড়েছে ‘কম দামি’ খেজুরের

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি তৌহিদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার খেজুরের আমদানি বেড়েছে। যে কারণে গত বছরের তুলনায় পাইকারি-খুচরা দুই বাজারেই খেজুরের দাম কম। তবে গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডে সাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজে দেড়শ কনটেইনার খেজুর বাংলাদেশে আসছিল। রমজান মাসের একেবারে শুরুতে হওয়ায় ওই খেজুর বাজারে না আসাতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এতে কম দামি খেজুরের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে অন্য সব ধরনের খেজুরের দাম বাড়েনি।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে প্রায় সব খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় এবার কম। গত বছর যে খেজুর তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার একই খেজুর ২ হাজার ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ কম থাকায় শুধু কম দামি খেজুরের দাম বেড়েছে।’

এমডিআইএইচ/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।