ঢাকার অদূরেই প্রিয় মানুষদের সঙ্গে অন্যরকম এক পদব্রজ ভ্রমণ

ভ্রমণ ডেস্ক
ভ্রমণ ডেস্ক ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৩ পিএম, ১৭ মে ২০২৬
ঢাকায় ফিরলাম ঠিকই, কিন্তু তুরাগের সেই নদীর পাড়, সেই খোলা আকাশ আর সেই হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে আপন হয়ে যাওয়া মানুষগুলো এখনো মাথার ভেতর রয়ে গেছে

জাকির হোসেন রাজু
পাহাড়, সাগর কিংবা সুন্দরবনের জঙ্গলে কোথায় কোথায় যাইনি ঘুরতে! ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন ঘুরেছি বা ৯ নাম্বার বিপদসংকেতের মাঝেও উপস্থিত হয়েছি কক্সবাজার গিয়ে। একসময় সুযোগ পেলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয়ে যেতাম। কিন্তু আরশি আমাদের কোলে আসার পর থেকে সেই ঘোরাঘুরি অনেকটাই কমে গেছে। এখন কোথাও যাওয়ার আগে হাজারবার ভাবতে হয়।

তবুও এই ভ্রমণটার ব্যাপারে মনে হলো, যেহেতু হাঁটাহাটি আর ঢাকার কাছাকাছি, বেলায় বেলায় ফিরেও আসা যাবে! তাই আর বেশি চিন্তা করিনি। বউকে বললাম এই হাঁটতে যাচ্ছি, হাঁটতে হাঁটতে একটা গোটা দিন কাটিয়ে দেবো সে কি আর সেইটা ভেবেছিলো! সন্ধ্যায় এসে দেখি রেগেমেগে গম্ভীরমুখ করে আছে যেন বৃষ্টি নামার আগের মুহূর্ত। কথা না বলে চুপচাপ আরশিকে নিয়ে প্লে জোনে চলে গেলা।

JAGONEWS

যাক সে কথা ভ্রমণে ফিরি, সকাল সকাল বের হয়ে পড়লাম নীলক্ষেত থেকে মহাখালী গিয়ে হাসিব ভাইকে ফোন দিয়ে দেখা করলাম। অভিযাত্রী নামের এই গ্রুপটার সঙ্গে আগে কোথাও যাওয়া হয়নি। তাই শুরুর দিকে একটু অস্বস্তি কাজ করছিল। কে কেমন হবে, কেমন মানুষ থাকবে, আসলে অনেক দিন ঘুরতে যাইনি তো তাই খানিক ইতঃস্তত করেই গেলাম, কিন্তু সেই অস্বস্তি টিকেছিল খুব অল্প সময়।

শুরুতেই এপি তালুকদার আপুর সেই লটারি সিস্টেম। কাগজে নম্বর, যার সঙ্গে যার মিল, সে তার সিট পার্টনার। আমার ভাগ্যে পড়লো সোহাগ ভাই। লোকটা একদম আমার উল্টো। ভীষণ এক্সট্রোভার্ট, হাসিখুশি, কথা বলতে বলতে পুরো বাস মাতিয়ে রাখার মতো মানুষ। আর আমি বরাবরের মতো না হয়ে একটু চুপচাপ, কনজারভেটিভ টাইপ ছিলাম সেদিন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, পুরো রাস্তা জুড়ে লোকটা এমনভাবে গল্প করে, হাসায়, খোঁচায়, মাতিয়ে রাখলো যে মনে হচ্ছিল বহুদিনের পরিচিত।

আমাদের পদব্রজের যাত্রা শুরু হলো কাশিমপুরের তুরাগ নদীর পাড় ধরে। আহা… কি সুন্দর সেই পথ! একদিকে নদী, অন্যদিকে গ্রামের বাড়িঘর, কোথাও ধানের গোলা, কোথাও কাঁচা রাস্তা, কোথাও আবার সরু আইল কোথাও ধানের খড়ের উপর দিয়ে আবার কোথাও ধানের উপর দিয়েই। আমরা লম্বা একটা মানব ট্রেনের মতো হাঁটছি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে স্কুলের জাতীয় সংগীতের লাইনের মতো সবাই একসঙ্গে ছুটে চলেছি।

JAGONEWS

শহরের কংক্রিটের জীবন মানুষকে বুঝতেই দেয় না মাটির গন্ধ আর ধানের মিষ্টি গন্ধ আসলে কত সুন্দর জিনিস। কারো হাতে তরমুজ, কারো হাতে কলা, কারো হাতে মুড়ি, কেউ বাকরখানি নিয়ে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে কোথাও থামা, আবার গল্প করতে করতে চলা। মাঝেমধ্যে গ্রামের মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে, কেউবা শোনে ভাই আপনারা কি শুটিং করতে এসেছেন? কেউবা শোনে আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? তাদের চোখে রাজ্যের কৌতূহল। এই ব্যাপারটা কিন্তু আমার বেশ ভালো লেগেছিল। ছোটবেলা থেকেই মানুষকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখতে আমার ভালো লাগে।

অল্প একটু পথ যাওয়ার পর এক জায়গায় নাকি ভালো মাঠা পাওয়া যায় সেখানে আমরা মরিচ মাঠা খেলাম প্রচন্ড রৌদে যা ছিল প্রশান্তির এক অনন্য অমৃত।

আর গান মামা…লোকটা পুরো ভ্রমণের প্রাণ ছিল। এত গান কীভাবে একজন মানুষ জানে আমি ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না। হাঁটছি আর গান শুনছি। কখনো পুরোনো বাংলা গান, কখনো আধুনিক কখনো যাত্রাপালার গান আবার কখনো ওয়াজ কখনোবা বাসের ক্যানভাস। কোনটা গান আর কোনটা উনার নিজের বানানো সেইটাই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছিলাম মাঝেমধ্যে। নদীর পাড়, খোলা আকাশ, গাছের ছায়া আর সেই গান… জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে যেগুলো খুব সাধারণ অথচ অদ্ভুত সুন্দর, এই ভ্রমণটা ঠিক তেমন ছিল।

jagonews

এপি তালুকদার আপু আর হাসিব ব্রো ছিল পুরো ট্রিপের সবচেয়ে এনার্জেটিক মানুষ। মনে হচ্ছিল উনারা প্রায় অর্ধশত মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কে পিছিয়ে পড়লো, কে পানি খেলো কি না, কে ক্লান্ত-সবদিকে নজর। অনেকটা পথ হেঁটে এবার বিশ্রাম নিতে হবে একইসঙ্গে জুম্মার নামাজ পড়ে নিতে হবে। এক চাচার আম্রকাননে আমরা বিশ্রামের জায়গা পেলাম, ৫২ বিঘার বিশাল প্লটে ধান, পাট আর আম হয়, নারিকেল লেবু আরও কতো কি!

তবে বিশাল বাগানের মালিক চাচার মনটাও অনেক বড়। অপরিচিত এতগুলো মানুষের জন্য সেই চাচার বাড়ি থেকে এলো অসংখ্য চেয়ার, ১০০ কাঁচা আম, দা বটি, গামলা, কাসুন্দি লেবু আরও অসংখ্য বোতল ঠান্ডা পানি। চাচা আমাদের অফার দিলো যে ডাল চাল সহ যা যা লাগে সে দিচ্ছে খিচুড়ি রান্না হোক, কিন্তু আমাদের হাঁটা শেষ করতে হবে তাই সেই বিশাল মনের চাচার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কয়েক গামলা আম ভর্তা সাবাড় করে রওনা দিতে হবে। চাচার এই স্নেহ মমতার কথা তোলা থাক আমাদের স্মৃতির কোঠায়।

বিশাল গাছের ছায়া, সামনে খোলা মাঠ, পাশে পুকুর। কেউ গামছা বিছিয়ে শুয়ে আছে, কেউবা হ্যামকে দিছে ঘুম, কেউ গান ধরেছে, কেউ মুড়ি মাখছে। আম ভর্তা, তরমুজ, ঠান্ডা পানি… সেই মুহূর্তে এগুলোকেই সেরা কর্মযজ্ঞই বলতে হয়। এর মধ্যে এসে হাজির এক গ্রামের আইসক্রিম ওয়ালা, আমাদের একজনের প্রশ্ন নারকেলের এতো দাম হওয়ার পরেও ৫ টাকার আইসক্রিমে এতো নারকেল কেমনে কি!

jagonewsদূরের আকাশ তখন মন খারাপ করে আমার বউয়ের মতো গম্ভীরমুখে বলছে বৃষ্টি এলো বলে। এই নদীর পাড়ে, এই মানুষের ভিড়ে, এই জৈষ্ঠ্যের দাবদাহে, এই মানব ট্রেনের মাঝে বৃষ্টি হয়তো ভীষণ দরকার। কিন্তু বৃষ্টি আসি আসি করে আর এলো না।

শুরু হলো আবার হাঁটা, বেশ কিছুদূর গিয়ে আমরা একটা বিশাল পুকুরে নেমে গোসলও করলাম। কতদিন পরে এভাবে সবাই মিলে পানিতে নেমে ঝাঁপাঝাপি করেছি মনে নেই, অনেক বড় পুকুর এপার থেকে ওপার সাঁতরে গেলাম, খানিকটা কষ্ট হয়েছিল। তবে সব ক্লান্তিকে সেখানে বিসর্জন দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম আমরা। শহরের জীবন মানুষকে ধীরে ধীরে কেমন বুড়ো বানিয়ে দেয়, অথচ ভেতরের বাচ্চাটা আসলে মরে না। দিন ফুরিয়ে যখন গোধূলি নেমে আসছিল, তখন বুঝতে পারছিলাম যাত্রা শেষের দিকে।

ঢাকায় ফিরলাম ঠিকই, কিন্তু তুরাগের সেই নদীর পাড়, সেই খোলা আকাশ আর সেই হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে আপন হয়ে যাওয়া মানুষগুলো এখনো মাথার ভেতর রয়ে গেছে। আর বাসায় ফিরে বউয়ের সেই গম্ভীর মুখ দেখে বুঝলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ট্রেকিং আসলে নদীর পাড়ে না, বউকে না জানিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে আসার পর বাসায় ফেরাটাই আসল এডভেঞ্চার!

লেখক: উপ-পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডি, ঢাকা

 

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।