৩ দিন হেঁটে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র উপকূল ভ্রমণ
মো. শিব্বির আহমেদ তাশফিক
২০১৬ সালের ডিসেম্বর। এ মাসেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতা। এ মাস নিয়ে তাই আমাদের আবেগ আর ভালোবাসা অন্য মাস থেকে আলাদা। যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করি অথবা বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত থাকি; তারা এ মাসে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়ে থাকি।
তারই ধারাবাহিকতায় কয়েকজন মিলে একটি অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণের চিন্তা করি। আইডিয়াটি আসে শিহাব ভাইয়ের মাথায়। শিহাব ভাই ছিলেন চট্টগ্রামের অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমারস’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আমিও সে ক্লাবের সদস্য ছিলাম। ক্লাবের সবাই মোটামুটি দেশে-বিদেশে প্রায়ই পর্বত অভিযানে যান। দেশের অনেক দুর্গম জায়গায় অভিযানে বের হন। আমাদের অ্যাডভেঞ্চার ছিল মূলত সমুদ্রের পাড় ধরে টেকনাফ থেকে হেঁটে কক্সবাজার আসা।

প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ভ্রমণের শুরুতে অনেকে আগ্রহ দেখালেও সবশেষে ১১ জন বের হলাম। ক্লাবের ৮ জন আর বাকি ৩ জন ক্লাবের বাইরের। ইতোমধ্যে আমার মাথায় একটি পরিকল্পনা আসে। তা হলো- এ ভ্রমণের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা। যেহেতু তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। তাই সব সময় মাথায় বন ও পরিবেশ রক্ষায় কী কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতাম। আমাদের যাত্রার সবাই আমার এ উদ্যোগকে সাদরে গ্রহণ করে। আমরা যাত্রাপথে মানুষকে কিভাবে সচেতন করতে পারি, সে জন্য একসাথে বসে আলোচনা করি। ‘সেভ দ্য কোস্টাল এনভায়রনমেন্ট, ইউ উইল সেভ দ্য লাইফ অ্যান্ড ফিউচার’ শিরোনামে একটি ব্যানার তৈরি করি।

আমরা ১০ জন ১৩ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর চট্টগ্রাম থেকে বাসে রওনা দেই টেকনাফের উদ্দেশে। আর বাকি একজন ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোর ৫টায় টেকনাফ পৌঁছাই। কনকনে ঠান্ডা আর শীতল বাতাসকে উপেক্ষা করে সেখান থেকে শাহপরীর দ্বীপে যাই এবং আমাদের পদব্রজে যাত্রা শুরু করি।
যাত্রার ১ম দিন: শুরুতে সবাই অনেক আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে হাঁটা শুরু করেছিলাম। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর নীল পানির কলকল ধ্বনি সবার মনেই মাতাল আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ গান গায়, আবার কেউ সমুদ্রের পানিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। যেহেতু সময়টা শীতকাল। তাই দিনের শুরুতে রৌদের তীব্রতা কম থাকলেও আস্তে আস্তে তা বাড়তে লাগল। আমাদের গ্রুপে ৩ জন নতুন সদস্য ছিল, যারা এর আগে এ ধরনের অভিযানে কখনো যায়নি। ফলে তারা খুব দ্রুতই ডিহাইড্রেশনে ভুগতে লাগল। আমরা সাথে করে কিছু শুকনো খাবার আর পানি ছাড়া তেমন কিছু নেইনি। তখনো মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটি পুরোপুরি হয়নি। তাই মানুষের আনাগোনাও খুব বেশি একটা ছিল না। সমুদ্রের পাড়ের ঝাউবনে কিছুক্ষণ বসে আবার যাত্রা চলতে থাকল।

এরই মাঝে স্থানীয় কিছু জেলের সাথে পরিবেশ তথা পানি দূষণ নিয়ে সচেতনতামূলক কথা বললাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অস্ত যেতে থাকল। আমরা তখন প্রায় ২৭-২৮ কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আশেপাশে তখনো কোনো জনপদ দেখতে পাচ্ছিলাম না। যদিও আমরা ক্যাম্পিং করে থাকার জন্য তাঁবু নিয়েছিলাম। তাই রাতে থাকা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলাম না। ‘যেখানে রাত, সেখানেই কাত’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর শাপলাপুর নামক একটি জায়গায় পৌঁছলাম। পাশেই একটি গ্রাম দেখতে পেলাম। আমরা গ্রামের কাছাকাছি গিয়ে তাঁবু গাড়লাম।
স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের কার্যালয়ে গিয়ে গোসল করে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য একটি হোটেলে গেলাম। খেতে গিয়ে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। আমাদের একজন সদস্য তার জীবনে কোনদিন একবারও ভাত খাননি, যদিও তিনি বাঙালি ছিলেন এবং চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। যা-ই হোক, তিনি কলা আর পাউরুটি খেয়েই সে যাত্রায় রাত কাটালেন। সবাই যেহেতু খুব ক্লান্ত ছিলাম, তাই পেট ভরে খেয়ে কিছুক্ষণ খোশগল্প করলাম। যারা প্রতিনিয়ত ভ্রমণ করেন, তারা ভ্রমণের রাতের সময়টাই সাধারণত বেশি উপভোগ করে থাকেন। অতঃপর সবাই তাঁবুর সামনে বসে ক্যাম্প ফায়ার করে গান আর আড্ডায় মেতে থাকলাম গভীর রাত পর্যন্ত। সারাদিনের ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেল। আজও সেই রাতের কথা মনে হলে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই জায়গায়।

যাত্রার ২য় দিন: পরদিন খুব সকালে গ্রামের খুব কাছেই একটি বনে গেলাম। স্থানীয়রা একে গর্জন বন বলেই জানে। একেকটি গর্জন গাছ প্রায় ১০০-১৫০ ফুট উঁচু। বনের কর্মকর্তা আমার বিশ্বাবিদ্যালয়ের একই ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই হওয়ায় বেশ আপ্যায়ন করলেন। তিনি সেখানের বন আর জীববৈচিত্র সম্পর্কে খুব অল্প সময়ে ব্রিফ করলেন। আমরাও স্থানীয় কিছু বাসিন্দার জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানলাম। পরে বন ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের কী করণীয়, তা অল্প সময়ের মধ্যে তাদের বলার চেষ্টা করলাম।
৩০ মিনিট পর আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমাদের নতুন ৩ জনের পা ব্যথায় ফুলে গেল। তাই তারা হাঁটতে অপরাগতা প্রকাশ করলো। এ ৩ জনকে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দিয়ে একটি গাড়িতে কক্সবাজারের উদ্দেশে পাঠিয়ে দিলাম। তারা আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করবে বলে জানাল। অতঃপর বাকি ৮ জনই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। আস্তে আস্তে সূর্যের প্রচণ্ড তাপে আমিসহ কয়েকজন অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। সূর্যের তাপ আর উত্তপ্ত বালু পেরিয়ে হেঁটে যেতে লাগলাম। মেরিন ড্রাইভের অপর পাশে ছোট ছোট পাহাড় দেখে অনেকেই সেখানে র্যাপ্লিং আর জুমারিং (কোমরে দড়ি বেঁধে পর্বতে ওঠার দুটি পদ্ধতি) প্র্যাক্টিস করতে চাইল। যেহেতু আমাদের হাতে সময় খুব বেশি ছিল না। তাই এ যাত্রায় সেটা করা হয়নি। ২-৩ ঘণ্টা পরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমাদের যাত্রা চলতে থাকল। ২য় দিন আমরা ইনানী বিচের একটু আগে তাঁবু গাড়লাম। প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার হেঁটে ওই দিনের মত যাত্রা শেষ করলাম।

যাত্রার ৩য় দিন: ৩য় দিনের শুরুতে সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে হাঁটা শুরু করলাম। একটু পরপর কেউ একজন মজার ছলে চিৎকার দিয়ে উঠছিলাম, এই বুঝি আমরা কক্সবাজার চলে এসেছি! হোটেল রয়েল টিউলিপ দেখে আমরা ভেবেছি এই না বুঝি আমরা চলে এসেছি, কিন্তু না! একটু কাছে যাওয়ার পরই ভুল ভাঙল। সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য আমাদের দেখে একটু অবাক হলেও আমাদের কাজকে উৎসাহ দিতে ভুলল না। খুব আনন্দ আর উদ্দীপনা নিয়ে সবাই এক পা-দু’পা করে ঝাউবনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কক্সবাজারের খুব কাছাকাছি চলে এলাম। ঘড়িতে তখন বিকাল ৫টা বা সাড়ে ৫টার মত।
অবশেষে আমরা ডলফিন পয়েন্টে এসে আবেগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। দিনটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় দিবস! আমাদের আবেগ, ভালোবাসা আর গৌরবের দিন। মূলত দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ রকম পরিকল্পনা করেছিলাম। তারপর কিছুক্ষণ ফটো সেশন চলতে থাকল। স্থানীয় কিছু মানুষ আমাদের হাঁটার কথা শুনে খুব অবাক হলো। কেউ কেউ আমাদের সাথে ছবিও তুলল। সবাই খুব ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে সামুদ্রিক মাছ আর ভর্তা দিয়ে ভাত খেলাম। সবশেষে কিছুক্ষণ সমুদ্রের পাড়ে বসে শেষবারের মত সমুদ্রের বিশালতার মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চেষ্টা করলাম। রাত ১০টায় বাসে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হলাম।
৩ দিনের সেই অভিযান থেকে জীবনে অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি। নিজের ভেতর জমে থাকা সুপ্ত শারীরিক এবং মানসিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যেকোনো অসাধ্যকে সাধন করতে পারে। সেটি ওই যাত্রায় শিখেছিলাম। হয়তো সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কোনো একদিন পুরো বাংলাদেশ হেঁটে ভ্রমণে বের হয়ে যাব। মানুষকে পরিবেশ আর বন রক্ষায় উদ্ধুদ্ধ করব। শুধু একটু সময় আর অবকাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।
লেখক: শিক্ষার্থী এবং সহকারী গবেষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।
এসইউ/এএ/জেআইএম