পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

মিরসরাইয়ে প্রতি বছর যান ৫ লাখ পর্যটক, পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব

এম মাঈন উদ্দিন
এম মাঈন উদ্দিন এম মাঈন উদ্দিন , উপজেলা প্রতিনিধি, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
প্রকাশিত: ০৩:২৫ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
মিরসরাইয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, ছবি: জাগো নিউজ

পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনা। পাশেই আঁকাবাঁকা হ্রদ। কয়েক কিলোমিটার দূরে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে ছোটাছুটি করছে নৌকা। মাঝে মাঝে দেখা মেলে মায়া হরিণ, শেয়াল ও বন মোরগের। এমন দৃশ্যের দেখা মেলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। এখানে ভ্রমণে এসে অল্প সময়েই মুগ্ধ হন পর্যটকেরা। এখানকার পর্যটন শিল্প অপার সম্ভাবনার। কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

সৌন্দর্যের টানে ছুটে এখানে আসেন দূর-দূরান্তের অসংখ্য পর্যটক। তবে অপ্রতুল আবাসন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যটনের বিকাশে। উপজেলাটিতে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে মনোযোগ নেই সরকারি সংস্থাগুলোর।

এই উপজেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্বপাশে সারি সারি পাহাড়। সেখানেই আছে ঝরনা ও হ্রদ। পাহাড়গুলোয় বন্যপ্রাণীর ছোটাছুটি, ঝিঁঝি পোকার ডাক ও পাখির কলতান উপভোগ্য। পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকত। উত্তর পাশে বহমান নদী। সেখানে বসে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, সাগরের গর্জন ও মাছ ধরার নৌকাসহ মনোরম দৃশ্য।

jagonews

এখানে বেড়ানোর উপযুক্ত সময় বর্ষা থেকে শীত মৌসুম। বর্ষায় পানিতে টইটুম্বুর থাকে ঝরনা। তবে এ সময় ভ্রমণ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই শীত মৌসুমকে নিরাপদ ভ্রমণ ও ট্রেকিংয়ের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন পর্যটকেরা। ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাহাড় ট্রেকিং, ঝরনা ও হ্রদ সকালে ঘুরে দেখাই ভালো। তাহলে বিকেলে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানো যায়। সাগরপাড়ে বসে দেখা যায় সূর্যাস্ত।

এখানে আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া, দেশের ৬ষ্ঠ সেচ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট, উপজেলার অলিনগরে অবস্থিত হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্ট, করেরহাট ফরেস্ট ডাক বাংলো, আরশিনগর ফিউচার পার্ক, সোনাপাহাড় প্রকল্প, ডোমখালী সমুদ্রসৈকত, মিরসরাই শিল্পনগর সমুদ্রসৈকত, রূপসী ঝরনা, বাওয়াছড়া লেক ও হরিণাকুণ্ড ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, খৈয়াছড়া ঝরনা ও মেলখুম গিরিপথ।

আরও পড়ুন
পাহাড়ি জলের সৌন্দর্যের খোঁজে একদিন 
নয়নাভিরাম চন্দ্রনাথ পাহাড় 

jagonews

জানা গেছে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া ইকোপার্ক গত ২২ জুলাই থেকে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ২ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকায় ১ বছরের জন্য ইজারা পায় ওয়াসিফা এন্টারপ্রাইজ। প্রায় তিন মাস ধরে হ্রদ অচল হয়ে যাওয়ার অবস্থা হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় হ্রদটি পরিষ্কার করে। তবে ঝরনা এলাকায় নিরাপত্তা, দুর্ঘটনারোধে পদক্ষেপ ও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ে না। ঝরনার ওপর থেকে পড়ে ও পানিতে ডুবে প্রতি বছর অনেক পর্যটক মারা যান।

বেসরকারি পর্যটনকেন্দ্র ও বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় প্রতি বছর গড়ে পাঁচ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করতে আসেন। আবাসন সংকটের কারণে পর্যটকদের বড় একটি অংশকে সকালে এসে বিকেলে ফিরে যেতে হয়। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো আর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা অন্তত দ্বিগুণ হবে। মিরসরাইয়ে বাস্তবায়নাধীন জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আগামী ১০ বছরে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা আছে, যার সূত্র ধরেও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বাড়বে দেশি-বিদেশি পর্যটক।

উপজেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে বেসরকারিভাবে কিছু আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। তবে এসবের মান খুব ভালো নয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও আছে ঘাটতি। চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন বৈচিত্রপূর্ণ পর্যটন এলাকা দেশে খুব একটা নেই। বিশেষ করে বর্ষায় ঝরনাগুলোয় পর্যটক অনেক বেড়ে যায়। তখন আবাসন সংকট থাকে বেশি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটন শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করবে।’

jagonews

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উপব্যবস্থাপক (বিপণন) শেখ মেহেদী হাসান বলেন, ‘মিরসরাই উপজেলায় বহুমুখী প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র আছে। তবে আদর্শ পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার মৌলিক যে শর্তগুলো আছে, যেমন- আবাসন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও পেশাদার গাইড; এসবের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এসব ঘাটতি পূরণ হলে উপজেলার পর্যটন শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।’

এমএমডি/এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।