ঈদে দুর্ভোগ-স্বস্তিতে যাওয়া-আসা
ঈদুল আজহার ছুটি তিন দিন। ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আমি ৩১ আগস্ট সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অফিস করে বাড্ডা লিঙ্ক রোড থেকে প্রচেষ্টা পরিবহনে উঠলাম। গাড়ি থামানোর আগেই হেলপার বলল, ‘মাওয়া গেলে দুইশ’ টাকা।’ কী আর করা? যেতে পারলেই হলো। উঠে দেখলাম একটা সিটও খালি নেই। উপরন্তু দু-তিনজন অলরেডি দাঁড়িয়ে আছেন। অগত্যা ব্যাগটা উপরের তাকে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম। রামপুরা ব্রিজে যেতে যেতে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যা বাড়লো। বাকি পথে আরো হয়তো বাড়বে।
প্রথম ধাক্কাটা খেলাম মালিবাগ রেলগেটের কাছে গিয়ে। ফ্লাইওভারের গোড়ায় সংযোগ সড়ক থেকে আসা গাড়ি আটকে তৈরি হয়েছে বিশাল যানজট। প্রশাসনের চেষ্টায় আধাঘণ্টার মধ্যে জট খুলতে সক্ষম হয়। ইতোমধ্যে যানজটের আতঙ্ক সব যাত্রীর মধ্যে। সন্ধ্যার আগে শিমুলিয়া পৌঁছতে পারবো তো?
সুপারভাইজার এলেন ভাড়ার জন্য। জানতে চাইলাম, ‘ভাড়া কত?’ তার হাসিমাখা জবাব, ‘দুইশ’ টাকা দেন মামা।’ আমি বললাম, ‘বাড্ডা থেকে মাওয়া ঘাটের ভাড়া সব সময় নব্বই টাকা। ঈদের কারণে কিছু বাড়তে পারে। তাই বলে দুইশ’ টাকা?’ তার উত্তর, ‘কী করমু মামা, আইতে অইবো খাইল্লা (খালি)।’ কথা না বাড়িয়ে দিলাম পাঁচশ’ টাকার নোট। তিনি বললেন, ‘ভাঙতি দেন।’ বললাম, ‘নেই। দেড়শ’ টাকা আছে, নিবেন?’ তিনি নিলেন না, পাঁচশ’ টাকার নোট নিয়েই চলে গেলেন। বলে গেলেন, ‘ভাঙতি কইরা দিতাছি।’
এরমধ্যে গাড়ি অনেক দূর এগিয়েছে। প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশি। মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর, কাকরাইল কোন যানজট ছিল না। মনে মনে বেশ স্বস্তি পাচ্ছিলাম। ভাবলাম- তাহলে তো ভালোই। যানজট না থাকলে আরামেই যেতে পারবো। ভাবতে ভাবতেই গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্ক থেকে পল্টন পর্যন্ত যানজট।

আরও পড়ুন- ঢাকা-শরীয়তপুর : পথের বাঁকে বাঁকে
গাড়ি আগাচ্ছে না। পল্টন সিগন্যাল পার হলেও জিপিও পর্যন্ত যানজট। বাকি পথের কথা এখনি বলা যাচ্ছে না। গাড়ি টিপটিপ করে আগালেও কিছুটা পথ যেতে পারতাম। গাড়ি তো আগাচ্ছেই না। ইতোমধ্যে বিরক্ত হয়ে অনেকেই নেমে হাঁটা শুরু করলেন। সুপারভাইজার আগেই ভাড়া নিয়ে নিয়েছেন। তাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো যানজট দেখেই নেমে পড়েছেন।
অবশেষে যারা নেমে গেল; ফেরত টাকা না নিয়েই গেল। আমিও ভাবলাম, আমার টাকা হয়তো ফেরত পাবো না। উনি আদৌ গাড়িতে উঠবেন কি না। যানজটের সেই তো শুরু। এরপর ধারাবাহিকভাবে গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বংশাল পার হয়ে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত যেতে প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা গায়েব হয়ে গেল।
ঈদের এমন ভ্রমণ এবারই প্রথম নয়। ফলে খুব বেশি অস্বস্তি নেই। তবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শরীরটা বেয়ারা হয়ে যাচ্ছে। যারা সিটে বসা ছিলেন; তারাও সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কোমর ঠিক করছেন। বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কদমতলী-নিমতলী ধীর গতিতে গেলেও এরপর গাড়ি ভালোই চলছিল। হঠাৎ দেখা মিললো সুপারভাইজারের। তিনি সম্ভবত বাবুবাজার ব্রিজ থেকে উঠেছেন।
তার কাছে ফিরতি টাকা চাচ্ছিলাম। তিনি অবাক! বললেন, ‘টিকিট দেহান আপনার? টাকা পাইলে টিকিটের ওইপাশে লেহা থাকে।’ আমি বিরক্ত হলাম। বললাম, ‘টিকিট তো আমাকে দেননি। বললেন পরে দিচ্ছি।’ তিনি তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। এবারও বললেন, ‘ভাঙতি কইরা লই’। বললাম, ‘ওই পাঁচশ’ টাকা দেন। আমার কাছে দেড়শ’ খুচরা আছে, ওইটাই নেন। তখনও তো বলছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আল্লা সাক্ষী থাকবো কিন্তু। টাকা না দিয়াই কইতাছেন দিছি।’ তার কথা শুনে রেগে গেলাম। বললাম, ‘আল্লাহর কাছে ঠ্যাকা থাকলে আমি থাকবো। পাঁচশ’ টাকা দেন, দেড়শ’ টাকা নেন।’ আমার দৃঢ়তা দেখে কথা না বাড়িয়ে তা-ই করলেন।

এরপর আবার বিপত্তি বাঁধলো সড়ক দুর্ঘটনায়। মাওয়া চৌরাস্তা পৌঁছানোর আগেই কোনো এক পরিবহন উল্টে বিশাল জটের সৃষ্টি। রাস্তার দু’ধারে কাজ চলছে। সড়ক প্রশস্ত হবে। একদিন অনেক আরামে বাড়ি পৌঁছবো ভেবে সাময়িক দুর্ভোগকে গায়ে মাখিনি। এখানেও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় সড়ক সচল করতে লেগে গেল প্রায় আধাঘণ্টার বেশি।
আরও পড়ুন- জগদীশের বাড়ি থেকে পদ্মার চর!
ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় ছয়টা বেজে গেছে। ঘাটে গিয়ে দেখা হলো বন্ধু বাদল খান, তার স্ত্রী শারমিন, সরকারি কর্মকর্তা মাসুদ ভাই ও ছাত্রনেতা খোকনের সঙ্গে। একসঙ্গেই উঠলাম লঞ্চে। শিমুলিয়া থেকে মাঝিকান্দি। মজার ব্যাপার হচ্ছে- লঞ্চ পারাপারে ভাড়া যা ছিলো, তা-ই। এক টাকাও বাড়েনি।
মাঝিকান্দি ঘাটে নেমে বাসের আশা না করে টেম্পু ভাড়া করলাম আমরা পাঁচজন। কারণ বাস ভাড়া জনপ্রতি ১৩০ টাকা। আগের যেখানে ভাড়া ছিলো ৬৫ টাকা। তাই আমরা বারোশ’ টাকায় পুরো একটি টেম্পু ভাড়া করে নিলাম খাসেরহাট পর্যন্ত।
শরীয়তপুরের কাছাকাছি প্রেমতলা যেতেই বেপরোয়া এক বাস ইউটার্ন নিতে গিয়ে উঠিয়ে দিল আমাদের টেম্পুর ওপর। তেমন ক্ষতি না হলেও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। সে যাত্রায় ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠে চৌরঙ্গি গিয়ে দেখা করলাম জাগো নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি মো. ছগির হোসেনের সঙ্গে। তার আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়ে ছুটলাম বাড়ির দিকে। আবার থামতে হলো শরীয়তপুর কোর্টের কাছে। সেখানে দেখা হলো ছাত্রনেতা পাংকুর সঙ্গে। খোকন ভাইয়ের খুব কাছের মানুষ পাংকু।

সেখান থেকে বিদায় নিয়ে মনোহর বাজার আসতেই টেম্পুচালক জানালো, বাসের ধাক্কার কারণে গাড়িতে আস্তে আস্তে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে একটি ইজিবাইক ঠিক করে দিলো আমাদের। ইজিবাইকে উঠে কিছুদূর গিয়ে ঢুকলাম একটি হোটেলে। হোটেলটির সন্ধান দিলেন মাসুদ ভাই। রাতের হালকা খাবার খেয়ে এবার বাড়িতে পৌঁছানোর পালা।
ইজিবাইক থেকে নেমে ফোন করলাম মেজ ভাইকে। গ্রামের পথ-ঘাট কর্দমাক্ত। কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। মেজ ভাই এলেন একটি চার্জার লাইট হাতে নিয়ে। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে রাত দশটা। কাঁধ থেকে ব্যাগটি রাখতে রাখতে বাড়ি পৌঁছানোর স্বস্তিতে সব দুর্ভোগ নিমিষেই ভুলে গেলাম। ভ্রমণে তো একটু আধটু ঝক্কি-ঝামেলা থাকবেই। তাই বলে কি ভ্রমণ থেমে থাকবে? অবশ্যই না।
আরও পড়ুন- ঘুড়ি পরিবারের সঙ্গে মহানন্দের একদিন!
দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটি দিন। এবার ফেরার পালা। ৩ সেপ্টেম্বর ১২টায় বের হলাম বাড়ি থেকে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়াতেই ভ্যান পেয়ে গেলাম। চলে এলাম স্নানঘাটা বাজারে। সেখান থেকে ইজিবাইকে মনোহর বাজার। ইজিবাইক থেকে নামতে না নামতেই এক টেম্পুচালকের হাক-ডাক ‘ঘাটে একশ’ টাকা মাত্র’ শুনে উঠে বসলাম।

রাস্তা-ঘাট এখন ফাঁকা। ঘাটে পৌঁছতে যতক্ষণ। লঞ্চে উঠে দেখি যাত্রী সংখ্যা মাত্র ১০-১৫ জন। পদ্মা পার হয়ে এপারে নেমে উঠলাম বিআরটিসি বাসে। ভাবলাম, দ্রুত চালাবে। এ দেখি লোকালের চেয়েও খারাপ। জায়গায় জায়গায় থেমে যাচ্ছে যাত্রীর আশায়। ফাঁকা বাস নিয়ে ঢাকা যেতে চালকের বুকটা কেমন খাঁ-খাঁ করছে। তবে ঘাট থেকে গুলিস্তানের ভাড়া নিলো সত্তর টাকা মাত্র। এবার আর ডবল গুনতে হয়নি। গুলিস্তান নেমে সুপ্রভাতে চলে এলাম রামপুরা। আমার বাসার কাছেই। ঘড়িতে তখন বিকেল ৫টা।

বাসায় যেতে যেতে ভাবলাম, যাওয়ার সময় যতোটা দুর্ভোগ ছিল; আসার সময় তারচেয়েও বেশি স্বস্তিতে আসতে পেরেছি। বহুদিন পর নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করলাম। ঈদে বাড়িতে কাটানো মধুময় কিছু সময় আর স্বস্তিতে বাসায় ফেরার আনন্দে সেদিনকার দুর্ভোগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম ভাড়াকৃত ভবনের সামনে। মাকে ফোন করে বললাম, ‘ভালোভাবেই পৌঁছেছি। পথে কোন সমস্যা হয়নি।’
এসইউ/আইআই