রমজান এলে দাম বাড়ে, চাষির কপাল পোড়ে

কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্ক কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:০৩ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ফাইল ছবি

আবু রায়হান

রমজান মাস আসতেই বাজারের পাল্লা যেন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। যে পণ্যের দাম গত সপ্তাহেও নাগালে ছিল, আজ তা ছুঁয়ে দেখতেই কষ্ট। অথচ চাষিরা ন্যায্য মূল্য পায় না কখনোই। আলু, চাল, ডাল, তেল, ছোলা—সবকিছুর গায়েই নতুন দাম সাঁটা। সংযমের মাস আসার আগেই সাধারণ মানুষের সংসারে শুরু হয় হিসাবের চাপ।

অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা বাড়লে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে, এটি স্বাভাবিক নিয়ম। রমজানে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কিছুটা বাড়ে, বিশেষ করে ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই চাহিদা কি এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রতি বছর শাক-সবজির বাজার অস্থির হয়ে উঠতে হবে? বাস্তবতা বলছে, চাহিদার চেয়ে সংকট বেশি তৈরি হয় ব্যবস্থাপনায়, নজরদারিতে এবং নৈতিকতার অভাবে।

রমজান আসছে—খবরটি নতুন নয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই এ মাস আসে। তবু ব্যবসায়ীরা আগেভাগে পণ্য মজুত করেন না, আমদানি ও সরবরাহ পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রমজানকে পণ্য মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ হিসেবে দেখেন। সংযমের মাস তখন মুনাফার মাসে রূপ নেয়।

একই সময়ে জমিতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না চাষিরা। তারা জমিতে থেকে আলু কেজিতে ১২ টাকা বিক্রি করলেও বাজারে এসে তা হয়ে যায় ২৫ টাকা। পটলের কেজি হয়ে যায় ৪০০ টাকা। করলার কেজি ২০০ টাকা। ২০ টাকার শিম হয়ে যায় ৬০ টাকা। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, কৃষক নামমাত্র মূল্যে এসব বিক্রি করে দিয়েছেন রমজান এসেছে বলে।

সরকার প্রতি বছরই সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয়, টিসিবির ট্রাকসেল, ওএমএস, ভ্রাম্যমাণ বাজার। কিন্তু এসব উদ্যোগ চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত। বড় একটি জনগোষ্ঠী এই সুবিধার বাইরে থেকে যায়। ফলে খোলা বাজারের ওপর চাপ বাড়ে, আর সেই সুযোগ নেয় মুনাফালোভীরা।

এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের ভূমিকা একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রমজান এলেই আমরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কেনাকাটা করি। ‘পরে দাম বাড়বে’ এই আশঙ্কায় একসঙ্গে অনেক পণ্য কিনে ফেলি। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা দাম বৃদ্ধিকে আরও উসকে দেয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদারকির দুর্বলতা। বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হলেও তা অনেক সময় লোক দেখানো পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। শাস্তির নজির কম থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার একই কাজ করার সাহস পায়। তাতে কপাল পোড়ে কৃষকের। এদিকে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি না থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ কাগজেই সীমাবদ্ধ।

রমজান আমাদের শেখায় সংযম, সহানুভূতি ও ন্যায়বোধ। অথচ এ মাসেই যদি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, তবে সেই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? বাজার নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও প্রশাসন—সব পক্ষের সম্মিলিত দায় আছে।

রমজান এলেই যেন বাজার অস্থির না হয়, সে জন্য প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি এবং সর্বোপরি নৈতিকতার চর্চা। না হলে সংযমের মাস বারবারই পরিণত হবে মূল্যবৃদ্ধির মাসে। যার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই। কৃষকের উৎপাদিত ফসল কৃষককেই বেশি দামে কিনতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।