লালমনিরহাটে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু চাষ, দাম নিয়ে শঙ্কা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ১২:১৬ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
আগাম জাতের আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে, ছবি: জাগো নিউজ

শীতের আমেজে লালমনিরহাটের কৃষিজমিগুলো এখন কর্মচঞ্চল। জেলার পাঁচটি উপজেলায়ই শীতকালীন সবজি ও আগাম জাতের আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ক্ষেত থেকে নতুন আলু তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। হাট-বাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করলেও গত মৌসুমের পুরাতন আলুর দাপটে কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

জেলার বিভিন্ন কাঁচামাল আড়ত ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে আগাম ‘ক্যারেজ’ জাতের আলু প্রতি ৫ কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায় (কেজিপ্রতি ১৯ টাকা)। ‘হাগড়াই’ (বগুড়াই) জাতের আলু প্রতি ৫ কেজি ১৬০ টাকায় (কেজিপ্রতি ৩২ টাকা) বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে হিমাগারে সংরক্ষিত গত মৌসুমের পুরাতন লাল আলুর দাম একেবারে তলানিতে। আড়তে প্রতি বস্তা (৬০ কেজি) পুরাতন আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ টাকায়। সেই হিসেবে কেজিপ্রতি দাম পড়ছে প্রায় ১০ টাকা।

খুচরা বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। শহরের সেনামৈত্রী হকার্স মার্কেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, হাড়িভাঙ্গা, বড়বাড়ী, মহেন্দ্রনগর ও বুড়ির বাজারে আগাম ক্যারেজ আলু কেজিপ্রতি ২০-২২ টাকা এবং হাগড়াই আলু ৩৫-৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পুরাতন লাল আলু পাওয়া যাচ্ছে ৮-১০ টাকা কেজিতে।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক ইব্রাহিম হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‌‘গত বছর এই সময়ে নতুন আলুর পাইকারি দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা। এবার তা নেমে এসেছে ১৭-২০ টাকায়। এতে আমাদের উৎপাদন খরচই উঠছে না।’

potato

কালীগঞ্জের তুষভান্ডার ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ন্যায্য দাম না পেলে আমাদের মতো প্রান্তিক কৃষকদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। জীবনযাপন মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে।’

দাম কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে পুরাতন আলুর অতিরিক্ত সরবরাহকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। বড়বাড়ী কাঁচামাল আড়তের পাইকার মজিদুল মিয়া বলেন, ‘বাজারে পুরাতন আলু পর্যাপ্ত থাকায় নতুন আলুর চাহিদা কিছুটা কম।’

আরও পড়ুন
মাগুরায় আগাম পেঁয়াজ চাষে ব্যস্ত কৃষকেরা 
মাগুরায় সরিষার বাম্পার ফলনের আশা 

আরেক পাইকার হক সাহেব জানান, কৃষক ও পাইকারদের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি এবং সঠিক বাজার সংযোগ না থাকাও দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ বিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক জাদ আলী ও সদর উপজেলার কলেজ শিক্ষক এবং আলুচাষি আপেল উদ্দিন মনে করেন, আলুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। তারা বলেন, ‘রপ্তানি বৃদ্ধি, কার্যকর স্টক ব্যবস্থাপনা, কৃষক ও পাইকারদের সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট কাটানো সম্ভব।’

potato

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। তবে আগাম আলু বাদে ডিসেম্বর পর্যন্তই চাষ সম্পন্ন হয়েছে ৬ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১০ হেক্টর বেশি। সদর উপজেলায় ৪ হাজার ১০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ৯৯০ হেক্টর, আদিতমারীতে ৮৮০ হেক্টর, হাতীবান্ধায় ৬৮০ হেক্টর, পাটগ্রামে ২৫০ হেক্টর। এ ছাড়া আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে।

আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার উৎপাদন প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যাবে। তবে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার সোহায়েল আহমেদ স্বীকার করেন, হিমাগারে সংরক্ষিত পুরোনো আলুর কারণে নতুন আলুর বাজার কিছুটা চাপের মুখে আছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘আবহাওয়া শেষপর্যন্ত সহায়ক থাকলে ভালো ফলনের পাশাপাশি কৃষকেরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সে বিষয়ে আমরা আশাবাদী এবং বাজার মনিটরিং করছি।’

মহসীন ইসলাম শাওন/এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।