ছাত্রদল নেতার চাঁদাবাজি
‘সমন্বয়ক কও, শিবির কও, প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি কও সব জায়গায় যাবে’
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রদলের নেতৃত্ব প্রত্যাশী নেতা আবু সাঈদ রনির বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড সম্প্রতি জাগো নিউজেরহাতে এসেছে।
অভিযুক্ত আবু সাঈদ রনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
অডিওতে তাকে এক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার কাছ থেকে মামলা ‘হোল্ড’ রাখার কথা বলে লক্ষাধিক টাকা দাবি করতে শোনা যায়। হোয়াটসঅ্যাপে হওয়া কথোপকথনের সময় ভুক্তভোগী অন্য একটি মোবাইল ফোন দিয়ে পুরো বিষয়টি ভিডিও আকারে ধারণ করেন। প্রতিবেদকের হাতে আসা ওই ভিডিওতে কথোপকথনের পাশাপাশি আবু সাঈদ রনির ব্যবহৃত নম্বরও দেখা যায়।
জানা যায়, অডিওটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের। সেসময় ভয়ে ভুক্তভোগী বিষয়টি প্রকাশ করেননি। তবে সম্প্রতি আবু সাঈদ রনির ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে অডিওটি প্রতিবেদকের হাতে আসে।

ফাঁস হওয়া অডিওতে আবু সাঈদ রনিকে এক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার কাছে চাঁদা দাবি করতে শোনা যায়। কথোপকথনে তিনি বলেন, একটি মামলার তালিকায় কয়েকজনের নাম এসেছে এবং টাকা দিলে বিষয়টি ‘হোল্ড’ রাখা যেতে পারে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক কারণেই ভুক্তভোগীর নাম মামলায় এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি। অডিওতে রনি বলেন, ‘সমন্বয়ক কও, শিবির কও, আমাদের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি কও সব জায়গায় টুকটাক যাবে।’
কথোপকথনের একপর্যায়ে ভুক্তভোগী অল্প সময়ের জন্য রাজনৈতিক পদে ছিলেন উল্লেখ করলে রনি বলেন, ‘তুই পদ কখন পাইছিস কি না পাইছিস সেটা তো আর ওরা (শিবির-সমন্বয়ক) দেখেনি।’ এসময় তিনি ইঙ্গিত দেন, শিবির ও সমন্বয়কদের মাধ্যমে মামলা দেওয়া হলেও ছাত্রদল তা সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পতন না হলে কিংবা নির্বাচন হয়ে গেলে এসব কেস-কামারি হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘ছাত্রদল-ছাত্রলীগ একসঙ্গেই তো ক্যাম্পাসে সব ঠিকঠাক করে, শিবিরের বিরুদ্ধে সবাই’ এমন মন্তব্য করতেও শোনা যায় তাকে।
দ্বিতীয় কলের কথোপকথনে রনি বলেন, ‘কয়েকজনের নাম আপাতত হোল্ডে রাখা হয়েছে।’ এসময় ভুক্তভোগী টাকা কমানোর জন্য শিবির ও সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বললে রনি জানান, ‘বিষয়গুলো ছাত্রদলের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির মাধ্যমেই ঠিক হবে।’
এসময় ভুক্তভোগী রনির পরামর্শে নিজ ভাতিজাকে ইবি ছাত্রদলের সদস্যসচিব মাসুদ রুমী মিথুনের সঙ্গে কথা বলতে পাঠান বলে শোনা যায়। একপর্যায়ে রনি বলেন, ‘কারো কারো কাছ থেকে ৫০ হাজার, ৩০ হাজার কিংবা ২০ হাজার টাকা দিয়েও বিষয়গুলো ম্যানেজ করার চেষ্টা চলছে।’ তবে ভুক্তভোগীর আর্থিক সচ্ছলতার কারণে তার নিকট লক্ষাধিক টাকা দাবি করা হয়েছে বলে রনি জানান।

এছাড়া মামলা থাকলে বিদেশ যাত্রা ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনেও জটিলতা হতে পারে বলে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখাতে শোনা যায় তাকে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় আবু সাঈদ রনি পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে আবু সাঈদ রনি অস্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমার হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হয়েছিল। সেই হ্যাক হওয়া আইডিটি কোনো একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রির সাইটে ভুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কারণে বিভিন্ন মানুষ আমার ওই পুরোনো নম্বরে মেসেজ পাঠাতো।’
তিনি আরও জানান, ওই নম্বরটি তিনি আগেই ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন এবং বর্তমানে সেই আইডি বা নম্বরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মাসুদ রুমী মিথুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা নির্দিষ্ট কাউকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে পুরোনো ঘটনাকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কেউ ভুয়া প্রমাণ তৈরি করে বা কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এমন কাজ করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি ছাত্রদলের নাম ভাঙিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ালে বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি সম্পর্কে কোনো ভুক্তভোগী প্রমাণসহ উপস্থিত হলে যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে দ্রুত সমাধান ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অডিওতে তার নাম নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো ভিত্তিহীন। ৫ আগস্টের পর আমরা বলে দিয়েছিলাম যে, কেউ যদি প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির নাম ভাঙিয়ে কিছু বলে তাহলে সরাসরি আমাদেরকে জানাবেন। দুই বছর পরে এসে এসব কথা তো মানুষকে ফাঁসানোর মতো কথা। যে অভিযোগ করেছে তাকে ডাকো আমরা সমাধান করি।’
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
ইরফান উল্লাহ/এফএ/এমএস