অপরাধীদের নিরাপদ জোন ঢাবি ক্যাম্পাস!

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সবুজে ঘেরা, নান্দনিক স্থাপনা, ঐতিহাসিক স্থান, জাতির উত্থান পতনের স্মৃতি বিজড়িত নানান শিল্পকর্ম এবং তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ভরা পবিত্রতার অবয়বে ঘিরে রাখা একটি চত্বর। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন, ১/১১ তত্ববধায়ক সরকারের পতনসহ সকল আন্দোলনের নেতৃত্বের অগ্রভাগে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।

কিন্তু দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপীঠটি এখন যেন হয়ে উঠেছে অপরাধীদের কার্য সম্পাদনের নিরাপদ জায়গা হিসেবে। নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন ও নেতৃত্বের জায়গা হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক এই ক্যাম্পাসটি। সচরাচর হত্যাকাণ্ড, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার ও ককটেল হামলাসহ বিভিন্ন রকম নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে এটি। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক বিরাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে।   

সম্প্রতিক কিছু ঘটনায় নিরাপত্তা ইস্যুটি আবারও আলোচিত হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বই মেলা থেকে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগার অভিজিত রায়কে প্রকাশে হত্যা। ওই ঘটনায় মারত্মকভাবে আহত হন তার স্ত্রী বন্যা।

এছাড়া গত কয়েকদিনে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা থেকে তিন অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিএনপি জাময়াতের হরতাল-অবরোধে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিভিন্ন সময় প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। এতে ১৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষনার্থী, সাংবাদিক, ব্যাংক কর্মকর্তা, পথচারী, রিক্সাচালকসহ অনেকে। এসব ঘটনায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন জাগে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ থাকলেও নিয়মিতই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবৈধভাবে চলাচল করছে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যানসহ ভারী যানবাহনগুলো। যার দরুণ সল্প সময় পরপর এখানে ঘটে যাচ্ছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অজ্ঞাতনামা লাশ ফেলে যাওয়ার মতো ঘটনা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং সবকটি প্রবেশ পথ রাত-দিন খোলা থাকার কারণেই এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে।
 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের পথ রয়েছে মোট আটটি, যার সব কটির নিরাপত্তাকর্মী বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। প্রবেশ পথগুলোতে ‘ভারী যানবাহন প্রবেশ নিষেধ’ লেখা থাকলেও কেউই তা মানছেন না। অতিরিক্ত বহিরাগত যানবাহন প্রবেশের ফলে শাহবাগ এবং নীলক্ষেত মোড় এবং কার্জন হলের পাশে শিক্ষাভবনের সামনের মোড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

আর সন্ধ্যা হলেই ক্যাম্পাসে বহিরাগত গাড়ি প্রবেশের যেন ধুম পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়তই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শুধু যানবাহনই নয়, ক্যাম্পাসে বেড়েছে বহিরাগতদের আনাগোনা। টিএসসি, শহীদ মিনার, রোকেয়া ও শামসুন্নাহার হলের আশপাশে বিকেলে জড়ো হচ্ছে প্রচুর বহিরাগত ছেলে-মেয়ে। এসব এলাকায় বহিরাগতদের আড্ডা দেয়া কিংবা অবস্থান করা নিষিদ্ধ থাকলেও দেখার কেউ নেই। আর এমনসব কারণে প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে কোনো না কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

যার দরুণ দেখা যায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগার অভিজিত রায়কে প্রকাশে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন তার স্ত্রী বন্যা।

এছাড়া ২১ মার্চ শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় পরমাণু শক্তি কমিশনের উল্টো দিকে থেকে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। তার বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। এসময় তার মাথা, কপাল, ঘাড়, এবং বাহুতে চাপাতির কোপ দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে সন্ত্রাসীরা অন্য কোথাও তাকে মেরে এখানে ফেলে যায়। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যায়।

এর আগে ১৪ মার্চ শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনের ফুটপাত থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির (৫০) লাশ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। ওই দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনের ফুটপাতে লাশটি পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন থানায় খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

২৯ জানুয়ারি বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল­াহ হলের পাশ থেকে অজ্ঞাত আরও এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ব্যক্তি তিন দিন ধরে হলের পাশে অবস্থান করছিলেন। তিনি নেশাগ্রস্থ ছিলেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

এর আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে থেকে এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রাহমান বলেন, প্রত্যেক জাতির উন্নতির সাথে সাথে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এটি একটি সাংস্কৃতিক অপরাধ। যেটিকে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কালচারাল ক্রাইম’ বলা হয়। এটা থাকবেই। তবে আমাদের এখানে যে ধরনের অপরাধ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথগুলোতে যদি চেকপোস্টসহ নিরাপত্তা জোর দার করা হয় তাহলে এর প্রবণতা কমতে পারে।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, নিরাপত্তার মধ্যেও অপরাধীরা এসব ঘটনা ঘটিয়ে তাৎক্ষণিক পালিয়ে যাচ্ছে। এখানে কে ছাত্র আর কে বহিরাগত তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। তবে আমরা ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম এ আমজাদ বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসটি এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ এবং বহিরাগত যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি খুবই কঠিন। আমরা ডিএমপি কমিশনার বরাবর বারবার চিঠি দিয়েছি ক্যাম্পাসে পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে। তারা এখনো আমাদের চাহিদা মতো পুলিশ দিতে পারেনি। আমরা চাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকটি প্রবেশ পথ রয়েছে সে গুলোতে যদি অন্তত চারজন করেও পুলিশ দেয়া হয় তাহলে এই প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রবেশ পথ ও গুরুত্বর্পূণ স্থানে সিসি ক্যামরা বসানোর চেষ্টা করছি। এছাড়া সকল হলকে নিজস্ব অর্থায়নে সিসি ক্যামরা বসানোর জন্য নির্দেশ দেয়া আছে।

বিএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।