তদন্ত কমিটিতেই সীমাবদ্ধ শিক্ষকদের যৌন হয়রানির বিচার
একের পর এক যৌন কেলেঙ্কারির সঙ্গে নিজেদের জড়াচ্ছেন জাতির বিবেক খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকগণ। গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ২০টিরও অধিক যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। শিক্ষকদের নানা কেলেঙ্কারির জন্য বারবার ইমেজ সংকটে পড়লেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিভিন্ন সময় এসব যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রী ও শিক্ষিকারা। সাহস করে বিচার দাবি করলেও আজো এসব যৌন হয়রানির কোনো সুষ্ঠু বিচার পাননি নির্যাতিতরা। প্রতিটি যৌন হয়রানির পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এ পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখেনি। কিছু দিন পরই চাপা পড়েছে এ সকল তদন্তের ফাইল।
২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এ কমিটি যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এখনো কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঢাবি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ২০টিরও অধিক যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। যার মধ্যে সর্বশেষ গত ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক আবু নাসের মুহাম্মদ সায়েফের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন একই বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের এক ছাত্রী। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়াম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রী। নির্যাতিত ওই ছাত্রী অভিযোগ করেন, মিডটার্ম পরীক্ষায় খাতায় সমস্যা হয়েছে- এমন কথা বলে শিক্ষক তাকে বাসায় ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে ডেকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
২০১২ সালে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুর রহমানের (বাহলুল) বিরুদ্ধে বিভাগেরই এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। একই ঘটনায় ওই শিক্ষককে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে বিভাগের অন্য দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ওই বছর একই অভিযোগ ওঠে সমাজকল্যাণ বিভাগের পরিচালকের বিরুদ্ধে। ১৫ অক্টোবর আরবি বিভাগের অধ্যাপক এটিএম ফখরুদ্দিনকে ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বাধ্যতামুলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
২০১২ সালে যৌন হয়রানি ও পরীক্ষায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধেও। বিভাগের ছাত্রী, ব্যাংক কর্মকর্তা ও বাইরের মেয়েদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক, মাসের পর মাস ছাত্রীদের নিয়ে বাসাতে থাকার অভিযোগ উঠেছে পরিসংখ্যান, প্রাণ পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাফর আহমেদ খানের বিরুদ্ধে।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এমরান হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন একই বিভাগের এক ছাত্রী। একই বছরের প্রথম দিকে উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইস্রাফিলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে তুলেছেন বিভাগেরই এক ছাত্রী। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভাগের এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে।
২০১১ সালের জুন মাসে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক মুমিত আল রশিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ করেন বিচার দাবি করে এক ছাত্রী। একই বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মুসা আরিফ বিল্লাহকে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে প্রশাসন। একই বছর পরিসংখ্যান বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রী লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
২০১১ সালের শেষের দিকে উর্দু বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মাহমুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একই বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পকের অভিযোগ ওঠে। ওই বছরেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নুরুদ্দীন আলোর বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে মামলা করা হয়।
২০১০ সালে উর্দু বিভাগের প্রভাষক গোলাম মাওলা হিরণের বিরুদ্ধে একই বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। একই বছর ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে আন্দোলনে নামেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক সিনিয়র অধ্যাপকের বিরুদ্ধে একই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শওকত আরা তার সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ করেন। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে এক ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ আনে।
এসব ঘটনার প্রত্যেকবারই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে আজ পর্যন্ত এগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। তাই একের পর এক এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এতে করে ইমেজ হারাচ্ছে দেশের সর্ব শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিষয়ে ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. আমজাদ আলী বলেন, ‘আসলে এটি আমার দেখার বিষয় নয়। এটার একটি তদন্ত কমিটি রয়েছে। এছাড়া এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চাইলে আমরা কিছু করতে পারিনা। তবে আমরা এগুলোর বিরুদ্ধে সুরাহ করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. নাসরীন আহমাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি মনে করি এসব ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও সমনভাবে দায়ী। একটি মেয়ে কোনো ধরনের পারিবারিক সম্পর্কে জড়ানোর আগেই কেন আরেকজন শিক্ষকের সঙ্গে নেপাল পর্যন্ত চলে যাবে। শিক্ষদের আরো দায়িত্ববান হওয়া উচিত। এছাড়া প্রতিটি ঘটনারই আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কিন্তু খুব দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত তো নেয়া যায়না। একজন শিক্ষককে আমরা তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করে দিতে পারি না, তবে তাকে আমরা বাধ্যতামুলক ছুটিতে পাঠিয়ে দিতে পারি।’
এমএইচ/বিএ/পিআর