রাবির প্রায় ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থী অনাবাসিক


প্রকাশিত: ০৩:১১ এএম, ০৩ জুন ২০১৫

বরেন্দ্রের লাল মাটির অনন্য এক ‘স্বপ্নভূমি’র নাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তখন থেকেই। ভূমিকা রেখেছে দেশের প্রায় সকল কর্মকাণ্ডেই। কখনো প্রত্যক্ষভাবে, আবার কখনো পরোক্ষভাবে।

রাজশাহী শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত দেশের এই অন্যতম বিদ্যাপীঠের প্রধান ফটকের দিকে তাকালেই হৃদয়ে লাগে বৃক্ষসারির দোলা। সারি সারি সাজানো মতিহারের সবুজ বাগান। সবুজের সাথে রয়েছে বাহারী রকমের ফুলের সুবাস।

দেখতে দেখতে রাবি আজ ৬২ বছরে পা দিয়েছে। এরই মাঝে এই স্বপ্নভূমি তৈরি করেছে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, রমিলা থালার, নৃবিজ্ঞানী জোহানা কর্ক প্যাট্রিক, পিটার বাউচি, কারেন্স ম্যালেনি, সঙ্গীত শিল্পী এ্যান্ড্রু কিশোর, এহসান রাহি, চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, এমিরিটস প্রফেসর অরুণ কুমার বসাক, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মাসুম রেজা, জাতীয় ক্রিকেটর আল আমিন হোসেনদের মতো অসংখ্য গুণীজনদের।

এদিকে, বয়সের সাথে সাথে বেড়েছে রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীবৃন্দ। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১১৩১ জন একাডেমিক স্টাফ ও ২০০০ জন প্রশাসনিক স্টাফ। শিক্ষার্থী সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ হাজারে। সাথে সাথে বেড়েছে অবকাঠামো। ১২ টি একাডেমিক ভবনসহ বর্তমানে রাবির ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১ টি ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৫টি। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এই হলগুলো সত্যিই অতি নগণ্য। অনুসন্ধানে দেখা গেছে রাবির প্রায় ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থী অনাবাসিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারের বেশি। ছাত্র হল সূত্রে জানা যায়, ছাত্রদের মোট ১১টি হলে প্রায় ৫০০০ ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা দেওয়া হয়ে থাকে। এই কারণে অধিকাংশ ছাত্ররা হলে সিট না পাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস জীবন বেছে নিয়েছে। এতে বাড়তি অর্থের পাশাপাশি অনিরাপত্তায় ভুগছে শিক্ষার্থীরা।

হলে সিট না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেসে থাকছেন এমন এক শিক্ষার্থী হচ্ছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সিরাজুচ ছালেকীন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি হলে সিটের জন্য আবেদন করেছিলাম। পরে হলের বৈধতা পেলেও হলে কোনো ফাঁকা সিট খুঁজে পায়নি।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো সকল সুবিধা ভোগ করতে চান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নির্মিত হল মতিহার। যেটা টিনসেড আকারে নির্মিত হয়েছিলো ১৯৫৮ সালে। পরে ১৯৮০ সালে এই হলে একটি তিন তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়। এই হলে বর্তমানে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে কম ১৪৪ টি সিট রয়েছে।

মতিহার হলে সংযুক্ত অনাবাসিক শিক্ষার্থী মো. ওলিউল্লাহ শান্ত হলে ওঠার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমনিতে হলে সিট পেতে এতো কষ্ট। তার উপর আবার আমাদের এই হলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে ফাঁটল ধরেছে। এতে করে হলে ওঠা নিয়েও মনের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।’

এছাড়া অন্যান্য হল সূত্রে জানা যায়, ক্যম্পাসের শের-ই-বাংলা ফজলুল হক হলে প্রায় ৩০৮ জন, শাহ মখদুম হলে ৪২২ জন, নবাব আব্দুল লতিফ হলে ৩২৫ জন, সৈয়দ আমীর আলী হলে ৪১০ জন, শহীদ শামসুজ্জোহা হলে ৪২০ জন, শহীদ হবিবুর রহমান হলে ৮০০ জন , মাদার বখ্শ হলে ৫৮৪ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ৬০০ জন, জিয়াউর রহমান হলে ৫৯০ জন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে প্রায় ৪৯৬ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

এদিকে একই অবস্থা ছাত্রী হলগুলোরও। ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি হলে মাত্র ৩১০১ জন ছাত্রীর আবসন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১০ হাজেরর বেশি। ফলে ছাত্রদের মতো অধিকাংশ ছাত্রীদের ক্যাম্পাসের বাইরে অনিরাপদ মেস বা বাসা বাড়িতে অবস্থান করতে হচ্ছে।

১৯৬৪ সালে ছাত্রীদর প্রথম আবাসিক হল দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসিনের বড় বোন বেগম মন্নুজানের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। মন্নুজান হলে বর্তমানে ৮৬০ জন ছাত্রীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এরপর একে একে বেগম রোকেয়া হল, তাপসী রাবেয়া হল, বেগম খালেদা জিয়া হল, রহমতুন্নেছা হল প্রতিষ্ঠিত হয়।

ছাত্রী হল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বেগম রোকেয়া হলে প্রায় ৭২০ জন, তাপসী রাবেয়া হলে আবাসিক ছাত্রী ৪৬৯ জন, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৪৫২ জন ও রহমতুন্নেছা হলে ৬০০ জন ছাত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

হল জীবন সর্ম্পকে বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুসলিমা জাহান অন্তরা ও শারমিন রিমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই হলই আমাদের ক্যাম্পাস জীবনের সকল সুখ-দুঃখের সাথী। আমার চাইলেও আমদের এই সময়টাকে ভুলতে পারবো না। এই জীবনটা এক অবিরত সুখের ধারা। তবে অনেকেরই ইচ্ছা থাকলেও এই মধুর সময়টা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ এই হলের সিটের অপর্যাপ্ততা। তারা এই সমস্য সমাধানে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।’

অন্যদিকে এই স্বল্প আবাসিকতার মধ্যেও হলে থাকতে ছাত্রীদের পোহাতে হয় নানা সমস্যা। হলের সমস্য সর্ম্পকে রহমতুন্নেছা হলের তাসনিয়া খাতুন ও প্রতীমা সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা হলে থাকি অনকেটা বাধ্য হয়ে। আমাদের হলে অনেক সমস্য রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ডাইনিং ও ক্যান্টিন ব্যবস্থা। ভালো খাবারের দেখা মেলে না অনেক দিন। আর যারা গণরুমে থাকে, তাদের নেই ভালো পড়ার জায়গা, নেই পর্যাপ্ত থাকার জায়গা।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে ইতিমধ্যে একটা ছাত্রী হল নির্মাণাধীন রয়েছে। আবসিকতার ভোগান্তি কমাতে আরো একটি ছাত্র হল ও ১টি ছাত্রী হলের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

হল সর্ম্পকে ছাত্র উপদেষ্টা ছাদেকুল আরেফিন মাতিন জাগো নিউজকে বলেন, আমারাও চাই না শিক্ষার্থী অতিরিক্ত খরচ করে বাইরে অনিরাপদ মেস জীবন যাপন করুক। ছাত্র উপদেষ্টাও শিক্ষার্থীর আবাসন সমস্যা উল্লেখ করে ছাত্রদের ১টি ও ছাত্রীদের ১টি হল নির্মাণের প্রস্তাবনার কথা বলেন।

এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।