চবি ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের লড়াইয়ে মামলার আসামিরা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১০:২৫ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১১:৪৮ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

সহসাই ঘোষণা করা হবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি। কমিটিতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়ার দৌড়ে আছেন অনেকেই। তবে এর মধ্যে কয়েকজনের নামে রয়েছে গ্রুপিং, মারামারি, টেন্ডার ও ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ। কেউ কেউ আবার নিজ দলের কর্মী হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি ও দল থেকেই বহিষ্কৃত। এছাড়া অনেকেরই নেই ছাত্রত্ব। আর এসব অভিযোগকে ধামাচাপা দিতে সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করতে মোটা অংকের অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছির উদ্দিনের ‘স্নেহভাজন’এসব নেতারাই শেষ পর্যন্ত চবি ছাত্রলীগের মূল নেতৃত্বে আসবেন বলে শঙ্কা তৃণমূল কর্মীদের।

তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ জাগো নিউজকে বলেন, যারা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত নয় এবং বিভিন্ন দুঃসময়ে যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছে তাদেরই আমরা বেছে নেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও রানিং (নিয়মিত) ছাত্রদের প্রাধান্য দেয়া হবে। অভিযুক্ত কাউকেই কমিটিতে নেয়া হবে না।

সভাপতি পদ প্রত্যাশী কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

বিগত কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ফজলে রাব্বী সুজন আসন্ন কমিটিতে সভাপতি পদ প্রত্যাশী। তবে নানা সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা অবস্থায় তার ছাত্রত্ব শেষ হয়। এছাড়া ২০১০ সালের একটি অস্ত্র মামলার আসামিও তিনি।

এদিকে সভাপতি পদ পেতে মরিয়া সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম তারেক। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দর্শন বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী হলেও ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে তার ছাত্রত্ব শেষ হয়।

শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষপদের নেতৃত্বের দৌড়ে রয়েছেন তাপস হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সাবেক অর্থ সম্পাদক এসএম জাহেদুল আউয়াল। কুতুবদিয়া এলাকায় বেড়ে ওঠা এ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি জালিয়াতি চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রে জানা যায়, গোয়েন্দাদের তালিকায় শীর্ষ তিন জালিয়াতের মধ্যে ছিলেন এ ছাত্রলীগ নেতা। সেসময় কড়া নজরদারিতেও ছিলেন তিনি।

সভাপতি হবার দৌড়ে আরও আছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন জেমস। দর্শন বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। ২০১৪ সালেই ছাত্রত্ব শেষ হয় তার। এ ছাত্রলীগ নেতা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বেশি সময় দিলেও, চবির রাজনীতেতে পুরোপুরি তার বিপরীত। সিএফসি গ্রুপের অন্য নেতাদের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য।

এছাড়া আসন্ন কমিটিতে সভাপতি পদ প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন পরিচিত মুখ সাবেক সহ-সভাপতি এনামুল হক আরাফাত। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নওফেলের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই ছাত্রলীগ নেতা। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি শিবিরের মিনি ক্যাটনমেন্ট খ্যাত ‘শাহ আমানত’ হলে শিবিরমুক্ত করতে গিয়ে অন্যান্যদের মতো তিনিও রক্তাক্ত হন। তবে তার বিরুদ্ধেও রয়েছে গ্রুপিং মারামারির অভিযোগ। শিবিরের মামলার অন্যতম আসামিও তিনি।

অপরদিকে সভাপতি পদে চমক সৃষ্টি করতে পারেন সুলতান মাহমুদ সায়েম। বিলুপ্ত কমিটিতে কোনো পদ না পেয়ে অভিমানে কিছুদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন এ ছাত্রলীগ নেতা। তবে হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পেয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। লোক প্রশাসন বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। প্রায় দুই বছর আগেই ছাত্রত্ব শেষ হয় তার। চট্টল বীর প্রয়াত নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বন্ধু ছিলেন তার বাবা।

এছাড়া চবি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে গ্রুপবাজ হিসেবে পরিচিত সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল হান্নান সাব্বির। তিনিও রয়েছেন সম্ভাব্য সভাপতির তালিকায়। গ্রুপবাজ হলেও ক্যাম্পাসে রয়েছে তার শক্ত অবস্থান। ছাত্রলীগ কর্মী তাপস হত্য মামলার অন্যতম সাক্ষী এ নেতা নানা সময়ে বিচারের দাবিতে সক্রিয় ছিলেন।

সভাপতি হবার তালিকায় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে সাবেক সহ-সভাপতি জামান নূরের নামও। রাজনীতিতে ত্যাগী এ নেতা ১/১১ এর সময় এক রাজনৈতিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কারাভোগ করেছেন। ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও রাজনীতির বেড়াজালে চারটি সেমিস্টারের বেশি শেষ করতে পারেননি তিনি।

সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

চবি ছাত্রলীগের আসন্ন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে মরিয়া সাবেক উপ-দফতর সম্পাদক মিজানুর রহমান বিপুল। ২০১৪ সালে তাপস হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি তিনি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে আজীবন বহিষ্কৃত এ ছাত্রলীগ নেতা রাজনীতিতে দলছুট হিসেবে পরিচিত। একসময় এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনীতি করলেও, তাপস হত্যা পরবর্তী ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হন। পরে আজম নাছির উদ্দিনের কাছে গিয়ে পড়াশোনার নিশ্চয়তা চান এবং রাজনীতি করবে না বলে জানান। যদিও পরে চসিক মেয়রের আস্থা অর্জনে রাজনীতি শুরু করেন তিনি।

এছাড়া সম্প্রতি ছাত্রলীগের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ছাত্রদলের কমিটিতে সহ-সভাপতি পদে থাকার অভিযোগ তুলেছে। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হন তিনি।

এদিকে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন বিলুপ্ত কমিটির উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হয়ে বর্তমানে এমবিএ করছেন। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চসিক মেয়র আজম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধেও রয়েছে গ্রুপিং মারামারির অভিযোগ।

শিবির মামলার অন্যতম আসামি এ ছাত্রলীগ নেতাকে ২০১২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি শিবির-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে প্রথম সারিতে দেখা যায়। এছাড়া নানা সময় দলীয় সংঘর্ষে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। তবে এত অভিযোগের পরও নিজ গ্রুপ নিয়ে ক্যাম্পাসে চসিক মেয়র নাছিরের রাজনীতি করছেন।

নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে আছেন সাবেক উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল হাসান দিনার। চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ও দিয়াজ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবুল মনসুর জামশেদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত তিনি। সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী এ নেতা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিকভাবে সুপরিচিত নন। এমনকি কখনো কোনো গ্রুপের নেতৃত্বে ও দলীয় কোনো সংঘর্ষে দেখা যায়নি তাকে। তার বিরুদ্ধে নেই কোনো মামলা। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে নাট্যকলায় ভর্তি হওয়া এ ছাত্রলীগ নেতা বর্তমানে স্নাতোকত্তর করছেন।

সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম সাবেক উপ-সাহিত্য সম্পাদক ইমাম উদ্দিন পারভেজ ফয়সাল। অর্থনীতি বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে বর্তমানে স্নাতক করছেন। আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী এ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে নিজ গ্রুপের সিনিয়র নেতাকে মারধরের অভিযোগ। ২০১৪ সালে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হোসাইনের ওপর হামলা করেন তিনি।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ থেকে আজীবন বহিষ্কৃত সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবু তোরাব পরশও এ দৌড়ে আছেন। চসিক মেয়রের অনুসারী এ নেতা দিয়াজ হত্যা মামলা ও সিআরবি জোড়া খুন মামলার অন্যতম আসামি। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হলেও বর্তমানে তার ছাত্রত্ব নেই। তবে ছাত্রলীগে পদ পেতে সম্প্রতি বিপিএড কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছেন।

এছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন তাপস হত্যা মামলার আসামি ছাত্রলীগ নেতা রুবেল দে। দলছুট এ নেতা আগে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হলেও বর্তমানে আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ২৬১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর আগে ৪ মে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

আবদুল্লাহ রাকীব/এফএ/এমএস

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - jagofeature@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :