রাণীনগরে গ্রেফতার আতঙ্কে ৬ গ্রামের মানুষ
নওগাঁর রাণীনগরে গত শনিবার অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে তিন কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৬ গ্রামের পুরুষরা গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন। গ্রেফতারের ভয়ে স্বতন্ত্র ও বিএনপির নেতাকর্মীরা রাতে কেউ বাড়িতে থাকছেন না।
জানা গেছে, গত ২৮ মে ওই ইউপির তিনটি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আসাদুজ্জামান পিন্টুর সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফার সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় পরদিন আল আমিন মাদরাসা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন অজ্ঞাত ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এছাড়া, সিম্বা ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় ও লোহাচূড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এ ঘটনার পর পুলিশ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে রাতে স্বতন্ত্র ও বিএনপির নেতাকর্মীদের অবস্থান জানতে চাওয়ায় গ্রেফতার এড়াতে ওই এলাকার বাসিন্দারা এখন আতঙ্কে রয়েছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, সদর ইউনিয়নের উত্তর রাজাপুর, মধ্য রাজাপুর, দক্ষিণ রাজাপুর, সিংড়াডাঙ্গা, সিম্বা ও লোহাচূড়া গ্রামের স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফা ও বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সর্মথকেরা গ্রেফতারের ভয়ে কেউ বাড়িতে থাকছেন না।
এদিকে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন কেন্দ্র দখল ও পুলিশের ওপর হামলা চালালেও তারা নির্ভয়ে বাড়িতে রয়েছেন। তাদের কাউকে গ্রেফতারও করেনি পুলিশ।
ওই এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার না করলেও প্রতিদিন পুলিশ রাতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন জনের খোঁজ করছে। গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে পুরুষরা কেউ বাড়িতে থাকছেন না।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ২৮ মে ভোটের দিন রাণীনগর সদর ইউপির আল আমিন মাদরাসা ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর হয়ে স্থানীয় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে দলীয় লোকজন ভোটকেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা শুরু করে। এতে পুলিশ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে।
এ সময় কেন্দ্র দখলকারীরা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠি চার্জ ও পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে পুলিশ। এর আগে লোহাচূড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সিম্বা ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ায় আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজনের সঙ্গে পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের সংর্ঘষ হয়। ওই তিন কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ ১০ জন আহত হন।
আল আমিন মাদরাসা থেকে জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ, রাণীনগর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মোহন ও ছাত্রলীগ নেতা সায়েম উদ্দীনকে আটক করে পুলিশ। পরে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ওই তিন কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করেন।
এ সময় জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তিন দুষ্কৃতকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক তিন ব্যক্তিসহ এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, গ্রেফতারের ভয়ে আমার কর্মী সমর্থকেরা প্রায় সবাই এখন ঘরছাড়া। সরকার দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজন আরও বেশি করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখাচ্ছে আমার লোকজনকে।
পর দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তাফা জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের সময় স্থানীয় এমপি ইসরাফিল আলমের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসাদুজ্জামান পিন্টুর লোকজন ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে জালভোট দিতে শুরু করে।
এ সময় সন্ত্রাসীরা ভোটারদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের ওপর হামলা চালায়। এমপি সরাসরি ইউপি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করায় আগামীতে স্থগিত কেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আসাদুজ্জামান পিন্টু দাবি করেন, ওই দিন আমার কোনো লোক কেন্দ্রে হামলা চালায়নি। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফার লোকজনই আমার কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
রাণীনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ খান জানান, নির্বাচনের দিন সংঘর্ষের ঘটনায় একটি মামলা ও দুটি জিডি হয়েছে। প্রকৃত দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
ছাত্রলীগের তিন নেতাকে আটকের পর ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে ওসি জানান, ওই দিন কাউকে আটক করা হয়নি। তবে আল আমিন মাদরাসা কেন্দ্র থেকে তিনজনকে পুলিশ আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। পরে তারা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন।
আব্বাস আলী/এসএস/পিআর