রাতে নিরাপদ সমুদ্র যাত্রা, দিনে পর্যটনে ভূমিকা রাখছে ‘বাতিঘর’

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৪:৩১ পিএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
কক্সবাজার, কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনের তিনটি বাতিঘরের আলোর বিচ্ছুরণের সিগন্যাল দেখে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেন সাগরে থাকা নাবিকরা। ছবি-জাগো নিউজ

দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যদি প্রশ্ন করা হয়—কক্সবাজার কোথায় এবং কোন দিকে যেতে হবে? স্থল অবস্থান থেকে ওয়াকিবহাল যে কেউ বলে দিতে পারবেন দেশে দক্ষিণ সীমান্ত জেলা দরিয়াপাড়েই পর্যটননগরী কক্সবাজারের অবস্থান। পিচঢালা সড়ক পথে সেখানে পৌঁছানো যায়। কিন্তু বঙ্গোপসাগর কিংবা অথৈ সমুদ্র দিয়ে বাংলাদেশ সীমানায় আসতে গেলে মসৃণ কোনো পিচঢালা সড়ক নেই।

সাগর-মহাসাগরের প্রকৃতি স্থলভাগের চেয়ে ভিন্ন হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের বেশিরভাগই সম্পন্ন হয় সাগরপথে। বিশালাকার জাহাজে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী নিয়ে নৌপথেই দেশ থেকে দেশে নিয়ে যান নাবিকরা। এভাবে চলতে গিয়ে নীরব সাগর হঠাৎ বিপদসংকুল হয়ে ওঠে। সেই উত্তাল সাগরে নিজের অবস্থান জানতে কিংবা বিদেশ থেকে আসা নাবিকদের বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান জানাতে সাহায্য করে বাতিঘর। আবার কোনো কারণে সাগরে গতিপথ হারিয়ে ফেললে দিক নির্দশনায় সহায়তাও করে উপকূলের এই লাইট হাউজ।

বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার-কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনের তিনটি বাতিঘরের আলোর বিচ্ছুরণের সিগন্যাল দেখে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেন সাগরে থাকা নাবিকরা। তিনটি ‘আলোক বাতি’ শতাব্দীর পর শতাব্দী চট্টগ্রাম বন্দর ও কক্সবাজার উপকূল চিনে জাহাজ ও ট্রলার চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করছে।

প্রায় ২০০ বছর ধরে সাগরে এ সেবা দিয়ে আসা কুতুবদিয়া বাতিঘর বিশ্বমানের উপযোগী করে সংস্কার করা হয়েছে। এই সেবার মাধ্যমে প্রতি অর্থবছরে কোটি কোটি টাকা আয় করছে সরকার। যতদিন সমুদ্র জনপথ সচল থাকবে, ততদিন এ বাতিঘরগুলোর আবেদন চলমান থাকবে বলে মনে করেন কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা।

সূত্র মতে, বৃটিশ সরকার সমূদ্রে জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে ১৮২২ সালে কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ধুরুং আলী ফকির ডেইল গ্রামে প্রথম বাতিঘর নির্মাণ শুরু করে। চান্স অ্যান্ড বার্মিংহাম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আটতলা ও আট কক্ষবিশিষ্ট ৪০ মিটার উচ্চতার বাতিঘরের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮৪৬ সালে। নির্মিত সেই বাতিঘরের তৎকালীন ব্যয় ছিল চার হাজার ৪২৮ টাকা। এটিই ছিল কুতুবদিয়ার বিখ্যাত বাতিঘর। যার ঘূর্ণায়মান আলোকচ্ছটা দেখা যেত প্রায় ১৯ মাইল দূর থেকে।

শতবছর পর প্রবল স্রোত ১৯৫৪ সালে বৃটিশ নির্মিত বাতিঘরের ক্ষতিসাধন শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে পাশেই স্টিলের স্ট্রাকচারের ওপর গড়া হয় ১২০ ফুটের আরেকটি বাতিঘর। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত গভীর সাগর পাড়ি দিতে কুতুবদিয়া ছিল উত্তম স্পট। দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কবলে নতুন বাতিঘরটিও ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি প্রথম নির্মিত ঐতিহাসিক বাতিঘরটির দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিটুকুও সাগরে বিলীন হয়। এরপর সংস্কার করা বাতিঘর থাকলেও মানের ছিল না। এসময় নামমাত্র সুবিধা দিয়ে সাগরে বিদেশি জাহাজ থেকে বাণিজ্যিক টোল নিয়েছে ভারত সরকার।

রাতে নিরাপদ সমুদ্র যাত্রা, দিনে পর্যটনে ভূমিকা রাখছে ‘বাতিঘর’

পরবর্তীতে শতকোটি টাকা ব্যয়ে বাতিঘর ও নেভাল রেডিও স্টেশনটি আড়াইশ ফুট উঁচু করে আধুনিক ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলা হয়। সেই বাতিঘর চলতি বছরের এপ্রিল হতে নতুন আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে। প্রতি ১০ সেকেন্ডে তিনটি আলোর ঝলকানি দেয় এ লাইট হাউজ। যার ঘূর্ণায়নমান আলোর বিকিরণ ফের সাগরে পথ দেখাচ্ছে নাবিকদের। এলাকাটি দর্শণার্থী ও পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে। নাম ধারণ করেছে ‘লাইট হাউজ বিচ’ হিসেবে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ১৯৭৬ সালে কক্সবাজার বাতিঘরটি স্থাপন করা হয়। পর্যটন জোনের লাইট হাউজ এলাকায় প্রায় ১০মিটার কাঠামো, একটি দুই বর্গক্ষেত্রের কংক্রিটের ভবনের ছাদকে কেন্দ্র করে লণ্ঠন এবং গ্যালারিসহ একটি ছোট বর্গাকার টাওয়ারে এর অবস্থান। এর ফোকাল প্লেন ৫৪ মিটার। প্রতি ১৫ সেকেন্ডে সাদা ফ্ল্যাশ আলো ছড়িয়ে নাবিক ও মাঝিকে সাহায্য করে, যা প্রায় সাড়ে ২৪ মাইল পর্যন্ত দেখা যায়।

কক্সবাজার লাইট হাউজের সঙ্গেই সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাতিঘর নির্মাণ হয়। এর ফোকাল প্লেন ৩৯ মিটার এবং প্রতি ২০ সেকেন্ডে দুটি সাদা ফ্ল্যাশ দেয়। লণ্ঠন এবং গ্যালারিসহ ৩৫ মিটার বর্গাকার পিরামিডাল টাওয়ারে সেন্টমার্টিন উত্তরপাড়ায় এর অবস্থান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কুতুবদিয়া-কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন তিনটি বাতিঘরের তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কুতুবদিয়া-সেন্টমার্টিনে বাতিঘর দুটি উপকূল থেকে ১৯ দশমিক ৮ ন্যটিক্যাল মাইল কাভার করে। আর কক্সবাজারের বাতিঘরটি ২৪ দশমিক ৫ ন্যটিক্যাল মাইল দূর থেকে দেখা যায়। কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া বাতিঘর বিদ্যুতের সাহায্যে আর সেন্টমার্টিনের বাতিঘর সচল রাখতে হয় জেনারেটর ও সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে।

সূত্র আরও জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য নিয়ে সাগর ও মহাসাগর মাড়িয়ে জাহাজ আসে চট্টগ্রামে। দেশের জলসীমায় প্রবেশের পর মার্চেন্ট শিপগুলো প্রথমে অবস্থান নেয় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়। তারপর যায় চট্টগ্রাম বন্দরে। এ যাত্রা পথে বাতিঘরের আলোর সাহায্য নিতে জাহাজ মালিকদের গুনতে হয় টাকা। দেশি-বিদেশি এবং উপকূলীয় এলাকায় চলাচলকারী জাহাজ মালিকদের এ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের লাইট হাউজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী নেট রেজিস্টার টনেজ (এনআরটি) হিসেবে প্রতি টন পণ্যের টোল পাঁচ টাকা। জাহাজের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয় এ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত এক দশকে শতকোটি টাকা এ বাবদে আয় করেছে সরকার।

নৌ-বাণিজ্য দপ্তর জানায়, সমুদ্রগামী জাহাজের ক্ষেত্রে মাসে টনপ্রতি পাঁচ টাকা বাতিঘর ফি নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ কর্তৃপক্ষ অন্যান্য চার্জের সঙ্গে ওই টাকা সংগ্রহ করে নৌবাণিজ্য দপ্তরকে বুঝিয়ে দেয়। এছাড়া ১০ টনের ওপরের ফিশিং ট্রলার ও অন্যান্য দেশি জাহাজের ক্ষেত্রে বার্ষিক টনপ্রতি দুই টাকা হারে বাতিঘর চার্জ নেওয়া হয়। শুধুমাত্র শুভেচ্ছা সফরে আসা বিদেশি জাহাজের ক্ষেত্রে বাতিঘর চার্জ নেওয়া হয় না।

সি-ক্রুজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন,‘ বাতিঘর এমন এক সুউচ্চ মিনার আকৃতির দালান, যা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় আলো ফেলে সমুদ্রের জাহাজের নাবিককে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় এবং সমুদ্রের অগভীর অঞ্চল সম্পর্কে সতর্ক করে। সৈকতের যেসব এলাকায় প্রচুর প্রবাল রয়েছে এবং যে প্রবাল গঠন জাহাজের ক্ষতি করতে পারে—এমন সব সৈকত চিহ্নিত করে দেয় বাতিঘর। বাতিঘরের আলো জাহাজকে সঠিক পথ দেখানোর পাশাপাশি দুর্যোগের সময় সতর্কতা সংকেত হিসেবে ব্যবহার হয়। কক্সবাজার-কুতুবদিয়া লাইট হাউজ একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।’

কুতুবদিয়া লাইট হাউজের ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কুতুবদিয়ার আন্তর্জাতিকমানের নতুন বাতিঘর সমুদ্রে চলাচলকারীদের সেবা দিচ্ছে। এখানে নেভাল রেডিও স্টেশনসহ পুরো কার্যক্রম সুবিধা থাকায় সমুদ্রে দেশি-বিদেশি জাহাজের রাজস্ব বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে।’

ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন আজাদ বলেন, ‘কুতুবদিয়া বাতিঘরের জন্য বিখ্যাত হলেও বিশাল বালিয়াড়ি সমুদ্র সৈকত, ঝাউ বাগান, কুতুব আউলিয়ার মাজার, কালামার মসজিদ, শুঁটকি মহাল ও লবণ উৎপাদন দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসুদের আগমন ঘটে। সাগর কিনারায় পর্যাপ্ত বাতিঘর ও নেভাল রেডিও স্টেশন সুবিধা থাকলে দেশের উপকূলে নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নেভিগেশনাল সহায়তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা সহজ হয়।’

কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জামশেদ আলম রানা বলেন, সদ্য চালু হওয়া আন্তর্জাতিক মানের বাতিঘর একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে মজবুত করছে, তেমনি এর আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘লাইট হাউজ সি-বিচ’ দ্বীপের পর্যটন শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সুনীল অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে কক্সবাজার উপকূলের তিন বাতিঘর। জেলায় পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যার একটি কুতুবদিয়ার বাতিঘর বিচ।

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।