কেজির ফল গ্রাম হিসাবে কিনছেন ক্রেতারা
পবিত্র রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে পুষ্টিকর ফলের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে সাতক্ষীরার বাজারে এই চাহিদাকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি ফলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ বাজারে এসে পছন্দের ফল কিনতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরছেন। আবার আগে যারা কেজি ধরে ফল কিনতেন, তারা এখন গ্রাম হিসাবে কিনছেন।
সরেজমিনে সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড় বাজার, হাটের মোড়, থানা মোড়, নিউ মার্কেট মোড়ের ফলের দোকান ও কয়েকটি উপজেলার বাজার থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, রমজান শুরুর আগে যেসব ফল সহজে কেনা যেত, এখন সেগুলোর দাম সাধারণের নাগালের বাইরে।
দেশি ফলের বাজারে উত্তাপ
সাতক্ষীরা ফলের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও স্থানীয় বাজারে দেশি ফলের দামেও স্বস্তি নেই। রোজার আগে যে পেয়ারা ৭০-৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতে। ভালো মানের পেঁপের কেজি দাঁড়িয়েছে ৮০-১৪০ টাকা। এছাড়া লেবুর দাম প্রতি পিস ৪ থেকে ১০ টাকা। ছবেদা আকার ভেদে প্রতি পিস ৩ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত, বেল আকার ভেদে প্রতিটির দাম ৩০-৬০ টাকা, তরমুজ ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শীতকালীন ফল কুলের (বরই) বাজারেও উত্তাপ নারকেলি কুল, আপেল কুল ও বাউ কুল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি সাগর কলা ৫০-৬০ টাকা এবং সবরি কলা ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানের চাপা কলা এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। পুষ্টির অন্যতম উৎস প্রতিটি ডাব আকারভেদে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আমদানিকৃত ফলের চিত্র
আমদানিকৃত ফলের দাম আরও চড়া। বাজারে প্রতি কেজি লাল আপেল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং সবুজ আপেল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাল্টা ৩২০-৩৬০ টাকা, বেদানা ৪০০ টাকা থেকে ৫৫০টাকা, স্ট্রবেরি ৮০০ টাকা এবং উন্নত মানের আঙুর (সাদা ৪০০ টাকা ও লাল ৬০০ টাকা) কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
রমজান আসার আগেই খেজুরে লেগেছে আগুনের আঁচ। বাজারে ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানের খেজুরের কেজি ৪০০ টাকা ছাড়িয়েছে। তবে তুলনামূলক ভালো মানের খেজুর ৮০০ টাকা এবং উন্নত জাতের খেজুর ১,৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতাদের আক্ষেপ
বাজারে ফল কিনতে আসা দিনমজুর মাসুদ হোসেন বলেন, সারাদিন কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসারের চাল-ডাল কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। অসুস্থ বাচ্চার জন্য ডাক্তার ফল কিনতে বলেছিলেন। কিন্তু বাজারে এসে দেখি সব ফলের দাম সাধ্যের বাইরে। এক কেজি আপেলের টাকা দিয়ে আমার পরিবারের দুই দিনের বাজার হয়ে যাবে। তাই ফল না কিনে খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছি।
আরেক ক্রেতা ভ্যানচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ইফতারে পরিবার নিয়ে একটু ফল খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাজারে ফলের যে দাম, তাতে আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে ফল কেনা একেবারেই অসম্ভব।
বেসরকারি চাকরিজীবী বেলাল হোসেন জানান, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছেন। কিছু ভালো মানের ফল কেনার বাজেট না থাকায় কেবল এক কেজি কলা ও ৫০০ গ্রাম কুল কিনে ফিরছি। পেয়ারার দাম কিছু কম ছিল, তাও রোজার শুরুতে বেড়ে গেছে। কী ফল খাব? সব ফলের দাম বেড়েছে।
শহরের বড় বাজারে ফল কিনতে আসা গৃহিণী ফাতেমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোজায় ইফতারের জন্য একটু খেজুর আর লেবুর শরবততো সবারই লাগে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি সাধারণ মানের খেজুরের দামও ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আর লেবুর যে দাম, তাতে লেবুর শরবত খাওয়াও এখন আমাদের জন্য বিলাসিতা।

ব্যবসায়ীরা কী বলছেন?
ক্রেতাদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা দুষছেন সরবরাহ ঘাটতি, পরিবহন খরচ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিকে।
সুলতানপুর বড় বাজারের ‘শামীম ফল ভান্ডার’র খুচরা বিক্রেতা শামীম হোসেন বলেন, রমজানে ফলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। এরসঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা বেশি দামে কিনি বলেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। ফলের দাম বাড়ায় আমাদের বিক্রিও অনেক কমে গেছে। আগে যারা কেজি ধরে ফল কিনতেন, তারা এখন আধা কেজি বা ২৫০ গ্রাম করে কিনছেন।
দেশি ফলের দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুলতানপুর বড় বাজারের দেশি ফলের ব্যবসায়ী ইদ্রিস হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, রোজায় হঠাৎ করে সব ধরনের ফলেরই চাহিদা বেড়ে যায়, কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে দেশি ফলের সরবরাহ কম। তাছাড়া গ্রাম থেকে ফল কিনে বাজারে আনতে এখন গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিক খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি পড়ছে। গ্রামের বিক্রেতারাও এখন আগের চেয়ে বেশি দামে ফল বিক্রি করছেন। সব মিলিয়ে মোকামেই (পাইকারি বাজার) ফলের দাম চড়া। আমরা বেশি দামে কিনে আনছি দেখেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, এখানে আমাদের বাড়তি লাভের কিছু নেই।
অন্যদিকে বিদেশি ফলের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ডলারের উচ্চমূল্য ও আমদানি শুল্ককে দায়ী করছেন আমদানিকারকরা। ভোমরা স্থলবন্দরের ফল আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী মো. কবিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, বিদেশি ফলের দাম বাড়ার মূল কারণ হলো ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক। এছাড়া ব্যাংকে এলসি (LC) খুলতেও আমাদের নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। ভারত বা অন্য দেশ থেকে বেশি দামে ফল কিনে বন্দরে আনা এবং সেখান থেকে পরিবহন করে স্থানীয় বাজারে পৌঁছাতে আমাদের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। আমরা পাইকারি পর্যায়েই বেশি দামে ফল আনছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। এখানে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান তানভীর জাগো নিউজকে জানান, আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। কোনো ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। এরই মধ্যে নিয়মিত অভিযানে ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদ যাচাই করা হচ্ছে। অসাধু সিন্ডিকেট বা কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এফএ/জেআইএম