সৈয়দপুরে অবাঙালি ক্যাম্পে ৬৬ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া
নীলফামারীর সৈয়দপুরে ২৪টি অবাঙালি (উর্দুভাষী) ক্যাম্পে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করেছে। চলতি মাস পর্যন্ত এই বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকারও বেশি। এক সময় সরকারিভাবে এই বিল পরিশোধ করা হলেও নাগরিকত্ব স্বীকৃতির পর সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এই ঋণের বোঝা।
সৈয়দপুর নেসকো (NESCO) সূত্র জানায়, সৈয়দপুরের ২৪টি ক্যাম্পে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০০৮ সালের ১৮ মে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে উর্দুভাষী এই জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আগে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় তাদের বিল পরিশোধ করত। কিন্তু নাগরিকত্ব পাওয়ার পর থেকে এই সরকারি সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গত দেড় দশকে বকেয়ার পাহাড় জমেছে।
সৈয়দপুরে এসব ক্যাম্পে বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছেন। ছোট ছোট টিনের ঘরে গাদাগাদি করে থাকার পাশাপাশি ঝুঁকির মুখে চলছে বিদ্যুৎ ব্যবহার। সরজমিনে দেখা গেছে, অনেক ঘরে এলইডি টিভি বা ফ্রিজ থাকলেও অধিকাংশেরই নিজস্ব মিটার নেই। কোথাও কোথাও সরকারি মিটারের বাইরে সরাসরি মেইন লাইন থেকে হুক দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে।
যেভাবে অবাঙালি জনগোষ্ঠী সৈয়দপুরে আসেন
সৈয়দপুরে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বা অবাঙালি জনগোষ্ঠী মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসী হয়ে আসে। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং শেষে পাকিস্তান সরকার নিতে অস্বীকৃতি জানালে এখানেই থেকে যান।
মূলত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই রেলওয়ে কারখানা ও অন্যান্য কাজের সুবাদে সৈয়দপুরে একটি বড় অবাঙালি বিহারি জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকেই তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময়ে যখন মুক্তিযোদ্ধারা উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা দখল করতে থাকে, তখন আশেপাশের শহর যেমন দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও থেকে বিহারিরা জীবনের নিরাপত্তায় সৈয়দপুরে এসে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের শেষে পাকিস্তানি সেনারা রংপুর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার সময় এই বিহারিদের ফেলে যায়, যার ফলে তারা সৈয়দপুরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

যুদ্ধের সময় ভারতে যাওয়ার মিথ্যা আশ্বাসেও অনেককে ট্রেনের মাধ্যমে সৈয়দপুর স্টেশনে নিয়ে আসা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে গোলাহাট হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে রংপুর, দিনাজপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিহারিরা প্রাণভয়ে সৈয়দপুর এসে আশ্রয় নিয়েছিল এবং এরপর যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা সেখানেই আটকা পড়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্যাম্পগুলোতে রয়েছে ছোট ছোট টিনের ঘর। একটিমাত্র ছোট কক্ষে তিনজন, ছোট-বড় শিশুদের নিয়ে চার থেকে পাঁচজনের বসবাস। ঘরের ভেতর একটি ফ্যান, বাল্ব, আর মোবাইল চার্জ দেওয়ার লাইন। কারো কারো ঘরে রয়েছে এলইডি টিভি, ফ্রিজ। কিন্তু এই বিদ্যুৎ সংযোগের কোনো মিটার নেই। আবার কোথাও ঝুলন্ত তারে ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিদ্যুৎ ব্যবহার। দু-চারটি পরিবারে মিটার স্থাপন করতেও দেখা গেছে। আবার সরকারি মিটার লাগানো থাকার পরও সরাসরি লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি মিটারের বাইরেও সরাসরি সংযোগ রয়েছে অসংখ্য।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর ধরে এভাবে চলছে সেখানকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, আমরা মাসে কিছু টাকা দেই, কেউ ৩০ টাকাও দেয়, কেউ ১০০ টাকাও দেয়। কিন্তু সেটা বিদ্যুৎ অফিসে যায় কিনা জানি না। নিজের নামে মিটার নেওয়ার সুযোগও পাই না।
অবাঙালি নেতার যা বলেন
ক্যাম্পগুলোর নেতারা জানান, হাইকোর্টেরা রায় ‘নাগরিকত্বের স্বীকৃতি মিললেও, অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। তারা সরকারের ফ্রি বিদ্যুৎ চান না। তারাও অন্য নাগরিকদের মতো বিদ্যুৎ বিল দিতে দিতে আগ্রহী। তবে তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। সেই সঙ্গে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত।
ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন দাতা সংস্থা সরকারকে সহায়তা দিত, সেই সহায়তা থেকে সরকার ক্যাম্পগুলোর বিদ্যুৎ বিল দিত। এখন আর কোনো সহযোগিতাই আমরা পাই না। অথচ আমাদের জীবনমানের কোনো ইতিবাচক উন্নয়ন হয়নি।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল আলী বলেন, বিহারি ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৬৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। আমরা সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা বিল চাইতে গেলে হামলা ও তোপের মুখে পড়ি। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিয়ে ফিরে এসেছি। এ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
আমিরুল হক/কেএইচকে/জেআইএম