আশ্রয়ণ প্রকল্প এখন মাদকসেবী-জুয়াড়িদের আখড়া
চারপাশে সবুজ ফসলি জমি। এর মাঝে দুটি ঘর, রান্নাঘর ও শৌচাগার নিয়ে একটি বাড়ি। রয়েছে বিদ্যুৎ আর সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের কাটাগাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের চিত্র এটি। এমন ৩৫ বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে এ আশ্রয়ণ প্রকল্প। তবে এ প্রকল্পের ২৮টিই বাড়িই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। বসতির অভাবে ফাঁকা পড়ে থাকা এসব ঘর এখন মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, কাটাগাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৮টি ঘরেই তালা ঝুলছে। ঝোপঝাড়ে ঘিরে আছে চারপাশ। বারান্দায় মাদক ও জুয়াড়িদের উপস্থিতির চিহ্ন স্পষ্ট। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘরের জানালা ও দরজা চুরি হয়েছে। একই ইউনিয়নের মাঝদক্ষিণা ও কর্ণঘোষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪০টি ঘরের মধ্যে ১০টিই ফাঁকা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত গৃহহীনদের বদলে বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের বরাদ্দ দেওয়ায় সেখানে কেউ থাকছেন না। এ সুযোগে ঘরগুলো মাদক বেচাকেনা ও সেবনের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া অনিয়ম ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ ঘরে এখনও বসতি গড়ে ওঠেনি।
‘সচ্ছল ব্যক্তিদের ঘর ও জমি বরাদ্দ দেওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে প্রকল্পটি এখন প্রাণহীন। এখানে এখন মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা চলে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের এক বাসিন্দা বলেন, যাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে, তাদের অনেকে কখনই আসেনি। দীর্ঘদিন ঘরগুলো পরিত্যক্ত থাকায় রাতে বহিরাগত ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়। ফলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাস করছি।
আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তাড়াশ উপজেলায় ৩৫৬টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘরে ব্যয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যে দুই শতক জমিসহ ঘরগুলো উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

প্রকল্পের বাসিন্দা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই আশপাশের মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে। তারা রাত গভীর পর্যন্ত ফাঁকাগুলোতে আড্ডা দেয়। তাদের মধ্যে মধ্য বসয়ী ও স্কুল কলেজ পড়ুয়ারাও রয়েছে। এ বিষয়ে কাউকে কিছু বললে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
‘যারা বরাদ্দ পেয়েও থাকছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত গৃহহীনদের তালিকা অনুযায়ী ঘরগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
স্থানীয়রা জানান, এসব কিশোর-তরুণরা মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাদকসেবীদের আড্ডা বন্ধ করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি করেন তারা।
স্থানীয় সবুর শেখ বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর প্রকৃত ভূমিহীনরা পাননি। সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে দলীয় নেতাকর্মী ও তাদের স্বজনদের দেওয়া হয়েছে। তাদের নিজস্ব বাড়ি-জমি রয়েছে। বরাদ্দ পেয়ে তারা সেগুলো বিক্রি করেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য এমদাদুল হক লিটন বলেন, সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য এখানে সফল হয়নি। এখানে এখন মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা চলে। প্রশাসনের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, মাদকসহ অপরাধ নির্মূলে নিয়মিত টহল রয়েছে। তবে আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাদক সেবনের বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিরাজগঞ্জ জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, নিয়মিতভাবেই মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাদকের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে অভিযান পরিচালানো হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, যারা বরাদ্দ পেয়েও থাকছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত গৃহহীনদের তালিকা অনুযায়ী ঘরগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া করা হবে।
এমএন/এএসএম