অকেজো একমাত্র জেনারেটর, বিদ্যুৎ চলে গেলে ভরসা মোমবাতি
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটর দুই বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে রয়েছে। লোডশেডিংয়ে ভরসা মোবাইল ফোন ও মোমবাতির আলো। তখন রোগীদের ওয়ার্ডে দু-একটি চার্জার বাল্ব জ্বললেও বিদ্যুৎহীন থাকে পুরো হাসপাতাল ভবন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার প্রায় ছয় লাখ মানুষের ভরসা সরকারি এই হাসপাতাল। বিভিন্ন সমস্যায় তারা এ হাসপাতালেই ছুটে আসেন। তবে মেলে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটে ভুগছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২১২টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৫৮ জন। পদ শূন্য রয়েছে ৫৪টি। ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫ জন। পদ শূন্য রয়েছে ২০টি। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ১৬টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র আটজন। আটটি পদ শূন্য রয়েছে। ৫০টি কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) পদে কর্মরত আছেন ৩৮ জন। শূন্য রয়েছে ১২টি।
মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি-জাগো নিউজ
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ ও দুটি ওয়ার্ডে রোগীরা ভর্তি রয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর দুটি ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগ ছাড়া পুরো হাসপাতাল অন্ধকারাচ্ছন্ন। হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটর অকেজো হয়ে তালাবদ্ধ একটি কক্ষে পড়ে আছে।
‘মিরসরাইয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন মিরসরাইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগী আসেন। সেবাও পাচ্ছেন আগের তুলনায় ভালো। তবে দুঃখের বিষয়, বিদ্যুৎ যাওয়ার পর ডাক্তারের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট কিংবা মোমবাতি জ্বালিয়ে রোগী দেখতে হয়’—স্থানীয় বাসিন্দা
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার ধুম ইউনিয়নের বাসিন্দা শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘পেটব্যথা নিয়ে একদিন আগে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হওয়ার পর থেকে ঝড়-তুফান শুরু হয়। বেশ কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। ওয়ার্ডের কর্নারে একটি চার্জার লাইট জ্বললেও ফ্যান বন্ধ থাকায় গরমে অস্থির লাগছিল। একটা হাসপাতাল এভাবে চলতে পারে না।’
আরও পড়ুন:
অর্ধশত শিশুর মৃত্যু, হাম নয় তবে কী?
অক্সিজেন সিলিন্ডার পড়লো মাথায়, প্রাণ গেলো রোগীর
ছোবলের পর জীবন্ত গোখরা সাপ নিয়েই হাসপাতালে যুবক
হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় ১৯ কোটি, চালু হয়নি ৩ বছরেও
উদ্বোধনের আড়াই বছরেও চালু হয়নি ২০ কোটি টাকার হাসপাতাল
ওচমানপুর থেকে এসেছেন গৃহবধূ সাহেদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে রয়েছি। তবে হাসপাতালে থাকতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। এত বড় হাসপাতাল কিন্তু বিদ্যুৎ গেলে আর কোনো ব্যবস্থা নেই!’
হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটরটি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। ছবি-জাগো নিউজ
স্থানীয় মেহেদী হাসান ইমন বলেন, ‘মিরসরাইয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন মিরসরাইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগী আসেন। সেবাও পাচ্ছেন আগের তুলনায় ভালো। তবে দুঃখের বিষয় বিদ্যুৎ যাওয়ার পর ডাক্তারের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট কিংবা মোমবাতি জ্বালিয়ে রোগী দেখতে হয়।’
‘পেটব্যথা নিয়ে একদিন আগে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হওয়ার পর থেকে ঝড়-তুফান শুরু হয়। বেশ কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। ওয়ার্ডের কর্নারে একটি চার্জার লাইট জ্বললেও ফ্যান বন্ধ থাকায় গরমে অস্থির লাগছিল। একটা হাসপাতাল এভাবে চলতে পারে না’—রোগী
মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইপিআই কর্মকর্তা কবির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সকালে শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে পুরো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে করে ভোগান্তিতে পড়েছেন হাসপাতালে আসা রোগীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জেনারেটর আছে, তবে দুই বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তেলের বাজেটও ঠিকমতো আসে না। যে টাকা তেলের বাজেট আসে, তা দিয়ে তেল কিনে দুইমাস জেনারেটর চালানো যাবে। তবে গত কয়েকদিন ধরে জেনারেটর সচল করার চেষ্টা চলছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন বলেন, জেনারেটর দুই বছর ধরে নষ্ট হয়ে আছে। এটি সচলের চেষ্টা চলছে। শূন্য পদগুলোর বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন অফিসসহ মন্ত্রণালয়ে তথ্য পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মিরসরাই আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, ‘মিরসরাইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য এখানে আসছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাসের এই উপজেলায় একটিমাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। হাসপাতালটিতে যান্ত্রিক ও কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অচিরেই হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানাই।’
এমএমডি/এসআর/জেআইএম