হাওরজুড়ে হাহাকার, ধান কাটছে ‘নয়নভাগায়’
গ্রামের বড় গৃহস্থ মিলন ব্যাপারী (৬৪)। ৫০ একর জমিতে বোরোর আবাদ করেছিলেন এবার। রতির হাওর, পাঙ্গাসিয়া, আনচুতলা, বাঞ্জাইাল, আমগাছতলা ও তেল্লার হাওরে তার জমি। ফসল ঘরে উঠলে প্রায় ৫ হাজার মণ ধান পেতেন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি ধান তলিয়ে গেছে। দূর থেকে হাওরে যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল! অথচ এক সপ্তাহ আগেও হাওরজুড়ে ছিল সোনালি ধান। এখন তলিয়ে যাওয়া হাওরের ধানের দিকে শুধুই তাকিয়ে থাকেন মিলন ব্যাপারী।
আক্ষেপ করে বলেন, ‘আর কয়টা দিন পাইলেই অইত। কিন্তু উজান্নেয়া ঢলের পানি সবকিছু ডুবাইলিছে। পানির নিচের ধান আর কাটা সম্ভব না। সব পঁচ্চেয়া যাইতেছে। এখন সব ধানখেত কেটে নিয়া যাইতেছে নয়নভাগায়! দেনা পাওনা কীভাবে শোধ করবো আর বছর কীভাবে যাবে?’
আরও পড়ুন-
পানির নিচে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
বৃষ্টি-ঢলের পানিতে ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি
মিলন ব্যাপারীর বাড়ি নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। শুধু মিলন ব্যাপারীই নয়। ওই গ্রামের মুসকো খাঁ, সুলেমান মিয়া (৪২), রাজিব মিয়ার (২৫) অবস্থা আরও ভয়াবহ।

মুসকো খাঁর পরিবারে ৭ সদস্য। তিনি ৩ একর জমিতে আবাদ করেছিলেন এবার। কিন্তু সব জমি নিয়ে গেছে উজানের ঢলে। মুসকো খাঁ জানালেন, সব জমির ধান তুলতে পারলে প্রায় তিনশো মণ ধান পেতেন। এখন এক মুঠো ধানও তুলতে পারেননি। শতবর্ষী মা, চার মেয়ে স্ত্রীসহ ৭ জনের পরিবারের খরচ কীভাবে চালাবেন সেই চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না তিনি। সব ধান ‘নয়নভাগায়’ কেটে নিয়ে যাচ্ছে লোকজনে।
‘আর কয়টা দিন পাইলেই অইত। কিন্তু উজান্নেয়া ঢলের পানি সবকিছু ডুবাইলিছে। পানির নিচের ধান আর কাটা সম্ভব না। সব পঁচ্চেয়া যাইতেছে। এখন সব ধানখেত কেটে নিয়া যাইতেছে নয়নভাগায়!’
‘নয়নভাগা’ হাওরের একটি প্রচলিত শব্দ! হাওরপাড়ের লোকজন বলেন, এটি হাওরাঞ্চলের একটি প্রথা। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ধান কাটা যখন কঠিন হয়ে পড়ে, শ্রমিকরা মালিকের খেত থেকে ধান কেটে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে জমির মালিক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেন। এই অবস্থাটিকেই বলা হয় নয়নভাগা! এটি কয়েক বছর পরপরই দেখেন কৃষকরা।
আরও পড়ুন-
হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিনমাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী
স্বপ্নের ধান পানির নিচে দেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কৃষক
‘ইবার একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি, বাচ্চারা কী খাইবো?
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন।

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আরিফুল ইসলাম সরদার জানান, রোববার (৩ মে) বিকেল পর্যন্ত জেলার ২২ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭০ হাজার কৃষক। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মোট ৩১৩ কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে।
তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে তিনগুণ খেতের ধান তলিয়ে গেছে। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি খেতে প্রবেশ করেনি।
‘হাওরে যেসব জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে তা বৃষ্টির পানিতে। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজোসহ নালা-খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আমাদের ফসল ডুবে এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।’
খালিয়াজুরি উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক ওয়াসিম মিয়া বলেন, ‘হাওরে যেসব জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে তা বৃষ্টির পানিতে। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজোসহ নালা-খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আমাদের ফসল ডুবে এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা বাকি। এছাড়া গবাদিপশুর জন্য খড় শুকানো যায়নি।’
আরও পড়ুন-
হবিগঞ্জে একদিনে ডুবলো ৬০০ হেক্টর জমির ধান, রয়েছে বন্যার শঙ্কা
বৃষ্টি-কৃষকের চোখের জলে একাকার হাওরের ধানের জমি
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় ২০ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-৮৮ ব্রি-৮৯ ব্রি-৯২ জাতের ধান বেশি আবাদ করা হয়। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৫২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’

মদন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, উপজেলায় ১৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ৭৬০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়ে গেছে।
কলমাকান্দা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, তার উপজেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাঁধগুলোতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরে এখনো বন্যার পানি আসেনি। যে পানিতে ধান ডুবেছে তা বৃষ্টির পানি। এ পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। হাওরের বিভিন্ন নালা, খালসহ নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এফএ/জেআইএম