পানির নিচে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বাঁধ ভেঙে হঠাৎ পানির তোড়ে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় প্রায় অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বলছে, সাতটি জেলার হাওরগুলোতে এখন ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে আছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অধিকাংশ হাওর এখন নিমজ্জিত। এই সাত জেলায় গড়ে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানিতে টানা ডুবে থাকায় পাকা ধানগুলো পচে যেতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন জেলা থেকে খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু শ্রমিক সংকট ও কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার করতে না পারায় কৃষকরা সেই ধান দ্রুত সংগ্রহ করতে পারছেন না। এছাড়া, ধানের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে তাদের সংকট আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সে অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় কাজও শুরু করেছে।

হাওরে চাষাবাদ ও ক্ষতির চিত্র
এ বছর শুধু হাওরগুলোতেই চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে প্রতি হেক্টরে গড়ে চার দশমিক ৪৭ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। সেই হিসেবে ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়লে কমপক্ষে দুই লাখ আট হাজার মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে।
ডিএইর প্রতিবেদনে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে। এখানে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে, যা ওই অঞ্চলের হাওরগুলোতে মোট আবাদের আট দশমিক ৭০ শতাংশ। এরপরই রয়েছে নেত্রকোনা। এখানে ১১ হাজার ৫২২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মোট আবাদের ২৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন
‘মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
একদিকে ধান সংগ্রহের অভিযান, অন্যদিকে পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন
বৃষ্টি-ঢলের পানিতে ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি
বড় ক্ষতি হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরেও। এখানে নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। এছাড়া, হবিগঞ্জে আট হাজার ৭৫০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে দুই হাজার ১৬০ হেক্টর, সিলেটে ৫১০ হেক্টর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৭২ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবেছে। তবে সরকারি হিসেবের চেয়ে বাস্তবে আরও বেশি পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডুবন্ত ধান নিয়ে মহাসংকটে কৃষকরা
হাওরের কৃষকরা ডুবন্ত ধান নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন। কারণ ধান কাটার শ্রমিক মিলছে না। যাও পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দাবি করা হচ্ছে উচ্চ পারিশ্রমিক। স্বাভাবিক সময়ে দিনে শ্রমিকপ্রতি খরচ হতো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে এলাকাভেদে এক হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।
কৃষকরা বলছেন, বাড়তি খরচ দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পানিতে ডুবে থাকা অনেক কৃষকের ধানই এখন পচতে শুরু করেছে। এছাড়া, স্বাভাবিক পরিবেশে একজন শ্রমিক যেখানে প্রতিদিন তিন কাঠা জমির ধান কাটতে পারতেন, এখন পানিতে ডুবে থাকার কারণে এক কাঠা জমির ধানও ঠিকমতো কাটা যাচ্ছে না। আবার জমিতে পানি থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না। যেসব হার্ভেস্টার কাজ করছে সেগুলোও তিন থেকে চারগুণ বেশি ভাড়া দাবি করছে।
হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে তা খুবই সামান্য। কারণ আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে তাতে কারও হাত থাকে না।- কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের কৃষক আলাল মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে আমাদের স্বপ্নের সোনালি ধান তলিয়ে গেছে। পানির কারণে মেশিন দিয়ে ধান কাটতে পারছি না। শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে, আবার বেশি দাম দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এ বছর বেশিরভাগ কৃষকই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
এদিকে, যারা ধান কেটেছেন তারাও তা বাজারে ঠিকভাবে বিক্রি করতে পারছেন না। কারণ বাজারে ধানের দাম কমে গেছে। আগে যেখানে ভেজা ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণপ্রতি বিক্রি হয়েছে, এখন সেটা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে গেছে। সরকার এরই মধ্যে হাওরে ধান ও চাল কেনার কার্যক্রম শুরু করলেও তা স্থানীয় বাজারে দাম বৃদ্ধিতে এখনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। সব মিলিয়ে কৃষকের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বাকি এলাকার উৎপাদনও ক্ষতির মুখে
এবার সারাদেশে ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে সোয়া দুই কোটি মেট্রিক টনের বেশি চাল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি ও ঢলের কারণে শুধু হাওরাঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ধানের উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বোরো মৌসুমের এই চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সারা বছরের জন্যই সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে শঙ্কা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এখনো ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব শেষ হয়নি। ডুবে থাকা ধানও অনেকে কাটার চেষ্টা করছেন। সেক্ষেত্রে কৃষক কিছু ধান সংগ্রহ করতে পারবেন। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তীতে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।- ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম

ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতায় কাজ শুরু
রোববার (৩ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে তা খুবই সামান্য। কারণ আমাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে তাতে কারও হাত থাকে না।’
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহযোগিতা করার জন্য কাজ শুরু করেছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতে কাজ শুরু করেছে। কৃষি বিভাগ হাওরভুক্ত সাত জেলা থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছে। এই তালিকা চূড়ান্ত হলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
আরও পড়ুন
হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিনমাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী
বৃষ্টিতে লবণচাষিদের স্বপ্নভঙ্গ
প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমি
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, এখনো ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব শেষ হয়নি। ডুবে থাকা ধানও অনেকে কাটার চেষ্টা করছেন। সেক্ষেত্রে কৃষক কিছু ধান সংগ্রহ করতে পারবেন। এগুলো বিবেচনায় নিয়েই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তীতে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এদিকে, রোববার লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, হাওর অঞ্চলের জেলাগুলোতে আকস্মিক ঢলের কারণে লাখ লাখ হেক্টর আবাদি জমি ও ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানকার কৃষকরা চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কৃষকদের সহায়তায় মন্ত্রণালয় থেকে আগামী তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।
এনএইচ/একিউএফ/এমএমএআর