মানুষের দুর্দশার খবর লেখা মানুষটির আজ বাঁচার আর্তনাদ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০১:৪৫ পিএম, ০৪ মে ২০২৬

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কলম আর ক্যামেরা হাতে মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন তিনি। অবহেলিত, নির্যাতিত আর প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে। সেই মানুষটিরই জীবন আজ থমকে গেছে নির্মম বাস্তবতায়। একসময় যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখে সমাজকে নাড়িয়ে দিতেন, আজ তিনি নিজেই অসহায়তার নিঃশব্দ আর্তনাদে দিন কাটাচ্ছেন। তবু সব কষ্টের মাঝেও তার একটাই আকুতি—ছোট্ট মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা।

সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড় শহরের বাসিন্দা সাংবাদিক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ। স্ত্রী, দুই কিশোর ছেলে ও সাত বছরের ছোট মেয়ে ফাতিমাকে নিয়েই সাংবাদিক সাজ্জাদের জীবন সংসার। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তিনি।

সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ ১৯৯১ সালের দিকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই বড় ভাইয়ের মাধ্যমে দিনাজপুরের দৈনিক প্রতিদিনে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি সাজ্জাদের। তিনি উদীয়মান একাধিক তরুণকে হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন। তার কাছে প্রকৃত সাংবাদিকতার দীক্ষা নিয়ে অনেকেই এখন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যমে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন।

দীর্ঘ সাংবাদিকতায় প্রথম সারির একাধিক দৈনিকে কাজ করেছেন তিনি। দৈনিক সকালের খবর, মুক্তকণ্ঠ, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, আমার দেশ, সমকাল, নিউ ন্যাশন ও ডেইলি সান এ কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া অনলাইন দ্য রিপোর্ট, বাংলা নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনেও কাজ করেছেন জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। ২০০০ সাল থেকে বার্তা সংস্থা ইউএনবি, ২০০৩ সাল থেকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন এনটিভি ও ২০১৬ সাল থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত আছেন এই সংবাদকর্মী।

জানা গেছে, সংবাদকর্মী সাজ্জাদ প্রায় তিন বছর আগে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে কিডনি আক্রান্তের বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর রংপুরে কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোবাশ্বেরের শরণাপন্ন হন। পরে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার এক পর্যায়ে ক্রিয়েটিনিন ১৪-১৫ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এখন তার দুটো কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কিডনি বিশেষজ্ঞ একাধিক চিকিৎসক।

পরে উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতে গিয়েও কোনো ফল পাননি তিনি। এরপর প্রতি সপ্তাহে তিন দিন করে ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বছরখানেক ধরে একদিন পর পর ডায়ালাইসিস করছেন। জীবনের সহায়-সম্বল বলতে যা ছিল আগেই সব শেষ করেছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসার পেছনে। সাংবাদিকতার প্রধান উপকরণ ল্যাপটপ, শখের ক্যামেরাও বিক্রি করেছেন। পরিবারের শেষ সম্বল বলতে ভিটে-বাড়িতে কোনোমতে টিকে আছেন। ধার-দেনা করেই কিডনি ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসা চলছিল।

তবে আর্থিক অনটনে এখন আর সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে পারছেন না। একবার ডায়ালাইসিস করতে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার খরচ হয়। সে হিসাবে প্রতি মাসে ওষুধসহ খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি মাসে চিকিৎসায় প্রয়োজন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। নিয়ম মেনে ডায়ালাইসিস না করলে শরীর ফুলে যায়।

পঞ্চগড় সোনারবাংলা কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারের চিকিৎসক আতিকুজ্জামান সবুজ বলেন, দিন দিন সাংবাদিক সাজ্জাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করার কথা থাকলেও তিনি অর্থাভাবে সপ্তাহে কখনো একদিন, কখনো দুই দিন নিচ্ছেন। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছেন। বেঁচে থাকার জন্য বর্তমানে তার নিয়মিত ওষুধ সেবন ছাড়াও সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস করা জরুরি। আমরা তাকে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্যও পরামর্শ দিয়েছি।

সাংবাদিক সাজ্জাদ বলেন, আমার এখন প্রতি মাসে ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসার পেছনে খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো আমার কাছে আর কিছুই নেই। সবই শেষ হয়েছে অনেক আগে। ধার-দেনাও হয়ে গেছে অনেক। ডাক্তার দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই সামর্থ্য আমার নেই।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েসহ তিন সন্তান এখনও শিক্ষার্থী। সাংবাদিকতা ছাড়া আমার আয়ের আর কোনো উৎস নেই। এখন সন্তানদের মুখে ঠিকমতো খাবারও তুলে দিতে পারছি না। জীবনের শেষ বেলায় এমন অসহায়ত্ব বরণ করতে হবে কখনোই ভাবিনি। সাংবাদিকতা করে জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি। অনেক দুঃখী মানুষের কথা লিখেছি। আজ আমিই তাদের কাতারে দাঁড়িয়েছি। মানুষের সহায়তা ছাড়া আমার আর বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। কষ্ট লাগছে শুধু মেয়েটার জন্য। অতটুকু মেয়ে আমার। তাকে আরেকটু বড় দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম। তার মুখের দিকে তাকালেই আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা করে।

সাজ্জাদের মেয়ে ফাতিমা বিনতে সাজ্জাদ বলেন, বাবার অসুখ হয়েছে। আমার কিছু ভালো লাগে না। বাবার কাছে টাকা নেই। চিকিৎসা না হলে আমার বাবা বাঁচবে না।

সাজ্জাদের বড় ভাই সহিদুল ইসলাম শহীদ বলেন, আমার ছোটভাই সাজ্জাদ প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দেশের প্রথম সারির একাধিক পত্রিকা এবং টেলিভিশনে কাজ করেছেন, এখনো করছেন। তার যে রোগ হয়েছে, এই রোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। তিন বছর ধরে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করছি। এখন তার এই চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।

পঞ্চগড় প্রেসক্লাবের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, সহকর্মী সাজ্জাদের অসুস্থতা নিয়ে আমরা একাধিক বৈঠক করেছি। কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই মেধাবী সহকর্মী আজ আর্থিক অনটনে নিজের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না। পারিবারিকভাবেও তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। সরকারের কাছে আমরা আমাদের সহকর্মীর জন্য সহায়তার আবেদন করবো। তার পাশাপাশি সমাজের বৃত্তবান, প্রবাসী ভাই ও বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান করছি।

সফিকুল আলম/এনএইচআর/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।