আলু এখন ‘গলার কাঁটা’

জিতু কবীর জিতু কবীর , নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর
প্রকাশিত: ০৫:৪৩ পিএম, ০৪ মে ২০২৬
আলুতে পচন ধরায় তা সড়কে ফেলে দিচ্ছেন একজন কৃষক। ছবি-সংগৃহীত

রংপুরে এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। তারপরও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ভরা মৌসুমে আলুর দামে চরম ধস নামায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক। বর্তমান বাজারে আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরে থাক, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন খরচ তোলাও দায় হয়ে পড়েছে।

দাম বাড়ার আশায় হিমাগারে জায়গা না পেলেও অনেক কৃষক ঘরে আলু তুলে রেখেছেন। কিন্তু সেখানেও ঘটছে বিপত্তি। শুরু হয়েছে পচন। উপায় না পেয়ে রাস্তায় আলু ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।

রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর ও পীরগাছা এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দাম মণপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা কমে গেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজি ৬-৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে আলু। কৃষকরা বলছেন, এক মণ আলু উৎপাদনে তাদের খরচই হয়েছে ৬০০-৬৫০ টাকা।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এবং বাজারে আলুর সরবরাহ উপচে পড়ায় তারা নতুন করে আলু কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক আড়তদার কম দামে আলু কিনে রাখলেও লোকসানের ভয়ে তা বাজারে ছাড়ছেন না।

‘ঘরে রাখা আলুতে পোকা ধরতে শুরু করেছে। এভাবে আর সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে। আর তা নাহলে কীটনাশক ছিটিয়ে কোনোরকমে আরও কিছুদিন ধরে রাখা যাবে। আলু দিয়ে বড় বিপদে আছি’—ভুক্তভোগী কৃষক

গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। শুরুতে পাইকাররা ৩-৪ টাকা কেজি দর প্রস্তাব করায় তিনি আলু ঘরে তুলে রাখেন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে আলুতে পচন ধরে। শেষপর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

একই গ্রামের কৃষক পারভিন আক্তার (৫০) আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি নিজের জমির পাশাপাশি বর্গা ও লিজ নেওয়া জমিসহ প্রায় ৫০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেন। এজন্য দেড় লাখ টাকার গরু বিক্রি করেন। দোকান থেকে বাকিতে কেনেন সার-কীটনাশক। ফলন ভালো হলেও বিক্রির সময় পাইকার না পাওয়ায় কিছু আলু হিমাগারে রাখেন। বাড়িতে রাখেন প্রায় ২০০ বস্তা। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতায় সেগুলো দ্রুত পচে যেতে শুরু করে।

আলু এখন ‘গলার কাঁটা’হিমাগারে জায়গা না পেয়ে বাসাবাড়িতে স্তূপ করে রাখা আলু। ছবি-সংগৃহীত

পারভিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘জমি বর্গা ও লিজ নিয়ে চাষ করলে খরচ অনেক বেশি হয়। জমির ভাড়া, শ্রমিক, সার-কীটনাশক—সব মিলিয়ে বড় অংকের টাকা লাগে। এখন বিক্রি না করতে পারলে ঋণ শোধ করার উপায় নেই।’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতী ইউনিয়নের কৃষক মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ঘরে রাখা আলুতে পোকা ধরতে শুরু করেছে। এভাবে আর সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে। আর তা নাহলে কীটনাশক ছিটিয়ে কোনোরকমে আরও কিছুদিন ধরে রাখা যাবে। আলু দিয়ে বড় বিপদে আছি।’

‘গতবছর আলু আবাদ করে ৫০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দাম না পাওয়ায় সেই আলু হিমাগার থেকে বের করার সাহস হয়নি। এবারও আলু আবাদ করে ধরাশায়ী হবার পথে’—ভুক্তভোগী কৃষক

রংপুর ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২৫-২৬) রংপুর বিভাগের আট জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টর জমিতে, যা গতবছরের (২০২৪-২৫) চেয়ে ২১ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমি কম। চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন। গতবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৫৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭৩৯ টন।

আরও পড়ুন:
উদ্বৃত্ত আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি চিপস কারখানা হবে
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
হতাশ আলুচাষিরা— ‘গতবারের ধারই শোধ হয়নি, এবারও লস’
‘গ্রামে দেখলাম মাতম চলছে আলু চাষিদের’
মানুষের হাত-পায়ের আকৃতির মেটে আলু, জনমনে কৌতূহল
মাঠে বাম্পার ফলন, বাজারে দাম নেই আলুর

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতবছরে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১১৫টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন। মজুত ছিল ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৫ টন। প্রতি কেজি আলুর জন্য হিমাগার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ দশমিক ২৫ টাকা। চলতি বছরের উৎপাদন (৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন) ও হিমাগারের ধারণক্ষমতা (১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন) তুলনা করলে দেখা যায়, মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ আলু সংরক্ষণ করা যায়।

‘আমাদের স্টোরেজে দুই লাখ ২০ হাজার বস্তা রাখা যায়। এক মৌসুমে আলু রাখতে নিম্নে দেড়কোটি টাকা শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে তেল খরচ এবং লোকবলের বেতন তো আছেই। গতবছর আলুর মূল্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের ১০ হাজার আলুর বস্তা স্টোরেজ থেকে বের করেননি। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি’—হিমাগার মালিক

রংপুর জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল খুবই কম। ওই দুই বছরে যথাক্রমে ৩৭৪ ও ৩৫৩ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করা হয়। এ বছর এখন পর্যন্ত ১২৬ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে।

বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের কৃষক মজিদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘গতবছর আলু আবাদ করে ৫০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দাম না পাওয়ায় সেই আলু হিমাগার থেকে বের করার সাহস হয়নি। এবারও আলু আবাদ করে ধরাশায়ী হবার পথে।’

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের তকেয়া গ্রামের কৃষক হায়দার আলী বলেন, ‘আলুর দামের এ অস্থিরতা কাটাতে দ্রুত সরকারি পর্যায়ে সংগ্রহ অভিযান শুরু এবং আলু রপ্তানির প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন। অন্যথায়, আগামীতে কৃষকরা আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।’

আলু এখন ‘গলার কাঁটা’সংরক্ষণ করতে না পারায় সড়কে ফেলে রাখা হয়েছে আলু/ছবি-জাগো নিউজ

পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের কৃষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এ খাতে সরকার প্রত্যক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা না করলে আলুচাষির ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসবে না। সরকারের উচিত আলুর একটি সর্বজনীন দাম ঠিক করে দেওয়া।’

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি এলাকায় অবস্থিত উত্তমাশা কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী ওবায়দুল বুলু। জানালেন শুধু কৃষকরা না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারাও।

‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতি বছর আলু আবাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, এর বেশি আলুর আবাদ করা কৃষকের উচিত নয়। কিন্তু কৃষকরা প্রতিযোগিতা করে একই ফসল আবাদের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন’—উপপরিচালক

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের স্টোরেজে দুই লাখ ২০ হাজার বস্তা রাখা যায়। এক মৌসুমে আলু রাখতে নিম্নে দেড়কোটি টাকা শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে তেল খরচ এবং লোকবলের বেতন তো আছেই। গতবছর আলুর মূল্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের ১০ হাজার আলুর বস্তা স্টোরেজ থেকে বের করেননি। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতি বছর আলু আবাদের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, এর বেশি আলুর আবাদ করা কৃষকের উচিত নয়। কিন্তু কৃষকরা প্রতিযোগিতা করে একই ফসল আবাদের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।